• বিড়াল-কুকুরের নিরাপদ ঠাঁই হুগলীর শ্রীরামপুরের বাড়ীটি
    প্রদীপ চক্রবর্তী

    সত্তরের দশকে বলিউডের 'হাতি মেরে সাথী' কিংবা কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বাদশা' ছবির কথা নিশ্চয়ই অনেকের জানা আছে। সেলুলয়েডের সে-বিখ্যাত ছবিগুলো কাল্পনিক হলেও, চলতি সময়ে এর বাস্তব দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাবে  পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার অন্তর্গত শ্রীরামপুরের ৪৪/এ ভাগিরথী লেইনের বসত বাড়ীতে। তবে হ্যাঁ, সেখানে কোনও বন্য কিংবা হিংস্র জীব-জন্তু নেই, আছে ২৫ টা সারমেয় এবং গোটা ২৫ বিড়াল। নামহীন-গোত্রহীন এ-সমস্ত অবলা জীবের নিরাপদ স্থায়ী-আশ্রয় এ-বসত বাড়ীটি ।

    প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়েই 'প্রেমে পড়া'। তারপর থেকে ঠাঁই বদল হলেও বদলায়নি সখ্যতা, বরং সময়ের সাথে-সাথে হ্রদয়ের বন্ধন আরও মজবুত হয়েছে। বলা ভালো, বেড়েছে একাত্মতা। ঠিক এ-কথাগুলোই এক নিমেষে বলে গেলেন ভাগিরথী লেইনের বাড়ীটির কর্তা পশু-প্রেমিক ষাটোর্দ্ধ চন্দন চৌধুরী। আদিতে পূর্ব বাংলার মানুষ এখন শ্রীরামপুরের বাসিন্দা তিনি। কুকুর-বিড়ালের প্রতি তার অপত্য স্নেহ তামাম এলাকার বাসিন্দাদের পশুদের প্রতি নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করতে বাধ্য করেছে । চন্দন বাবুর দেখানো পথেই হেঁটেছেন স্ত্রী মীনা চৌধুরী আর একমাত্র কন্যা। ঝুমন চৌধুরী। অবলা জীবের জন্য স্ত্রী ও কন্যার সহযোগিতা-সহমর্মিতা তার অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছ, জানালেন আবেগে আপ্লুত চন্দন চৌধুরী।

    মা যে-রকম পরম স্নেহে লালন-পালন করেন, সঠিক সময়ের আহার দেন, ঠিক সেভাবেই নিত্যদিন বিড়াল-কুকুরদের ক্ষুধা মেটান চন্দন চৌধুরী। সকালে সাতটায় ঘুম ভাঙ্গার সাথে-সাথে টিফিন হিসাবে কুকুর-বিড়ালদের দেয়া হয় বিস্কুট ও গুজিয়া । এর ঠিক এক ঘন্টা পরে দেয়া হয় সকালের  মূল খোরাক। না, একসঙ্গে নয় - কুকুর ও বিড়ালদের আলাদা-আলাদা পাত্রে পরিবেশন করা হয় পছন্দমতো মেন্যু । কী থাকে মেন্যুতে? প্রতিদিন নিদেন-পক্ষে তেলাপিয়া মাছ, কিংবা ছোটো চারা মাছ, আর তার সঙ্গে পরিমাণ-মতো ভাত। বয়সের দিকে নজর রেখে আহার দেয়া হয় এদেরকে। চন্দন চৌধুরীর নিত্য-দিনের অতিথিরা প্রতি-দিন গড়ে চার কেজি করে মাছ খায়। ভাবা যায়? এ-আক্রার বাজারে মেন্যুতে দিনে চার কেজি মা? জানা গেলো, বিকেল চারটের মধ্যে দিয়ে দেয়া হয় রাতের খাবার; তবে বিড়ালেরা মূলতঃ দিনে তিন-বার খাবার পায় চন্দন চৌধুরীদের বাড়ীতে। বছরে তিনশো পঁয়ষট্টি দিন বিড়াল-কুকুরদের খাওয়ানোটাই হচ্ছে চন্দন চৌধুরীর একমাত্র বাঁধা রুটিন। বিড়াল-কুকুরদের শুধু খেতে দিয়েই থেমে থাকে নি পরিবারটি। সঙ্গে আছে ওদের থাকার ও শোবার পাকা ব্যবস্থা।

    অবলা জীবগুলোর কথা ভেবে বহু আগেই সাধারণ্যে প্রচলিত সামাজিক অনুষ্ঠানাদি বিসর্জন দিয়েছেন চন্দনবাবু, এমনটাই শোনালেন তার স্ত্রী মীনা চৌধুরী। বিয়ের পরেই স্বামীর মতো তিনিও ভালোবেসে ফেলেন এ-অবলা জীবদের। মীনা চৌধুরী জানান,

    অনেকেই ছোটো-ছোটো  বিড়াল  কিংবা কুকুর ছানা বাড়িতে দিয়ে যান । কারণ, তারা জানেন, এ-অবলা জীবের সঠিক পরিচর্যা হবে ৪৪/এ নম্বরের বাড়ীটাতেই। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিষয়টিকে খুব সুন্দরভাবে গ্রহণ করেছেন। চন্দন বাবুর একমাত্র কন্যা ঝুমন চৌধুরী। তার কথায়, ওরা মানুষের থেকে অনেক বেশি বিশ্বস্ত। পড়াশোনার জন্য অনেক দিন ধরে লন্ডনে থাকা ঝুমন, ছুটি কাটানোর সুবাদে মা-বাবা আর প্রিয় বিড়াল-কুকুরদের সাথে এখন  শ্রীরামপুরে। পরিবারে সুর্বশেষ অতিথিটিও এসেছে ঝুমনের উদ্যোগে। দিন-কয় আগে বাড়ীর কাছে এক ড্রেইনের মধ্যে পড়ে থাকা একটি বিড়ালছানাকে নানান কসরৎ করে তুলে নিয়ে এসে বাবার হাতে তুলে দিয়েছেন ঝুমন। তিনি ভালো-করেই জানেন যে বাবার হাতে এক্কেবারে নিরাপদ বিড়াল ছানাটি।

    চন্দন চৌধুরী জানান,  একটু সহযোগিতা, একটু সহানুভূতি ও একটু ভালোবাসা তিনি যদি সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে পান, তবে অবশ্যই এ-মানব-ধর্ম মসৃণভাবে পালন করতে তার অনেকটাই সুবিধা হবে। তবে কোনো দিক থেকে কো্নো সহযোগিতা না এলেও 'কুছ পরোয়া নেই'।  বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত চন্দন চৌধুরীর  জীবনের মূল কথা হলো, 'জীব জ্ঞানে শিব সেবা'।

    ২৩/১২/০৯

     

     

     

     

     

     

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

thank you chandan chudury

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন