• জাতীয় শিক্ষা-নীতি ও লিঙ্গীয় ভাবণা
    জোবাইদা নাসরীন

    প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় শিক্ষা-নীতি (চুড়ান্ত খসড়া) সংক্রান্ত প্রতিবেদন। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষা-নীতির এই প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইটে দেয়া হয়েছে। সরকার এই প্রতিবেদনের উপরে মতামত আশা করছে সরকার। প্রসঙ্গত,  শিক্ষা-নীতি ২০০৯ প্রণয়নের লক্ষ্যে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৬টি সংস্থা ও সংগঠণের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাদা-আলাদাভাবে মত-বিনিময় করা হয়। এছাড়া অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কাছ থেকে লিখিত মতামতও গ্রহন করেছে কমিটি। এছাড়াও এ-ব্যাপারে দেশের ছয়টি বিভাগে মত-বিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরাও নিজেদের বিশেষজ্ঞ মতামত ও অভিজ্ঞতার আলোকে এই নীতি প্রণয়নে অবদান রাখেন। বর্তমান কমিটি পূর্বের সবগুলো প্রতিবেদন ও জাতীয় শিক্ষা-নীতি ২০০০ পর্যালোচনা করেছে। এক্ষেত্রে কুদরত-ই খুদা (১৯৭৪), শামসুল হক (১৯৯৭) কমিটির প্রতিবেদন এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ বিশেষভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

    শিক্ষা-নীতির এই খসড়া প্রতিবেদনটি মোট  ২৮ টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। শিক্ষা-নীতির লিঙ্গীয় দিকটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বর্তমান লেখাটির উদ্দেশ্য। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, এই খসড়াতে নারী শিক্ষা (অধ্যায় ১৭) আলাদাভাবে স্থান পেয়েছে। এই বিষয়ে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও। নারী শিক্ষা অধ্যায়  ছাড়াও অন্য কয়েকটি অধ্যায়েও যোগ হয়েছে নারী শিক্ষা কেন্দ্রিক বেশ কিছূ ধারা। যেমন, অধ্যায় ২ (প্রাক প্রাথমিক এবং প্রাথমিক শিক্ষা) অংশের ১৪ নং ধারায় বলা হয়েছে  'মেয়ে শিশুদের মধ্যে ঝরে পড়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে অধিক, তাই এই সকল শিশু যাতে ঝরে না পড়ে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীরা যেন বিদ্যালয়ে কোনোভাবে উত্যক্ত না হয় সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে'।  এর কাছাকাছি আরেকটি ধারার উল্লেখ রয়েছে  নারী শিক্ষা ( অধ্যায় ১৭)  এর ২ নং অনুচ্ছেদে-' ছাত্রীদের বিদ্যালয় ত্যাগের হার কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ঝড়ে পড়া ছাত্রীদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। যাদেরকে এভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবেনা তাদেরকে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে'।

    এই ক্ষেত্রে যে কথাটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয়গুলো থেকে ছেলে এবং মেয়েদের ঝরে পড়ার কারন. ধরন এবং সংখ্যা কোনটিই এক নয়। আবার প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুল  এবং মাধ্যমিক স্কুল থেকে মেয়ে শিশু ঝরে পড়ার কারনও  অনেকাংশেই ভিন্ন। তাই মেয়ে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া কমানোর জন্য ছেলে শিক্ষার্থীর মতো শুধূমাত্র বৃত্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করা যাবেনা। একে পৃথকভাবে দেখা একান্তভাবেই প্রয়োজন।  

    অধ্যায় ২ (প্রাক প্রাথমিক এবং প্রাথমিক শিক্ষা) অংশের ১৪ নং ধারাটির দ্বিতীয় ভাগে যুক্ত হওয়া অংশটি গুরুত্বপূর্ণ। হিসাব-মতে মাধ্যমিক পর্যায়ে ৬ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী বখাটেদের উৎপাতে স্কুল ছাড়ে। শুধু তাই নয়, মেয়ে শিক্ষার্থী এবং নারী শিক্ষক উভয়কেই যেন উত্যক্ত করতে না পারে সেই বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করবে সে-বিষয়ে কোন নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। নারী শিক্ষা অধ্যায়ের ১ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে 'বাজেটে নারীশিক্ষা খাতে নির্দিষ্ট বরাদ্দ দিতে হবে। শিক্ষার সকল স্তরে নারীশিক্ষার হার বাড়ানোর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে এবং বেসরকারি উদ্যোগ ও অর্থায়নকে উৎসাহিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।' কিন্তু নারী শিক্ষার জন্য নির্দিষ্টভাবে অর্থনৈতিক সহায়তার কথা বলা হলেও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পদক্ষেপের ধরনের কথা বলা হয়নি। বলা হয় যে সামাজিক নির্মানের পাশাপাশি একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে সামাজিক লিঙ্গীয় ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে পাঠ্য পুস্তক থেকে। বিশেষ করে অংকের মতো বিষয়ে যেখানে উল্লেখ থাকে, 'একজন পুরুষ সমান দুইজন নারী'র মতো হিসেবের বাহানা। এই বিষয়ে যদিও একটি ধারা আছে যেখানে বলা হয়েছে, 'প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে পাঠ্যসূচিতে যথাযথ পরিবর্তনের মাধ্যমে নারীর ইতিবাচক ও প্রগতিশীল ভাবমূর্তি ও সমান অধিকারের কথা তুলে ধরতে হবে এবং ইতিবাচক দিকগুলো পাঠ্যসূচিতে আনতে হবে, যাতে নারীর প্রতি সামাজিক আচরণের পরিবর্তন হয়।' ( ধারা ৫, নারী শিক্ষা, অধ্যায় ১৭)। কিন্তু এর সঙ্গে বইতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ছবি ( যেখানে নারী-পুরুষকে সমানভাবে উপস্থাপণ করা হবে), উদাহরন এবং ভাষার ক্ষেত্রে লিঙ্গ নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করার দিকে দৃষ্টি দেয়া জন্য শিক্ষা নীতিতে একটি ধারা যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। 

    এই অধ্যায়ের ৬ নং ধারাটিও আলোচনার দাবী রাখে যেখানে বলা হয়েছে  ' প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে আরও অধিক সংখ্যক মহীয়সী নারীর জীবনী ও নারীদের রচিত লেখা অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।' সেক্ষেত্রে একটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন তা হলো এটি যেন ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা শ্রেনী নিরপেক্ষ হয়। এই অধ্যায়ের ৭ এবং ৮ নং ধারাতে অবশ্য প্রশংসনীয় দুইটি ধারা আছে - এতে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে "জেন্ডার স্টাডিজ" এবং প্রজনন-স্বাস্থ্য অন্তর্ভূক্ত করা এবং  মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে বিষয় নির্বাচনে মেয়ে ও ছেলে নির্বিশেষে সকলের পূর্ণ স্বাধীনতা রাখা এবং সকল বিষয়ের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বলা হয়েছে, মেয়েদের কোন বিশেষ বিষয়ের দিকে (যেমন গার্হস্থ্য অর্থনীতি) উৎসাহিত করা বা ঠেলে দেয়া যাবে না। এই অধ্যায়ে আরও কিছু ইতিবাচক অনুচ্ছেদ রয়েছে, যার মধ্যে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে ছাত্রীদের যাতায়াত ও বাসস্থানের সুবিধা, বিজ্ঞান ও পেশাদারী শিক্ষার  সুবিধা , স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাসহ নীতি নির্ধারনী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রনীত যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতন সংক্রান্ত প্রনীত বিধি-বিধান কঠোরভাবে অনুসরন করার জন্য নির্দেশ। তবে লক্ষনীয় বিষয় হলো নারী শিক্ষার প্রস্তাবনাতে খেলাধূলার প্রসঙ্গ নেই। এই শিক্ষানীতির ১৯ নং অধ্যায়ে রাখা হয়েছে ক্রীড়া-শিক্ষা। সেখানেও নারীর খেলাধূলার কোন বিষয় নেই। এর বাইরে আরেকটি অধ্যায় রাখা হয়েছে 'বিশেষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা, স্কাউট ও গার্লস গাইড এবং ব্রতচারী' নামে (অধ্যায় ১৮)। এখানে মেয়ে এবং ছেলেদের জন্য শুধূমাত্র একটি ধারা আছে সেটি হলো 'শরীর চর্চা বিষয়ে প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক শিক্ষা দিতে হবে' (অনুচ্ছেদ ২)। শারীরিক শিক্ষা এবং খেলাধূলা কিছুতেই এক নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্কুল মাঠে শুধূ ছেলে শিক্ষার্থীরাই খেলে। খেলাধূলার বিষয়টি অনেকাংশেই লিঙ্গীয় পক্ষপাতমূলক। স্কুল পর্যায়ে লিঙ্গ নিরপেক্ষ খেলাধূলা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। যাতে মেয়ে এবং ছেলে উভয়ই খেলাধূলা করার সুযোগ পায়। কারন শারীরিক সুস্থতা সকলেরই প্রয়োজন। শিক্ষা-নীতিতে নারীদের খেলাধূলার প্রতি জোর দেয়া দরকার ছিলো।  

    খসড়া শিক্ষা-নীতিতে শিক্ষার বিষয় বিষয় নির্বাচনে নারীর জন্য স্বাধীনতা নিশ্চিতের ঘোষণা থাকলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু-কিছু বিষয় ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক থাকতে পারে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাধারন আইন (যাতে আইন সম্পর্কে মানুষের সাধারণ ধারণা জন্মে, রাষ্ট্রীয় অপরাধ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে পারে), কৃষি, ব্যবসা ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ কিছু বিষয়। এই শিক্ষানীতিতে বাদ পড়েছে 'তৃতীয় লিঙ্গ' বা নারী-পুরুষ এর বাইরে যাদের যৌন পরিচিতি রয়েছে (যাদেরকে স্থানিক নামে 'হিজড়া' বলা হয়) তারা। আমরা সকলেই কম বেশি জানি যে, বাংলাদেশে এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কোন ধরনের শিক্ষার সুযোগ নেই। অথচ ভারত, নেপালসহ অনেক দেশেই রয়েছে এদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ। এবারের শিক্ষা-নীতিতে এদের শিক্ষার বিষয়টি যোগ হওয়া একান্তভাবে প্রয়োজন। বৈষম্যহীন সমাজ তৈরী করাই হওয়া উচিৎ শিক্ষা-নীতির লক্ষ্য। 

     জোবাইদা নাসরীনঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

     ০৪ অক্টৌবর ২০০৯  

     

     

     

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন