
আপনি যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক,
ঐ জায়গা থেকে পূর্বদিকে সোজা কালো
পিচঢালা যে রাস্তাটি ডানের গলির ভেতর ঢুকে
গেছে; যেমনটি যায় আমাদের স্বপ্ন
অজানা কোন শোলে ইদুরের গর্তে;
আপনাকে যেতে হবে ঐ রাস্তায় ।
ঐ রাস্তা ধরে ডানে একটা পার্লার রেখে বামের রাস্তায় যখন এসে পড়বেন
নিশ্চয় মুখে অতিরিক্ত পাউডার দেওয়া স্থূলাকার
এক রমণীর সাথে দেখা হবে-
উনি মুক্তা বানু । অন্তত গত চার বছর ধরে
শুধু এ এলাকার মানুষই নয়, গলির
মোড়ে যে পাগলটা রোজ পল্টনের ময়দানে
ঈশ্বরের বিচার করে গণআদালতে সেও
ওকে মুক্তা বানু বলে জানে
মুক্তা বানুকে পেছনে রেখে বিসমিল্লাহ্ হোটেল
ডানে রেখে রুপনগরের রুপহীন
এক কঠিন মাটিতে আপনাকে দাঁড়াতে হবে । ওখানটায় ষাটোর্ধ্ব
মাথায় কাঁচা-পাকা চুল নিয়ে কিছুদিন আগেও
ছিলেন কম. চৌধুরী ।
কম. চৌধুরী যিনি কমসে কম ষাট
বা তার অধিক শীত-গ্রীস্ম-বর্ষা-শরৎ
হেমন্ত এবং অবশ্যই বসন্তে
বেঁচে ছিলেন এবং রাষ্ট্রের এতো ভালোবাসা, গণতন্ত্র
পায়ে দলে কিংবা বলতে পারেন
উপেক্ষা করে বেঁচে ছিলেন এবং একই সাথে আমাদের অনেক
শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্রীদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন ।
সেই কম. চৌধুরীর বাসাতে ঢুকলে প্রথমে যা দেখা
যাবে, তাকবিহীন ঘরভরা বই ।
মার্কস-লেনিন সাহেবের সব সংকলন।
মাও সেতুংয়ের যুদ্ধ বাঁধানো লাল বই
ইতিহাস আর দর্শন কেমন ফুরফুরে ভাবে
চেয়ে আছে ঘরের একমাত্র জলরঙের চিত্রের দিকে ।
ছড়ানো ছিটানো মার্কস-লেলিন-মাও সেতুংয়ের মধ্যে সঞ্চয়িতার
ক'টা পাতা এখনো খোলা ।
আপনি যদি খুব ভালো করে লক্ষ্য করেন
তাহলে দেখতে পাবেন ঘরের মধ্যে খেজুরপাতার
একটা পাটি ব্যতীত বসবার কিংবা
ঘুমাবার কোন ব্যবস্থা নেই ।
সাদা-পাকা চুল নিয়ে ষাট বা ততোধিক
অবগাহনের কাল পেরিয়ে কম. চৌধুরী কি তবে
সবুজ ফসলের মাঠে একটি ফিঙ্গের কালো পাখা হয়ে
ধান পোকাদের গোপন ব্যাথা বনে সটান
কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন?
ঠিক এই ঘরটায় তিনি
পাতার পর পাতা কলমবন্দি করেছেন,
তাঁর সেইসব অগণিত লেখনির মাঝে কোন প্রেমপত্র ছিলো কিনা
এ বিষয় স্পষ্ট করে বলা কঠিন;
কারণ রাষ্ট্র নামক সুন্দর পরিশীলিত এবং
অবশ্যই গণতন্ত্রী এই প্রতিষ্ঠান তাঁর নিরীহ মানবিক দূত দিয়ে
সেসব আলামত সুষ্ঠু ও
সুবিচারের জন্য বহু যত্ন করে
সংবরণ করেছেন ।
কম. চৌধুরী কখনো ঝুম বর্ষায় ভিজতে
চেয়েছিলেন বা কখনো ভিজেছেন কিনা আমাদের
জানা নেই; তবে তাঁর ঘরের জল রঙের
চিত্রকর্মে যে কিশোরীর অবয়ব, তার চোখে
বৃষ্টির পানি ছিল আর পেছনের আকাশটা নীল
আপনাকে এ পর্যন্ত এসে থেমে যেতে হবে
কেননা আপনি আর কিছুই দেখতে
পাবেন না । এবার আপনার সামনে
গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র প্রেসনোট ধরিয়ে দেবেঃ
'গতকাল রাতে চরমপন্থী নেতা মোফাখখারুল ইসলাম চৌধুরী
তার গোপন অস্ত্র ভান্ডার পুলিশকে
দেখিয়ে দিতে নিয়ে গেলে, ওঁত পেতে থাকা
সন্ত্রাসীরা পুলিসের উপর গুলি বর্ষণ করে
পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়
এসময় চৌধুরী পলায়নকালে ক্রসফায়ারে পড়ে নিহত হয়'
তবে গভীর রাতে উঁইডিবির পরে
যেখানটায় দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্রের
দূতেরা তাঁকে বলেছিলো : দৌড় দাও ।
আর কম. চৌধুরী তাঁর দরাজ কন্ঠে
শেষ রাতের নীরবতার বুকে হাতুড়ি মেরে বলেছিলো :
'বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক'
তাঁর সেই চিৎকারে খোয়াবে সঙ্গমে প্রার্থনারত
মানুষ ও অমানুষের কলিজায় আগুন ধরে গিয়েছিলো
আর শান্তির মানবিক দূতেরা রবীন্দ্র সংগীতের
মত কোমল অস্ত্রের ট্রিগার টিপতে কমপক্ষে
দশ সেকেন্ড ভুলে গিয়েছিলো ।
যার চোখে খেলা করে ফসলের শীষ
নারীর হৃদয় ভোগ্য নয় আর
ফ্লাট বাড়ির শেকল পরানো আকাশ থেকে মুক্ত হবে
উত্তর-কৈশোর
যুবক-যুবতী স্বপ্ন দেখবে একটি
বর্ষণমুখর দুপুরের
সে চোখ একজন চরমপন্থীর,
একজন মোফাখখার চৌধুরীর
কিংবা বলতে পারেন একজন খুনি
মাতালের চোখ ।
ঋত্বিক নামের যে মানুষটিকে তিনি
শেষ ফোনে বলেছিলেন : তোমরা ভালো থেকো ।
কম. চৌধুরী কি জানতেন না, গণতন্ত্রের সোনার দেশে
আমরা সবাই রাঙা রাজপুত্র ।
আমাদের ভাতের কষ্ট নেই,
ভোটদানের কষ্ট নেই
এমনকি ভালোবাসার কষ্টও নেই;
তিনি কী জানতেন না, আমরা সবাই
ভয়াবহ ভালো আছি ।
আপনাকে এই ফ্লাট বাড়ি থেকে নেমে
সব ভুলে যেতে হবে
কেননা খোয়াবে অথবা সঙ্গমে যদি
কখনো কম. চৌধুরী আপনাকে ভর করে
তবে কোন এক শীত কিংবা বসন্তের রাতে
মানবিক শান্তির দূতেরা
তাদের কোমল অস্ত্র আপনার বুকে
ঠেসে ধরবে আর পরের দিন
ছাপানো কাগজে বড় বড় অরে লেখা থাকবে :
ক্রসফায়ারে চরমপন্থী নেতা নিহত ।
কে না জানে এই শান্তিপ্রিয় মানবিক
গণতন্ত্রী রাষ্ট্রের বিরোধিতা মানেই
সন্ত্রাসবাদ আর ক্রসফায়ার!
১৯/১১/০৯
![]()


শূন্য দশক
শূন্য দশক নামের যে বিকারগ্রস্ত কবিতার চর্চা (!?) বাংলাদেশে চলছে সেইসব কবিদের জন্য মোহাম্মদ আরিফুজ্জামানের এই কবিতাটি সত্যিই আলোর জানালা খুলে দিয়েছে।কবিকে এভাবে নাড়িয়ে দেবার জন্য আন্তরিক ধন্যবাম