• পথের শেষ কোথায়/৩ মুক্তিযোদ্ধারা আমার রুটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন
    লিখেছেন: 
    মিনার মনসুর

    অবশেষে দিনটি এসেই গেল। বাতাসে শীতের মিষ্টি আমেজ। সবুজ ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে রঙ ছড়াচ্ছে সূর্যের নরম আলো। গলির মোড়ে ভাঁপা পিঠাওয়ালাকে ঘিরে জমে ওঠেছে ছোটখাটো ভিড়। ডিসেম্বরের আর সব দিনের মতোই একটি দিন। কিন্তু আশ্চর্য সুন্দর। অবশ্য সেই সৌন্দর্য কতোটা বাইরের আর কতোটা আমার সদ্য মুক্তি পাওয়া মনের তা বলা কঠিন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বড়ো ভাইরা বলাবলি করছিলেন যে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে নাকি এমন দিন কখনও আসেনি, ভবিষ্যতেও আর আসবে কিনা সন্দেহ। কবুল করতে দ্বিধা নেই যে আমি তখন এ-কথার অর্থ বুঝিনি। এখন, ১৯৭১এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে তিনযুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে, আমার মনে হয় যে আবেগে-উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে থাকা সেদিনের সেই তরুণ-যুবকেরা এতোটুকু বাড়িয়ে বলেন নি।

    আগের দিনও কিছুটা সংশয় ছিল। বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছিল নানা গুজব। কেউ কেউ বলছিলেন যে সপ্তম নৌবহর এলো বলে! পাকিস্তানের বন্ধু চীনও নাকি ছুরিতে শান দিচ্ছে! রাতে ভারতীয় যুদ্ধবিমানগুলো নির্বিবাদে টহল দিয়েছে চট্টগ্রামের আকাশে। বোঝা যাচ্ছিল যে হামলা নয়, ভীতিপ্রদর্শনই তাদের আসল উদ্দেশ্য। পাকিস্তানিদের অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গানগুলোর শক্তি যে একেবারেই ফুরিয়ে এসেছে তাও বুঝতে কারো অসুবিধা হচ্ছিল না। তবে পরের দিন সকালেই যে আমাদের জীবনের অভূতপূর্ব ঘটনাটি ঘটে যাবে বেশিরভাগ সাধারণ মানুষই তা ভাবতেও পারেন নি। আমার অবশ্য গোপন একটু প্রস্তুতি ছিল ভেতরে-ভেতরে।

    আলস্য আমার চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও মনটা চিরকালই মেঘের সঙ্গী। যদি কোনো দিন দেশ সত্যি-সত্যি স্বাধীন হয় সেদিন আমি কী করবো সেটা আমি বহুবার মনে-মনে ভেবেছি। কিন্তু কোনো কুল-কিনারা করতে পারি নি। কারণ 'স্বাধীনতা' নামক জাদুকরি শব্দটির সঙ্গে আমার মনের বুঝাপড়া তখনও অসমাপ্তই রয়ে গেছে। তবে বহু কষ্টে ৪০টি টাকা জমিয়ে রেখেছিলাম। সম্ভবত 'কায়েদে আযম' মুহম্মদ আলী জিন্নাহ'র ছবি-সংবলিত ৪টি নতুন ১০ টাকার নোট। শৈশবে আমার অতি প্রিয় একটি খাবার ছিল 'নেহারি' (গরুর নলা বা পায়ের হাঁড় দিয়ে তৈরি এক ধরনের স্যুপ যা চট্টগ্রামে খুবই জনপ্রিয়) ও নান রুটি। আমি ভেবেছিলাম, দেশ যেদিন স্বাধীন হবে সেদিন আমি মন ভরে নেহারি দিয়ে নান রুটি খাবো! আমি সত্যিই তাই করেছিলাম।

    একাত্তরের বেশির ভাগ সময়ে মা ছিলেন গ্রামের বাড়ি পটিয়ায়। আমি আর বাবা ছিলাম চট্টগ্রাম শহরে। আমরা খুব কষ্টে ছিলাম। আলুভর্তা-ডাল অথবা শুধু খেসারির ডাল আর কাঁকরভর্তি মোটা চালের ভাত খেয়ে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। সেই চাল-ডাল কেনার মতো টাকাও ছিল না বাবার হাতে। টাকাই ছিল বাবার আসল চালিকাশক্তি। হাতে প্রচুর টাকা না থাকলে বাবা খুব বিমর্ষ হয়ে পড়তেন। একাত্তরের দিনগুলোতে বাবার সেই বিমর্ষতার আমি ছিলাম নিত্য-সঙ্গী। চাল-ডাল কেনার জন্য বাবা আমাকে গুনে-গুনে পয়সা দিতেন। তাছাড়া বাসায় কদাচিৎ কেউ আমাদের দেখতে আসলে আমাকে দু'এক টাকা দিতেন গোপনে। সেই পয়সা থেকে বিন্দু-বিন্দু করে আমি টাকাগুলো জমিয়েছিলাম। বাসা থেকে বেরুলেই নানা ধরনের লোভনীয় খাবার আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতো। কিন্তু সব প্রলোভন উপেক্ষা করে টাকাগুলো আমি আগলে রেখেছিলাম যক্ষের ধনের মতো।

    ষোলই ডিসেম্বর খুব ভোরে আমাদের ঘুম ভাঙে আকাশ-কাঁপানো 'জয় বাংলা' শ্লোগানে। সেই শ্লোগানই আমাকে জানিয়ে দেয় আজকের দিনটি আর দশটি দিনের মতো নয়। কাল-বিলম্ব না করে জমানো টাকাগুলো পকেটে নিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে আমি বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু রাস্তায় পা দিয়েই হতবাক হয়ে যাই। একেবারে অচেনা এক বাংলাদেশকে আমি হেঁটে যেতে দেখি আমার চারপাশে। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে বসে লেখা শামসুর রাহমানের 'বন্দী শিবির থেকে' কাব্যগ্রন্থের অবিস্মরণীয় সেই পংক্তিমালার মতো পাহাড়-পর্বত, বনবাদাড়, নদী ও সমুদ্র ভেঙে দলে-দলে তারা আসছেন - আমাদের অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা। শতচ্ছিন্ন পোশাক। শীর্ণ দেহ। উস্কুখুস্কো চুল। মুখভর্তি দাঁড়ি। অনেকেরই খালি পা। কারো-কারো মাথায় গামছা বাঁধা। তাও বিবর্ণ। প্রত্যেকেরই হাতে বন্দুক। বন্দুকের ডগায় স্বপ্নের মতো উড়ছে মানচিত্রখচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। কেউ-কেউ দু'হাত উঁচু করে তুলে ধরেছেন পতাকা-শোভিত সেই বন্দুক। পতাকার মতো সেই মানুষগুলোও যেন উড়ছিল আমাদের চারপাশে। তাদের চোখেমুখে উপচে পড়ছিল অলৌকিক এক আলো।

    রাস্তার দু'পাশে শত-শত মানুষ হাততালি দিচ্ছিল আর গলা ফাটিয়ে শ্লৌগান দিচ্ছিলো 'আমার নেতা তোমার নেতা/শেখ মুজিব শেখ মুজিব'; 'তোমার-আমার ঠিকানা/পদ্মা-মেঘনা যমুনা'। 'জয় বাংলা'। আর একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিল। টগবগ করে লাফাচ্ছিল বাঁধভাঙা জলোচ্ছাসের মতো। আমিও লাফাতে থাকি। অচিরেই সেই জনস্রোত থেমে যায়। কানায়-কানায় পূর্ণ হয়ে যায় সবক'টি সড়ক, গলি, উপগলি। ঠিক তখনই ক্ষুধায় আমার পেট চিনচিন করে ওঠে। খুব ভোরে কিছু না খেয়েই বেরিয়ে পড়েছি বাসা থেকে। একই সঙ্গে মনের পর্দায় ভেসে ওঠে নেহারি আর গরম নানরুটির লোভনীয় ছবি। আমি ঢুকে পড়ি একটি রেষ্টুরেন্টে।  সেখানেও প্রচণ্ড ভিড়। রুটি বানিয়ে কুলাতে পারছে না তন্দুরিওয়ালা।

    নেহারি সহযোগে গোগ্রাসে প্রথম রুটিটি শেষ করে যখন দ্বিতীয় রুটির জন্য অপেক্ষা করছি তখনই দেখি আমার দু'পাশে বসা লোকগুলো হাসছে মিটিমিটি। তাদের চোখ আমার দিকে। কাঁধে পতাকাশোভিত বন্দুক। আনন্দে-বিস্ময়ে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। আমার অবস্থা বুঝতে পেরেই ওদের একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, 'বাবু কী নাম তোমার?' 'মিনু'। নাম বলার পরপরই অন্য একজন আমি কোন্ স্কুলে পড়ি তা জানতে চান। এর মধ্যেই হোটেলের বয় আমার জন্য গরম রুটি নিয়ে আসে। ওরা অদ্ভুত চোখে তাকায় সেই রুটির দিকে। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কী যেন বলে। অর্ডারের জন্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বয় চলে যায়। এর পরই তাদের মধ্যে শুরু হয় খোলামেলা তর্ক। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে তাদের গলার স্বরও।

    বস্তুত তারা খুব ক্ষুধার্ত ছিলেন। দেখেই বোঝা যায়, বহুদিন তাদের ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়া হয় নি। কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। তাই হোটেলে ঢুকেও রণাঙ্গনের অকুতোভয় এই মানুষগুলো মনস্থির করতে পারছিলেন না যে কী করবেন বা কী করা উচিত। একজন বাকী খাওয়ার কথা বলছিলেন তো অন্যজন প্রবলভাবে বাধা দিচ্ছিলেন। বলছিলেন যে এতে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণার সৃষ্টি হবে। শত্রুরা সে সুযোগ নেবে। শেষ পর্যন্ত ওরা যখন কিছু না খেয়ে উঠে যাওয়ার তোড়জোড় করছিল তখন ওদের জন্য আমার খুব মায়া হয়। চোখ ভরে যায় জলে। কিছু একটা করার জন্য আমি অধৈর্য হয়ে পড়ি।

    এক পর্যায়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে আমি বলি যে আমার সঙ্গে অনেক টাকা আছে। আমার টাকা দিয়ে ওরা খেলে আমি খুব খুশি হবো। প্রথমে তারা কিছুতেই রাজি হন না। আমি তখন তাদেরকে আমার টাকা জমানোর কাহিনীটি খুলে বলি। বলি যে আজকের এই দিনটির জন্যই আমি টাকাগুলো জমিয়ে রেখেছিলাম। আমার চোখ দিয়ে তখনও অঝোর ধারায় ঝরে পড়ছিল লোনা জল। অবশেষে তারা খেতে রাজি হন। তবে শর্ত ছিল যে এ টাকা আমাকে অবশ্যই ফেরৎ নিতে হবে। আমার বাসার ঠিকানাও জেনে নেন তারা। আমি তাদের সব শর্তই মেনে নিয়েছিলাম। কারণ সেদিন আমি যে আনন্দ পেয়েছিলাম তা আমি কোনোদিন ভুলবো না। সেই চারজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আমার আর কখনও দেখা হয় নি। তাদের নাম-ঠিকানা কিছুই জানি না। তবে এখানে বলা রাখা ভালো যে সবাই মিলে পেট পুরে নেহারি-রুটি ও চা খাওয়ার পরও আমার কয়েকটি টাকা বেঁচে গিয়েছিল।

    ২.

    আমার বড়ো বোনের হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল। সেই সঙ্গে ছিল তার প্রবল কাব্যপ্রীতি। টুকরো-টুকরো কবিতা শাদা কাপড়ে রঙ্গিন সুতো দিয়ে লিখে সুন্দর করে ফ্রেমবদ্ধ করে তিনি সেগুলো সাজিয়ে রাখতেন আমাদের বসার ঘরে। শৈশবেই সেগুলো আমার মনে যথেষ্ট ছায়া ফেলেছিল। এ রকম চার পংক্তির একটি কবিতার কথা আমার এখনও খুব মনে আছে। সেটি হলোঃ

    ফুরায় যে সুখ, ফুরায় যে দুখ,

    না ফুরায় শুধু আশা।

    আমি যতবার গড়ি,

    ততবার শুধু ধূলায় ধূলির বাসা।

    আমার ধারণা, মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে আমাদের আকাশচুম্বী স্বপ্নও যে এতো তাড়াতাড়ি ধূলিসিক্ত হবে তা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি। অন্যরা কে কী ভেবেছিলেন জানি না, তবে এটুকু মনে আছে যে আমার ছোট্ট চৌহদ্দির ভেতর স্বাধীনতাপাগল যে মানুষগুলো বসবাস করতেন তারা খুব মুষড়ে পড়েছিলেন। সমগ্র দেশ নিয়ে ভাবার মতো ক্ষমতা আমার ছিল না। কিন্তু ছোট ছোট কয়েকটি ঘটনা আমার মনে খুব দাগ কেটেছিল। সদ্য স্বাধীন দেশটির ভবিষ্যত নিয়ে আমি খুব ভীত হয়ে পড়েছিলাম। এ প্রসঙ্গে সবার আগে বলতে হয় আমাদের মহল্লার ভূঁইফোঁড় দু'জন যুবকের কথা। এদের একজন ছিল স্থানীয় এক নামজাদা উকিলের বখে যাওয়া ছেলে। প্রায় ছয় ফুট লম্বা। গায়ের রং আপেলের মতো। দেখে পাকিস্তানি সিনেমার নায়কের মতোই মনে হতো। চুলও আঁচড়াতো সেভাবে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাকে দেখেছি হিন্দুর সম্পত্তি লুটে অংশ নিতে। রাজাকারদের হুড তোলা জিপে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে। স্বাধীনতার পর রাতারাতি সে হয়ে যায় মস্তবড়ো মুক্তিযোদ্ধা। ওয়েস্টার্ন স্টাইলে কাউবয়ের পোশাক পরে প্যান্টের দু'দিকে দুটো পিস্তল ঝুলিয়ে সে দাপিয়ে বেড়াতো পুরো মহল্লা। হাতে স্টেনগান নিয়েও প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করতে দেখেছি আমি তাকে। প্রায় প্রতিদিনই অস্ত্র ঠেকিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী-দোকানদের কাছ থেকে জোর করে টাকা-পয়সা কেড়ে নিতো। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে সবার সামনে মারধর করা হতো। ভাঙচুর করা হতো তার দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

    দ্বিতীয়জন ছিলো বেঢপ আকৃতির ভীতিকর চেহারাধারী এক যুবক। মুক্তিযুদ্ধের আগে সে স্থানীয় একটি স্টুডিওতে ফাই-ফরমাশ খাটতো। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও তাকে আমি একই কাজ করতে দেখেছি। স্বাধীনতার পর হঠাৎ করে তার ভোল পাল্টে যায়। পোশাক শুধু নয়, পাল্টে যায় তার আচার-আচরণও। রাতারাতি সেও বনে যায় মস্তবড়ো এক মুক্তিযোদ্ধা। হাতে অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করতো। লুটপাট চালাতো। গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতো পাড়া-প্রতিবেশি এমনকী পথচারীদের সঙ্গেও। যে দোকানে সে চাকরি করতো মালিককে বের করে দিয়ে সে দোকানটিও একদিন সে দখল করে নেয় সবার সামনে। ভেতরে-ভেতরে ফুঁসলেও সাধারণ মানুষ ভয়ে কিছু বলতেন না। কিন্তু পুলিশ কিংবা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও কেন দিনের পর দিন নীরবে এ উৎপাত সহ্য করলেন তা আজও আমার কাছে এক রহস্যই থেকে গেছে। আর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই বা তখন সরব হলেন না কেন তাও বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে। সব মিলিয়ে, একদিনের জন্যও মুক্তিযুদ্ধ না করে এই দুই ভূঁইফোড় যুবক মুক্তিযোদ্ধার নামে আমার চেনা পরিপার্শ্বটিকে প্রায় নরকে পরিণত করেছিল।

    সেই নরকের আগুনের আঁচ কমবেশি সকলের গায়েই লেগেছিল। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের পক্ষে চলাফেরাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। নামজাদা সেই উকিলের ছেলের ডাকে সাড়া দেয়নি বলে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা হয় কলেজ-পড়ুয়া একটি মেয়েকে। ভীত-সন্ত্রস্ত পথচারীদের সামনে কেটে নেয়া হয়েছিল তার মাথার দীর্ঘ চুল। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছিল আমাদের মহল্লার একটি পূজা-মণ্ডপে। সম্ভবত সেদিন ছিল স্বরসতী পূজো। পূজোর সময়ে তখন সমগ্র চট্টগ্রাম পরিণত হতো উৎসবের নগরীতে। আমাদের হিন্দু বন্ধুদের পাশাপাশি আমরাও ভালো জামা-কাপড় পরে ঘুরে-ঘুরে সব পূজা-মণ্ডপ দেখতাম। নারকেলের নাড়ুসহ হরেক রকম মিষ্টি খেতাম বন্ধুদের বাড়িতে। নাচেও অংশ নিতাম কদাচিৎ।

    দেবীকে ঘিরে তখন নাচ-গান চলছিল। উপচে পড়া ভিড় চারপাশে। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে যখন তা উপভোগ করছি, ঠিক তখনই বেঢপ আকৃতির ভয়াল দর্শন দ্বিতীয় যুবকটির নেতৃত্বে কয়েকজন গুন্ডা সেখান থেকে অল্পবয়েসী একটি মেয়েকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায়। মেয়েটির কিশোর বয়েসী ভাই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয়। একটু আগেও যে কিশোরটি দেবীর সামনে দেবশিশুর মতো নাচছিল তার রক্তে ভিজে যায় দেবীর অনিন্দ্যসুন্দর মুখটি। যুবকটি নিজেও ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়ের। এ ঘটনায় আমি এতোটাই বিমর্ষ হয়ে পড়ি যে পরপর কয়েকটি রাত একটুও ঘুমাতে পারি নি। সেই রাতে 'ঈশ্বর' নামে একটি দীর্ঘ কবিতাও লিখেছিলাম। সামান্য একজন মস্তানের হাত থেকে দেবী কেন তার নিরপরাধ ভক্তকে রক্ষা করলেন না বা করতে পারলেন না  আবহমানকালের সেই শ্বাশত প্রশ্নটি আবারও প্রতিধ্বনিত হয়েছিল আমার সেই সামান্য কবিতায়।

    সবচেয়ে আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতাটি হলো যে অসাম্প্রদায়িকতা ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি তাও প্রবলভাবে টলে উঠেছিল। অচিরেই গ্রামের বাজারে তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমি তার বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশও লক্ষ করেছি। সেটা পরে এক সময় বলা যাবে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ঈদের জামাতে বোমা নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছিল চট্টগ্রামে। প্রথম ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলেও পরের ঘটনাটি যে সুপরিকল্পিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সরকার ও প্রশাসনের নানা দুর্বলতাকে পুঁজি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অপ-রাজনীতির দক্ষ দাবাড়ুরা যে পুরো মাত্রায় তৎপর হয়ে উঠেছিল তা তখনই স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। লক্ষ্য নিয়েও তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র বিভ্রান্তি ছিল বলে মনে হয় না।

     

    ৩.

    মুজাফফর ভাই (আসল নাম নয়) ছিলেন আমার বড়ো ভাইয়ের বন্ধু। তাঁর এ রকম ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ৫/৭ জনকে আমি খুব ভালো করে চিনতাম। আমাদের বাসায় ওদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তারা আমাকে খুব আদর করতেন। প্রশ্রয়ও দিতেন যথেষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ওরা চট্টগ্রাম সিটি কলেজে পড়তেন। গণঅভ্যূত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে তারা ছিলেন ছাত্রলীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। ঘরে-বাইরে তুমুল প্রতিকূলতার ভেতরেও তারা আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। সংবাদপত্রের পাতায় আইয়ুব-বিরোধী শ্লোগান লিখে রাতের অন্ধকারে তা সাঁটিয়ে দিতেন শহর-ব্যাপী। আর এ কাজে আমিও ছিলাম তাদের একজন বিশ্বস্ত শিশু-সহযোগী। ঊনসত্তরের প্রবল গণঅভ্যুত্থানের তোড়ে মুসলিম হাইস্কুলের আরও কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে আমিও ভেসে গিয়েছিলাম একাধিকবার। তারপর পুলিশের পিটুনি ও ইঁটপাটকেলের মধ্যে পড়ে রাস্তায় যখন হাউমাউ করে কাঁদছিলাম তখন অকস্মাৎ ফেরেশতার মতো এসে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন এই মুজাফফর ভাই-ই। মৃদু বকুনি আর একগাদা লজেন্স কিনে দিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন বাসায়।

    কী যে টগবগে আর উদ্যমী যুবক ছিলেন এই মুজফ্ফর ভাইয়েরা তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। পরে আমিও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। তুমুল ছাত্র রাজনীতি করেছি। নির্বাচিতও হয়েছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদে। কিন্তু নিজেকে কখনও তাদের সঙ্গে তুলনা করার দুঃসাহস আমার হয় নি। তারা ছিলেন প্রকৃত সন্তের মতোই। দেশের কল্যাণ সাধনই ছিল তাদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। পরিবারের ভালোমন্দ দূরে থাক, নিজের দিকে তাকানোর কথাও তারা কখনও ভেবেছেন বলে আমার মনে হয় নি। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান  হিসেবে তাদের অনেকেরই ঘরের দরোজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল স্বাধীনতার আগেই। থাকা-খাওয়ার কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। ছিল না পকেটে পয়সা। কিন্তু তারা কখনই দমে যান নি।

    ৪.

    অদম্য এই যুবকদের মুখে প্রথম দুশ্চিন্তার বলিরেখা ফুটে উঠতে দেখি স্বাধীনতার পর। উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতেন সারা শহর। যত্রতত্র ভূঁইফোঁড় মুক্তিযোদ্ধা আর নব্য আওয়ামী লীগারদের দাপট দেখে শুরুতে রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়লেও অচিরেই তারা সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। বাধ্য হয়েছিলেন নিজেদের গুটিয়ে নিতে। তখন চাল-ডাল ও ভোজ্য তেলের তীব্র সংকট। সংকট গুঁড়ো দুধেরও। অথচ সরকারের দেওয়া ন্যায্য-মূল্যের খাদ্য-সামগ্রীতে নব্য-ডিলারদের গুদাম ভর্তি। সাধারণ মানুষ রেশনের দোকানে সারা দিন দাঁড়িয়ে থেকেও যখন একমুঠো চাল-ডাল কিংবা গুঁড়ো দুধ সংগ্রহ করতে পারছিল না, তখন তাদের চোখের সামনে এ সব সামগ্রী পাচার হয়ে যাচ্ছিল খোলা বাজারে। আর এতে নেতৃত্ব দিচ্ছিল সশস্ত্র ভূঁইফোঁড় মুক্তিযোদ্ধার দল।

    মুজাফফর ভাইদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে অস্ত্র হাতে তারা এই নব্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের কঠিন সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলেন। তবে এ নিয়ে তাদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধাও ছিল। দু'একজন চাচ্ছিলেন আগে বিষয়টি সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে জানাতে। কী কারণে জানি না শেষ পর্যন্ত তাদের সেই উদ্যোগও সফল হয় নি। সব মিলিয়ে, শামুকের মতো গুটিয়ে গিয়েছিলেন সুদীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা টগবগে, অপরাজেয় এই যুবকগুলো। সারাক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতেন। হঠাৎ শুনলাম, তাদের মধ্যে দু'জন একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন। আর দু'জন পাড়ি জমিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। ব্যতিক্রম শুধু মুজাফফর ভাই। তিনি কোথাও গেলেন না। কিছুই করলেন না। চুপচাপ ঘরে বসে থাকতেন কবি নজরুলের মতো ঝাঁকড়া চুলের প্রাণবন্ত মানুষটি। মাঝেমধ্যে আমাদের বাসায় এলেও কোনো কথাই বলতেন না।

    একদিন সকালে মুজাফফর ভাইয়ের মৃতদেহ পাওয়া গেল তার নিঃসঙ্গ চিলেকোঠার ঘরে। বাংলাদেশের অনাগত দিনগুলোর মতো সেটি ঝুলছিল খুবই করুণ ও অনিশ্চিত ভঙ্গিতে।

    minarmonsur@gmail.com

    আপলৌডঃ ২০ অক্টৌবর

     

    পথের শেষ কোথায়/২
    http://portal.ukbengali.com/?q=node/238

    পথের শেষ কোথায়/১
    http://portal.ukbengali.com/?q=node/139

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

চাঁটগা শহরের এক কিশোরের চোখ দিয়ে দেখা সদ্যোজাত বাংলাদেশের যে (অ)করুন চিত্র আপনি ফুটিয়ে তুলেছেন মিনার মনসুর তা মনটাকে ঝিম ধরিয়ে রেখেছে। সমাজ কিংবা রাষ্ট্র নিয়ে লেখতে গেলে রুখো-কঠিন বাস্তবতার নাম করে কেউ-কেউ লেখার মধ্যে শিল্প-শৈলীকে 'প্রশ্রয়' দিতে চান না; আপনি দিয়েছেন। এজন্য আপনার লেখাটি আমার কাছে সাহিত্য; না হলে এটা হয়ে উঠতো নিছক এক টুকরো প্রবন্ধ। অনেক শুভেচ্ছা নিন মিনার মনসুর।

Prothomei ovinondon oshadhron ai lekha tik jonno......
Keno jeno barbar mone hoy...
akei 'Itihash er Punorabritti' bole kina?
naki 'Itihash er Pounoponikota'.... kisu Othorbo manush er ki bhishon DAPOT.... !!!

লেখাটি খুব সুন্দর ও হ্রদয়গ্রাহী হয়েছে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন