সংবাদ পরিক্রমা
সংবাদ প্রতিবেদন
- বাংলাদেশের সেক্যুলারিজম হচ্ছে পাঁচমিশালী সেক্যুলারিজম

ডঃ সুফিয়া আহমেদ। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংষ্কৃতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন সুদীর্ঘকাল। এছাড়াও ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে পাঠদান করেছেন তুরষ্কের বসফরাস বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের উইন্সকনসিনের আলভারণো কলেজ-এ। বাঙালী মুসলমানের সমাজ, সংষ্কৃতি ও ইতিহাস ছাড়াও তুরষ্কের সেক্যুলারিজম হচ্ছে তার আরেকটি প্রিয় গবেষণার বিষয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ। সম্প্রতি লন্ডনে ইউকেবেঙ্গলির হয়ে অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শান্তনু মজুমদার।
সাক্ষাত-পর্বের শুরুতেই ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের কারণ জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ জানান এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণ ও সাম্প্রদায়িক কারণ উভয়ই যুক্ত ছিলো। তাঁর মতে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক-সময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাথে যুক্ত থাকলেও পরে সংগঠনটি থেকে সরে আসেন; কারণ জিন্নাহর মনে হয়েছিলো মুসলমানরা বঞ্চিত হচ্ছে।
দেশভাগ অবধারিত ছিলো কি? এ-প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ বলেন, নেতৃত্ব পর্যায়ে এ-ধরনের একটা ধ্যান-ধারণা ঠিকই বিস্তৃতি লাভ করেছিলো। আসলে হিন্দু-মসুলিম নেতৃত্ব, ধর্মীয় নেতৃ-বৃন্দ আর ইংরেজ শাসকদের নানামুখী সমীকরণের ফল হচ্ছে ভারত-ভাগ। তবে কংগ্রেস নেতারা এ-ব্যাপারে অনেকটাই দায়ী। তার মতে, এসব প্রসঙ্গে সাধারণ লোকেদের কথা এনে লাভ নেই। সুফিয়া আহমেদ বলেন, স্মরণ করুন, দুই বাংলা থেকে যারা এপার-ওপার করেছেন তাদের ভয়ানক দুর্গতির কথা।

১৯৪৬ সালে পাকিস্তানের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন দিলেও ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বাংলা থেকে মুসলিম লীগ উধাও হয়ে গেলো কেনো?
মূল কথা হলো ১৯৪৭ সালের পরবর্তী সময়ে বাঙালীর আশা পূরণ করতে পারেনি মুসলিম লীগ। সাধারণ মানুষ চায় অর্থনৈতিক উন্নতি। লোকের আশা ছিলো ব্যাপক; কিন্তু মুসলিম লীগ বাঙালীদের আশা পূরণে উদ্যোগী ছিলো না। সেন্টিমেন্টাল কারণে হাজার মাইল ব্যবধানের দুটো অংশ এক হলেও, শুরু থেকেই সাংষ্কৃতিক বৈষম্য মাথা-চাড়া দিয়ে উঠলো। ধর্মকে ভিত্তি করে রাষ্ট্র-গঠনের চেষ্টা চালানোর সময় এ-ব্যাপারটি মাথায় রাখেনি মুসলিম নেতৃত্ব। আর স্বাধীনতার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের উপরে আধিপত্য কায়েম করতে শুরু করলো পশ্চিম পাকিস্তান। আসলে 'আমরা' ও 'ওরা' সাংষ্কৃতিক-সামাজিকভাবে আলাদা ছিলাম।
পাকিস্তানে সামরিক শাসনের সূচনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ জানান সে-সময়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক কোন্দলের সুযোগ নিয়েছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য-ভিত্তিক সেনা-বাহিনী। আইয়ুব খানের শাসনামলের প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের মধ্যে কিছু-কিছু পার্থক্য ছিলো বলে মত-প্রকাশ করা হলে অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ বলেন, আইয়ুবের শাসনামলের প্রথম ভাগটিতে সরকারে কিছু উদারনৈতিক লোক ছিলেন। এ-প্রসঙ্গে আইন-মন্ত্রী পদে বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীম, এ কে খান, হাফিজুর রহমানের মত লোকজনের নাম উল্লেখ করেন তিনি। শুরুর দিকে জুলফিকার আলী ভূট্টোর মধ্যে উদারনীতিবাদের কিছু ছোঁয়া লক্ষ্য করা গিয়েছিলো বলেও জানালেন সুফিয়া আহমেদ। তার মতে শাসনের দ্বিতীয় ভাগে এসে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার বাসনা থেকে প্রতিক্রিয়াশীলদেরকে সরকারে অন্তর্ভূক্ত করতে থাকেন আইয়ুব খান। উল্লেখ্য, বিচারপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব উপাচার্য মোহাম্মদ ইব্রাহীম হচ্ছেন অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদের পিতা।
আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালীদের আন্দোলন-সংগ্রাম বিশেষত ১৯৬৬ সালের ৬-দফা প্রসঙ্গে আলাপকালে সুফিয়া আহমেদ বলেন, ৬-দফার সকল কৃতিত্ব একটি দলের পক্ষে চলে যাবার প্রবনতা দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক চিন্তাবিদ, অনেক ভিশনারী এমনকি অনেক আমলা ভেতর থেকে ৬-দফার পক্ষে কাজ করেছিলেন। একই সাথে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব-পদে শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাবের ব্যাপারটিকেও গুরুত্ব দেন অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ। তার মতে নেতৃত্ব-পর্যায়ে বিরাজমান শূন্যতার ফাঁক পূরণ করে সামনে চলে আসেন শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর দূরদর্শিতা বা স্টেস্টসম্যানশীপের মান নিয়ে আমি নিশ্চিত নই; তবে তাঁর দেশ-প্রেম নিয়ে আমার মনে কোন প্রশ্ন নেই। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দেশকে সত্যিই ভালোবাসতেন। তিনি অত্যন্ত সাহসী মানুষ ছিলেন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বর্ণনায় সুফিয়া আহমেদ জানান ১৯৬৯ সালেও এসব গুনাবলীর পরিচয় দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুরের মধ্যে স্বাধীনতা-কেন্দ্রিক কোন রকমের ভাবনা কাজ করেনি বলেই মনে করেন তিনি।
১৯৭০ এর নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা-প্রবাহের ব্যাপারে মূলত জুলফিকার আলী ভূট্টোকে দায়ী করেন সুফিয়া আহমেদ। তিনি মনে করেন ভূট্টোর কারণেই নির্বাচনে জয়লাভ করা সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা তুলে দেননি ইয়াহিয়া খান; যার পরিনতিতে পাকিস্তান ভেঙে যায়। একই সঙ্গে সুফিয়া আহমেদ উল্লেখ করেন যে একাত্তরে খুব সামান্য-সংখ্যক লোক ছাড়া বাঙালীরা সকলেই ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে।
আলাপের এ-পর্যায়ে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকারের কার্যক্রমের উপরে আলোকপাতের অনুরোধ করা হয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদকে। তিনি বলেন, আমার ধারনা ছিলো সরকারের কোন পদ গ্রহন করবেন না শেখ মুজিবুর রহমান; কিন্তু তিনি পদ নিয়েছিলেন। তিনি কোন পদ গ্রহন না করে গান্ধীর মত অবস্থান গ্রহন করলে বোধহয় ভালো হতো। আরেকটা কথা হচ্ছে, আওয়ামীলীগের কিছু লোকের বাড়াবাড়ির ব্যাপারে শেখ মুজিবুর রহমানের কড়া-অবস্থান গ্রহন না করাটাকে জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। বাকশাল গঠনের ব্যাপারটিও একটি নেতিবাচক সিদ্ধান্ত ছিলো বলে মনে করেন তিনি। সুফিয়া আহমেদের মতে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আবেগী একজন মানুষ, আশেপাশের লোকজন অনেক সময় সেটির সুযোগ নিয়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম সরকারের আমলে সেক্যুলারিজমকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে গ্রহন করার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ বলেন, এটি ছিলো পাঁচ-মিশালী এক সেক্যুলারিজম যা সুবিধামত কার্যকর হয় এবং সুবিধামত কার্যকর হয় না। এ-প্রসঙ্গে তুরষ্কের কামাল আতাতুর্কের সেক্যুলারিজম ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। উল্লেখ্য, তুরষ্কের সেক্যুলারিজম ও কামাল আতাতুর্ক এর কর্মকান্ডের উপরে দীর্ঘ-দিন ধরে গবেষণা করে চলেছেন সুফিয়া আহমেদ। তুরষ্কে যথাযথভাবে সেক্যুলারিজম চালু হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকে এ-প্রসঙ্গে তুর্কী এলিটদের উপরে পাশ্চাত্যের প্রভাবের দিকটিকে বড় করে দেখাতে চান; কিন্তু এটা ঠিক নয়। আতাতুর্ক কৃষক-সমাজের সমর্থন পেয়েছিলেন যা তিনি সেক্যুলারিজম চালু থেকে শুরু করে রাজতন্ত্র উচ্ছেদসহ সংবিধান ও খেলাফত বাতিলের পক্ষে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। আতাতুর্ক এসবের পক্ষে একটানা ৭ দিন পার্লামেন্টে ভাষণ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে কিন্তু এ-ধরণের কিছুই ঘটেনি।
সুফিয়া আহমেদ এ-প্রসঙ্গে আরও বলেন, মনে রাখতে হবে সেক্যুলার তুরষ্ক ভীষন রকমের সমতাবাদী। আমি নিজের চোখে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে তার গাড়ী-চালকের সাথে বসে চা খেতে দেখেছি।
তুর্কী সাফল্যে মুগ্ধ হলেও বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমের ভবিষ্যত সম্পর্কে নিশ্চিত নন অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ। তার মতে, বিদ্যমান কুসংষ্কার, ধর্মান্ধতার সুযোগে ধর্মবাদী দলগুলো জনগনের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হচ্ছে। এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য উদারনীতিক শিক্ষা-ব্যবস্থা চালুর উপরে গুরুত্ব দেন তিনি। সাক্ষাতকারের শেষ পর্যায়ে এসে অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে মুসলমানদের বাঙালী মুসলমান আর মুসলমান বাঙালী এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। নিজেকে প্রথম ভাগের মানুষ মনে করলেও, অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদের মনে হয়ে এই ভাগটি এখন সংখ্যালঘু।
০৪/১২/০৯
সাক্ষাতকার দিয়েছেন:অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ
It's Ripan from Chittagong, Bangladesh.
I like the post because I got a picture about the history.