• জাতীয় কমিটির যুক্তরাজ্য শাখার সেমিনার লন্ডনে
    আশফাক চৌধুরী

    ১৪ই নভেম্বর '০৯ শনিবার পূর্ব-লন্ডনের লন্ডন গিল্ডহল কলেজের সেমিনার কক্ষে বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি যুক্তরাজ্য শাখা আয়োজিত সভায় সমুদ্র-বক্ষে গ্যাস-ব্লক ইজারা প্রদানে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

    মাহমুদুর রহমান বেণুর সভাপতিত্বে ও শরিফুল হাসান খান বাদলের সঞ্চালনে অনুষ্ঠিত এ-সভার শুরুতে বাংলাদেশে গ্যাস উত্তোলন বিষয়ে সাম্রাজ্যবাদী লুন্ঠনের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান এবং এর ফলে সে-দেশের জনগণের সম্ভাব্য ক্ষতির দিক নিয়ে একটি তথ্য-সমৃদ্ধ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আরিফ রহমান। উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়ঃ

    বাংলাদেশে বর্তমানে তীব্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কট বিরাজ করছে। গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে রয়েছে অনেক শিল্প কারখানার উৎপাদন। জাতীয় গ্যাস গ্রীডে বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে এ-অঞ্চলে গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয়েছে, কিন্তু প্রায় ৬০ বছর পার হলেও অর্জিত হয়নি পেশাদারী দক্ষতা ও উন্নত ব্যবস্থাপনায় সক্ষম স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রযন্ত্রে দুর্নীতি, বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নীতি, দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে অকেজো করা ইত্যাদি ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের ফলাফল আজকের এ-অবস্থা।

    বিগত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তড়িঘড়ি করে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানায় ৮টি অগভীর ও ২০টি গভীর মোট ২৮টি ব্লকে ভাগ করে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। এ-উদ্দেশ্যে একটি নতুন উৎপাদন অংশীদারী চুক্তির মডেল (পিএসসি ২০০৮) ও খসড়া দরপত্র উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করা হয় এবং 'যাচাই-বাছাই' শেষে যুক্তরাষ্ট্রের কনকো ফিলিপস ও আয়ারল্যান্ডের টাল্লো নামক দুইটি কোম্পানীকে নির্বাচন করা হয়। জনগণের চাপের মুখে সে-সময়ের সরকার ইজারা কার্যক্রম চূড়ান্ত করতে না পারলেও ২০০৮ এর নির্বাচনে বিজয়ী নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই তৎপর হয় চুক্তি সম্পন্ন করতে এবং গত ২৪ আগষ্ট আনুষ্ঠানিকভাবে গভীর সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লক কনোকো ফিলিপসকে এবং অগভীর সমুদ্রের ৫ নম্বর ব্লক টাল্লোর হাতে তুলে দেয়ার জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে। এই মডেল পিএসসি বাস্তবায়িত হলে ইজারা নেয়া কোম্পানী উত্তোলিত গ্যাসের সর্বোচ্চ ৫৫% পর্যন্ত গ্যাস নিয়ে যাবে তাদের 'কস্ট রিকোভারী' হিসেবে। বাকী ৪৫% গ্যাস হলো প্রফিট গ্যাস যা কোম্পানী এবং পেট্রোবাংলার মাঝে সুনির্দিষ্ট চুক্তি অনুযায়ী দু-ভাগে বিভক্ত হবে। কিন্তু আরেক জায়গায় বলা হচ্ছে, বাজারজাতকরণের উপযুক্ত গ্যাসের ২০% এর বেশি পেট্রোবাংলা তার প্রফিট ন্যাচারাল গ্যাস বা লাভের গ্যাস হিসেবে দাবী করতে পারবে না। অর্থাৎ ইজারাপ্রাপ্ত কোম্পানীগুলো অন্ততঃ শতকরা ৮০ ভাগ গ্যাসের মালিকানা ভোগ করবে।

    প্রবন্ধে বলা হয়, তার ফলাফল হবে ভয়াবহ। কারণ অতিরিক্ত গ্যাস বাংলাদেশের অবিকশিত শিল্পখাত ব্যবহার করতে পারবে না এবং অবধারিতভাবেই অতিরিক্ত উত্তোলিত গ্যাসও রপ্তানী করতে হবে। গ্যাস অনবায়নযোগ্য ও সীমিত সম্পদ হওয়ায় একবার ফুরিয়ে যাওয়ার পর যদি শিল্প বিকাশের জন্য দরকারও হয় তখন তা আর পাওয়া যাবে না।

    উপস্থাপিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে সভায় আলোচনা করা হয় কী-ভাবে বাংলাদেশে চলমান আন্দোলনকে সাহায্য করা যায় এবং এর সমর্থনে যুক্তরাজ্যে ভূমিকা রাখা যায়। এসব প্রসঙ্গে মতামত রাখেন মাহমুদুর রহমান বেণু, ডাঃ রফিকুল হাসান জিন্নাহ, ওয়ালী রহমান, শরিফুল হাসান খান বাদল, সৈয়দ এনাম, ডাঃ বি বি চৌধুরী, ডলি ইসলাম, আবু শামসুদ্দিন,  মোহাম্মদ শামসুল হক, ডাঃ রফিকুল হাসান জিন্নাহ, ওয়ালি রহমান, হাসি খান, শাহরিয়ার বিন আলি, শেলী রহমান, এস আর আহমেদ, আবু শামসুদ্দিন, এম এ ইসলাম, নুরুল আলম, ইকবাল আহমেদ হারুন, গোলাম আকবর মুক্তা, জাহিদ কামাল, রাম সুধীর, ডলি ইসলাম, আমান উদ্দিন,  মুশফিকুর রহমান, মঞ্জুরুল আজিম পলাশ, আশফাক চৌধুরী রনি, সাদেক আহমেদ চৌধুরী সাদী, তানভীর আহমেদ, মোস্তাফা ফারুক ও মাসুদ রানা।

    সভায় সর্ব-সম্মতি-ক্রমে কেন্দ্রীয় কমিটির নিম্ন-লিখিত দাবীর সমর্থনে প্রস্তাব গৃহীত হয়ঃ

    (১) যেহেতু ৫০ বছরের জ্বালানি চাহিদার তুলনায় বাংলাদেশের স্থলভাগে ও সমুদ্রে তেল-গ্যাস-কয়লা মজুদ অনেক কম, সেহেতু কোনভাবেই তেল গ্যাস কয়লা খনিজ-দ্রব্য নিয়ে কোন রফতানিমুখী চুক্তি করা যাবে না। কোন চুক্তি হয়ে থাকলে তা বাতিল করতে হবে। জাতীয় কমিটি প্রস্তাবিত 'খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরণ আইন ২০০৯' অবিলম্বে পাশ করতে হবে।

    (২) রফতানিমুখী 'মডেল পিএসসি ২০০৮' বাতিল করে শতভাগ দেশীয় মালিকানার শর্ত রেখে নতুন নীতিমালার ভিত্তিতে তেল-গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সমুদ্রে বাংলাদেশের ন্যায্য সীমানা নির্দিষ্টকরণ ও এই এলাকায় সার্বভৌম কর্তৃত্ব নিশ্চিত করবার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

    (৩) আবাদি জমি-পানি সম্পদ-খাদ্য নিরাপত্তা ও মানুষ বিনাশী কয়লা উত্তোলনের উন্মুক্ত খনন পদ্ধতি বাতিল এবং এই পদ্ধতির পক্ষে দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং প্রতারণামূলক অপ-তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত বহুজাতিক কোম্পানী এশিয়া এনার্জিকে অবিলম্বে বহিষ্কার-সহ জনগণের সঙ্গে সরকারের স্বাক্ষরিত ৬ দফা ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। উন্মুক্ত পদ্ধতি অনুমোদনের চেষ্টায় কয়লানীতি ঝুলিয়ে না রেখে 'উন্মুক্ত না, রপ্তানি না, বিদেশী না' নীতিমালার ভিত্তিতে পরিবেশ-অনুকূল পদ্ধতি গ্রহণ করে দ্রুত কয়লা উত্তোলন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।

    (৪) স্থলভাগের ১২টি সমৃদ্ধ গ্যাস ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য চুক্তি করার পর সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলি কর্তৃক অনুসৃত নীতি তথা বর্তমান তীব্র গ্যাস সঙ্কটের সুযোগে দেশকে জিম্মি করে দীর্ঘসূত্রিতা, প্রতারণা ও অনিয়ম অবলম্বনের নীতির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সকল অসম পিএসসি-সহ বহুজাতিক কোম্পানীর সাথে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী সব চুক্তি বাতিল করে রাষ্ট্রীয় ও দেশীয় সংস্থার কর্তৃত্বে বা নিয়ন্ত্রণে খনিজ উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে হবে। মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলার দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বহুজাতিক কোম্পানীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাংলাদেশের প্রাপ্য অন্ততঃ ২০ হাজার কোটি টাকা আদায় করে বিদ্যুৎ সঙ্কট নিরসনে ব্যয় করতে হবে।

    (৫) পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, জিওলজিক্যাল সার্ভে আণবিক শক্তি কমিশন-সহ জ্বালানি-খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করবার নীতি ত্যাগ করে এ-খাতকে দুর্নীতিবাজ ও বিদেশী কোম্পানীর রাহুমুক্ত করতে হবে এবং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

    (৬) জ্বালানি সম্পদ নিয়ে এ-যাবৎ-কালে বিভিন্ন সরকারের আমলে জাতীয় স্বার্থ-বিরোধী যে-সব চুক্তি করা হয়েছে, সেগুলো প্রকাশ করতে হবে এবং এগুলো-সহ যে-সব অপ-তৎপরতার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিপর্যস্ত ও ভয়াবহ বিদ্যুৎ সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর জন্য দায়ী দুর্নীতিবাজ জাতীয় স্বার্থ-বিরোধী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

    (৭) ২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সংগঠিত জাতীয় কমিটির শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিসী হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

    আলোচনা শেষে সভাপতি মাহমুদুর রহমান বেণু বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি যুক্তরাজ্য শাখার পরবর্তি কর্মসুচি ঘোষণা করেন। কর্মসুচির মধ্যে রয়েছে ৭ দফা দাবী আদায়ে গণ-সাক্ষর সংগ্রহ। লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে গনসাক্ষর সহ স্মারকলিপি পেশ করা, ইন্টারনেটের মাধ্যমে কমিটির বুলেটিন প্রচার করা। এছাড়াও তিনি আগামী জানুয়ারী মাসে লন্ডনে আন্তর্জাতিক কনভেনশন আয়োজনের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

    ২৪/১১/০৯

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন