London Sunday 1 August 2010

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ ঘোষণা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়

লিখেছেন: 
মঙ্গল কুমার চাকমা

Chittagon Hill Tracs

গত ৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন যে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ভূমি জরিপের পন্থা-পদ্ধতি ঠিক করা হবে এবং ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু করে আগামী বছরের ১৫ মার্চের মধ্যে ভূমি-জরিপ সম্পন্ন করা হবে (দ্য ডেইলী ষ্টার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০০৯)।

উল্লেখ্য যে, গত ১৯ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগলাভের পর আজ অবধি তিনি ভূমি কমিশনের আনুষ্ঠানিক সভা আহ্বান করেননি। ইতিমধ্যে তিনি গত ৩-৫ আগষ্ট তিন পার্বত্য জেলা সফর করেছেন এবং জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে আহুত মত-বিনিময় সভায় মিলিত হয়েছেন। সফরকালে কমিশনের কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই একতরফাভাবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের ঘোষণা দেন। গত ৭-৮ সেপ্টেম্বর তিনি আবারও যথাক্রমে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে সফর করেন এবং খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের একদিনের নোটিশে আহুত যৌথ সভায় মত-বিনিময় করেন। এটা বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য যে, দু'টো মত-বিনিময় সভাতেই আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানগণ ও সার্কেল চীফগণ অনুপস্থিত ছিলেন। অথচ ভূমি কমিশনের কোন আনুষ্ঠানিক সভার আয়োজন না করে কর্মকর্তাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের সময়সূচী ঘোষণা দেন খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী। প্রসঙ্গত ভূমি কমিশন চেয়ারম্যানের এই একতরফা তৎপরতা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা জাতীয় পর্যায়ে অভিজ্ঞ মহলের নানা সন্দেহ ও সংশয় দেখা দিয়েছে।

বলাবাহুল্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির 'ঘ' খন্ডের ২নং ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, "সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন এবং উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতঃ উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চুড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভূক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন।"

যেখানে এখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি, অভ্যন্তরীণ পাহাড়ী উদ্বাস্তুদের এখনও পুনর্বাসন করা হয়নি, ভারত প্রত্যাগত পাহাড়ী শরণার্ধীদের অধিকাংশই এখনো নিজ জায়গা-জমি ফেরৎ পায়নি, সর্বোপরি এখনো ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়নি, সেখানে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় কোন উদ্দেশ্যে একতরফাভাবে ভূমি জরিপের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। তবে এখানে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা ছাড়াই যে অস্বচ্ছ কায়দায় তড়িঘড়ি করে ভূমি জরিপের ঘোষণা দেয়া হয়েছে তাতে যেই উদ্দেশ্য থাকুক না কেন তা কখনোই সদিচ্ছাপ্রসূত হতে পারে না বলে ধারণা করা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার অন্যতম একটি প্রধান দিক হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ এমনিতেই অত্যন্ত কম। চাষযোগ্য ধান্য জমির ('এ' শ্রেণীভুক্ত) পরিমাণ মাত্র ৩.১% যা ৭৬,৪৬৬ একর মাত্র। অধিকন্তু ১৯৬০ সালে কাপ্তাই নির্মিত হওয়ার ফলে 'এ' শ্রেণীভুক্ত আবাদী জমির ৪০ শতাংশ (৫৪ হাজার একর জমি) এই বাঁধের পানিতে তলিয়ে যায়। আবাদী জমির স্বল্পতার কারণে পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়নি ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজ করছে শত-শত ভূমিহীন পরিবার। কিন্তু সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচুর আবাদযোগ্য জমি রয়েছে এই অজুহাত দেখিয়ে ১৯৭৯ সাল থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেশের সমতল জেলাগুলো থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চার লক্ষাধিক বহিরাগত লোক নিয়ে আসে। এসব লোকজনকে জুম্মদের ভোগ দখলীয় ও রেকর্ডীয় জমির উপর বসতি দেয়া হয়। পাশাপাশি সেটেলাররা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদতে জুম্মদের উচ্ছেদ করে তাদের জমিগুলো বে-দখল করে নেয়। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় একটি জলন্ত অগ্নিকুন্ড।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই মৌলিক সমস্যাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুসারে সমাধানের লক্ষ্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ৫ সদস্য-বিশিষ্ট একটি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করার বিধান করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে। কমিশনের অন্যান্য সদস্যরা হচ্ছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ, সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (সংশ্লিষ্ট) ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার/অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার।

কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৯৯ সালের ৬ জুন আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে প্রথম নিয়োগদানসহ আজ অবধি চারজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভূমি কমিশন কার্যকর তথা ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে মৌলিক কোন অগ্রগতি সাধিত হয়নি। ২০০১ সালে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের একদিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ জাতীয় সংসদে পাশ করে। উক্ত আইনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে বিরোধাত্মক ১৯টি বিষয় রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নোক্ত দু'টি ধারা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে যে, "..পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এযাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। জলে-ভাসা জমির ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।" অথচ ২০০১ সালে প্রণীত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের ৬নং ধারায় কেবলমাত্র 'পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি বিরোধ' নিষ্পত্তির বিধান করা হয়েছে।

কমিশনের কার্য-পদ্ধতি সম্পর্কে ভূমি কমিশন আইনের ৭(৫) ধারায় বলা হয়েছে যে, 'চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে ধারা ৬(১) ও বর্ণিত বিষয়াদিসহ উহার এখতিয়ারভূক্ত অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হইলে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে'। এ-বিধান বলে কমিশনের চেয়ারম্যানকে স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের বিরোধাত্মক ধারা সংশোধনের জন্য ২০০১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ হতে ১৯ দফা সম্বলিত সুপারিশমালা সরকারের নিকট পেশ করা হয়। উক্ত সুপারিশমালা বিবেচনার্থে বিএনপি নেতৃত্বাধীন তৎকালীন জোট সরকারের আমলে ১২ মার্চ ২০০২ তৎকালীন আইন মন্ত্রী মওদুদ আহমদের সাথে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার নেতৃত্বাধীন পরিষদের এক প্রতিনিধিদলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় আঞ্চলিক পরিষদের সুপারিশ মোতাবেক ভূমি কমিশন আইনের সংশোধন করার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। তদানুসারে আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রয়োজনীয় ভেটিং হয়ে যাবার পর উক্ত ভূমি কমিশন আইন প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রেরিত হয়। এরপর আর কোন অগ্রগতি সাধিত হয়নি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এ-বিষয়ে কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভূমি কমিশন আইন সংশোধনকল্পে গত ২৬ অগাষ্ট আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধিদলের সাথে ভূমি মন্ত্রী রেজাউল করিম হীরার সভাপতিত্বে ভূমি মন্ত্রণালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় অনেকটা বিধি-বহির্ভূতভাবে তিন পার্বত্য জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটদেরও ডাকা হয়। উক্ত সভায় আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি আঞ্চলিক পরিষদ কর্তৃক উত্থাপিত সংশোধনী প্রস্তাবের অনুকূলে মত দিলেও রাঙ্গামাটি জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট এসব সংশোধনীর চরম বিরোধীতা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা স্থগিত করা হয়। উল্লেখ্য যে, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এরূপ মতামত নেয়ার নজির অদৃষ্টপূর্ব। অধিকন্তু আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং হয়ে যাবার পর এরূপ নতুন করে মতামত নেয়াও যুক্তিসঙ্গত ও সদিচ্ছাপ্রসূত হতে পারে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আশু করণীয় হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক ২০০১ সালের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন করা। গত ৩ ফেব্রুয়ারী আঞ্চলিক পরিষদের এক প্রতিনিধিদলের সাথে অনুষ্ঠিত সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারও এ-বিষয়ে অনুকুল মত প্রকাশ করেন। বলাবাহুল্য, আইনের বিরোধাত্মক ধারাগুলো সংশোধন না করে ভূমি কমিশনের কাজ শুরু করলে ভূমি সমস্যার আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। সমস্যা আরো জটিল থেকে জটিলতর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে এখনো ভূমি কমিশনের বিধিমালা প্রণীত হয়নি। প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিসম্পদ সম্বলিত কমিশনের কার্যালয় স্থাপিত হয়নি। অনেকদিন ধরে কমিশনের সচিব পদ খালি রয়েছে। ২০০৬ সালে কমিশনের কর্মচারী নিয়োগের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও তা পরবর্তীতে বাতিল করা হয়। কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, পরিসম্পদ বরাদ্দ এবং কমিশনের জন্য কার্যালয় স্থাপন করা ইত্যাদি বিষয় এখনো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। কিন্তু এসব জরুরী বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ না নিয়ে কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি লঙ্ঘন করে কেন ভূমি জরিপের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তা বোধগম্য নয়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ-অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থা বরাবরই দেশের অপরাপর সমতল অঞ্চলের শাসন-ব্যবস্থা হতে পৃথক। অনুরূপভাবে এ-অঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনাও সমতল জেলাগুলো থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। পার্বত্য চট্টগ্রামে মূলত: তিন ধরনের ভূমি রয়েছে। প্রথমত: বন্দোবস্তকৃত ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ভূমি যা বেশীর ভাগই ধান্য জমি। দ্বিতীয়ত: ভোগ-দখলীয় জমি যা বেশীর ভাগই বাস্তুভিটা, বাগানবাগিচা ইত্যাদির ভূমি। তৃতীয়ত: রেকর্ডীয় বা ভোগ-দখলীয় কোনটাই নয় এমন ভূমি যা জুমভূমি নামে খ্যাত ও প্রথাগতভাবে সংশ্লিষ্ট মৌজা অধিবাসীদের সমষ্টিগত মালিকানাধীন। অর্থাৎ মৌজা এলাকায় অবস্থিত ভূমির মধ্যে ব্যক্তি নামে বন্দোবস্তকৃত বা ভোগদখলীয় ভূমি ব্যতীত অন্য সকল ভূমিই মৌজাবাসীর। রাজা-হেডম্যান-কার্বারীর নিয়ে গঠিত প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে থাকে। তাই মৌজার অধিবাসী যে কোন ব্যক্তি হেডম্যানের অনুমতি নিয়ে মৌজাস্থিত সমষ্টিগত মালিকানাধীন জমিতে জুম চাষ, গো-চারণ, গৃহস্থালী কাজে বনজ দ্রব্যাদি সংগ্রহ ইত্যাদির অধিকার রয়েছে। এজন্য জুমচাষীরা পরিবার-ভিত্তিক জুম খাজনাও দিয়ে থাকে। জুম-ভূমি সমষ্টিগত মালিকানাধীন বিধায় জুম খাজনা জমি ভিত্তিক না হয়ে, মূলত: মাথাপিছু ভিত্তিক ক্যাপিটাশন ট্যাক্স হিসেবে ধার্য হয়ে থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন-ব্যবস্থা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে এসেছে বিশেষ আইনের আওতায়। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের সংবিধানের আওতায় ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ শাসন কাঠামো এবং আলাদা ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রবর্তিত হয়েছে। এক-শাসন কাঠামোতে সংশ্লিষ্ট আইন বা বিধানাবলী অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, অঞ্চল পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলায় তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদের উপর ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা কার্যাবলী অর্পণ করা হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদ তা তত্বাবধান ও সমন্বয় সাধন করে।পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনা মূলত: ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন-বিধি, ১৯৯৮ সালের তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন (সংশোধন), ১৯৯৮ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৩৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম বাজার-ফান্ড বিধিমালা প্রভৃতি বিশেষ আইন ও বিধিমালার মাধ্যমে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। অধিকন্তু এই অঞ্চলে রয়েছে রাজা-হেডম্যান-কার্বারীদের নিয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রশাসন ব্যবস্থা যারা সরাসরি ভূমি ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত।

ভূমি কমিশন চেয়ারম্যান মহোদয় পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু তিনি কিভাবে এবং কোন আইন বা বিধিমালা বলে ভূমি জরিপ করবেন? মনে রাখতে হবে যে, দেশের সমতল জেলাগুলোতে বিদ্যমান সার্ভে আইন পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য নয়। ব্রিটিশ শাসকদের প্রবর্তিত ১৮৭৫ সালের সার্ভে আইনও সে সময় 'শাসন বহির্ভূত এলাকা'য় প্রয়োগ করা হয়নি। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের শাসনবহির্ভূত এলাকার মর্যাদা না থাকলেও শাসনবহির্ভূত এলাকার জন্য প্রণীত ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি এখনো বলবৎ রয়েছে এবং আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্বলিত বিশেষ শাসনব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।

সরকার ১৯৮৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি খতিয়ান অধ্যাদেশ জারী করে। উক্ত অধ্যাদেশ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বিধায় কার্যকর হতে পারেনি। মূলত: সমতল অঞ্চলে প্রচলিত আইন অনুসারে এটা প্রণীত হয়েছে। এতে রাজা-হেডম্যান-কার্বারী সম্বলিত প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রাখা হয়নি। এছাড়া বর্তমানে আইন অনুসারে 'ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা' বিষয়টি পার্বত্য জেলা পরিষদের হস্তান্তরিত বিষয়। এমনকি হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রভৃতি ভূমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যাদিও পার্বত্য জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণাধীন।

দেশের সমতল অঞ্চলে বন্দোবস্ত নয় এমন সকল জমিই জেলা প্রশাসকের ১নং খতিয়ান বইয়ে 'খাস' জমি হিসেবে নিবন্ধিত থাকে যার মালিক রাষ্ট্র। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে এরূপ খাস জমির কোন অস্তিত্বই নেই। দেশের সমতল অঞ্চলে ১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গ জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন অনুসারে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করা হয়। জমির উপর প্রজাদের বংশানুক্রমিক বন্দোবস্তী প্রদান এবং জমিদারদের নিজ নামে ১০০ একর জমি রাখার পর অবশিষ্ট সকল জমিই খাস জমি হিসেবে রাষ্ট্রের মালিকানাভুক্ত হয়। সমতল অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে এরূপ জমিদারী প্রথা ছিল না। স্বভাবতই পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গ জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনও প্রযোজ্য নয়। সমতল অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে খাস জমির ধারণাও প্রযোজ্য নহে।

সমতল অঞ্চলে যে সমস্ত জমি 'খাস জমি' হিসেবে বিবেচিত সেসব জমি পার্বত্য চট্টগ্রামে হয় ব্যক্তির অধীন ভোগদখলীয় জমি নতুবা মৌজাবাসীর সমষ্টিগত মালিকানাধীন জুমভূমি হিসেবে বিবেচিত। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের ল্েয পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত এসব আইন, রীতি ও পদ্ধতিগুলো সক্রিয় ও কার্যকরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে এবং এসব আইন, রীতি ও পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য হয় দেশে প্রচলিত বিদ্যমান সার্ভে আইন সংশোধন করতে হবে নতুবা পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য নতুন সার্ভে আইন প্রণয়ন করতে হবে। কিন্তু ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় যেভাবে তড়িতড়ি করে এক-তরফা ঘোষণা দিয়েছেন তাতে এসব স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, আইন, রীতি ও পদ্ধতি সক্রিয় বিবেচনায় নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয় না। স্বাভাবিকভাবে এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা আরো জটিলতর হয়ে উঠবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা একের পর এক যেভাবে জটিল থেকে জটিলতর করা হয়েছে সেই পর্যায়ে সমাধানের পরিবর্তে যদি ভূমি জরিপের নামে আরো জটিলতর করে তোলা হয় তজ্জন্য ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান তথা বর্তমান সরকারই দায়ী থাকবেন।

ভূমি জরিপের অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ভূমির ম্যাপিংসহ ভূমির মালিকানা ঠিক করা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক আগে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না করে এবং অভ্যন্তরীণ পাহাড়ী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ও প্রত্যাগত পাহাড়ী শরণার্থীদের তাদের জমি প্রত্যর্পন না করে, সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি ও ভূমি মালিকানা চুড়ান্তকরণের মাধ্যমে পাহাড়ী জনগণের ভূমি রেকর্ডভূক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত না করে কিভাবে ভূমি জরিপের মাধ্যমে ভূমি মালিকানা ঠিক করা হবে তা বোধগম্য নয়। ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় গাড়ীর আগে ঘোড়া জুড়ে না দিয়ে কার্যত ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দিতে যাচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হয়। এতে আরো একটি জটিল সমস্যার জন্ম দেবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এমতাবস্থায় পার্বত্যবাসী আশা করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রস্তাব অনুসারে প্রথমেই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ সংশোধন করা হোক। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দার মধ্য থেকে কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগদান ও কমিশনের জন্য পর্যাপ্ত পরিসম্পদ বরাদ্দ করে কমিশনের কার্যালয় শক্তিশালী ও সক্রিয় করা হোক। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক আগে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং পাহাড়ী শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ পাহাড়ী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু করা হোক। এলক্ষ্যে অচিরেই ৫ সদস্যকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের আনুষ্ঠানিক সভা আহ্বান করে গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক পদ্ধতিগতভাবেই প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ হোক এটাই পার্বত্যবাসী আশা করে।

মঙ্গল কুমার চাকমাঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক।

 

২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯

 

পাঠকের মন্তব্য

Very good, informative write

Very good, informative write up.

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options