জৌহান রিভাস। ভেনিজুয়েলার সোশিওলিজমো রিভলুশিওনারিওর নেতা। সোশিওলিজমো রিভলুশিওনারিও মূলতঃ ৩৫টি দেশ-জুড়ে কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংগঠন দ্য কমিটী ফর আ ওয়ার্কার্স ইন্টারন্যাশনালের শাখা। গত ১৫ ডিসেম্বরে পূর্ব লন্ডনের আইডিয়া স্টৌরে বসে প্রায় ঘন্টা-তিনেক সময় ধরে ভেনিজুয়েলাতে চলমান রাষ্ট্রীয় উদ্যোগমালা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দেশটির সাম্প্রতিক অবস্থান এবং প্রেসিডেন্ট হুগৌ শ্যাভেসের কর্মকাণ্ড-সহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি নিয়ে ইউকেবেঙ্গলির হয়ে জৌহান রিভাসের সাথে কথা বলেন শান্তনু মজুমদার। আলাপ চলা-কালে স্প্যানিশ-ভাষী রিভাসের হয়ে দোভাষীর কাজটি করেন সোশিওলিজমো রিভলুশিওনারিওর ডেনিজ ডাডলী। রিভাসের সাথে আলাপের প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাদি সমন্বয়ের কাজটি করেছেন আশফাক চৌধুরী।
জৌহান রিভাসের সাথে আলাপের সময়টিতে ভেনিজুয়েলার গোটা-কয় ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে বিপুল উদ্যমে খবর প্রচারিত হচ্ছিলো পাশ্চাত্য মিডিয়াতে। একের পর এক বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারটিকে ভেনিজুয়েলার অর্থনীতির মুখ থুবড়ে পড়ার লক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছিলো। উল্লেখ্য, ডিসেম্বর মাসে ১১ দিনের মধ্যে সাতটি ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দেয় শ্যাভেস-সরকার। এ-ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে রিভাস বলেন, যে-কয়টি ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, সেগুলো ভেনিজুয়েলার পুরো ব্যাঙ্ক-সেক্টরের মাত্র পাঁচ-ভাগ। এ-সব ব্যাঙ্ক মূলতঃ রাষ্ট্রীয় মূলধন পরিচালনা করে। দুর্নীতি-বিরোধী অভিযানের অংশ হিসাবেই এসব ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে; এর সাথে অর্থনৈতিক সঙ্কটের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। এ-ব্যাঙ্কগুলোতে আত্মীয়তার-সম্পর্কের সূত্র ধরে দুর্নীতির প্রকোপের কথা উল্লেখ করেন তিনি। উল্লেখ্য, ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দেয়ার সময়টিতে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন একজন মন্ত্রী। রিভাস মনে করেন, পাশ্চাত্য মিডিয়া যেভাবে বিষয়টিকে ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক সঙ্কট হিসাবে দেখাতে চাইছে, তা ঠিক নয়। ২০০৮ সালে যুক্তরাজ্যে নর্দান রক ব্যাঙ্ক যেভাবে অর্থনীতিতে ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিলো, ভেনিজুয়েলাতে তেমন কিছু ঘটছে না বলে উল্লেখ করেন রিভাস।
সর্বশেষ অভ্যন্তরীন পরিস্থিতি নিয়ে শুরু হলেও আলাপ অবধারিতভাবেই অগ্রসর হয় শ্যাভেসের নেতৃত্বাধীন ভেনিজুয়েলার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূলতঃ মার্কিন-বিরোধী অবস্থানের দিকে। এ-প্রসঙ্গে কিউবা, ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, নিকারাগুয়ার মতো দেশগুলোর বর্তমান অবস্থান লাতিন আমেরিকাতে মার্কিন স্বার্থকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারছে কি-না জানতে চাওয়া হয় জৌহান রিভাসের কাছে। রিভাসের মতে বর্তমানে যে-রকম অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাকে শুধুমাত্র এসব দেশের সরকারগুলোর উদ্যোগ হিসাবে দেখলে পুরো চিত্রটা পাওয়া যাবে না। বরং বর্তমান অবস্থান থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, লাতিন আমেরিকাতে জনগণের কাছে সৌশ্যাল ডেমৌক্র্যাটিক রাজনীতি আর সামরিক একনায়কদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।
ভেনিজুয়েলার বর্তমান যে-অবস্থান তা কোন দিকে যাবে বা এর প্রভাব কেমন হবে, সে-ব্যাপারে নিশ্চিত নন রিভাস। তার মতে, চলমান প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত কোথায় যেয়ে ঠেকবে তা এখনি বলা মুশকিল। তবে বহু-দেশ এখন ভেনিজুয়েলাতে চলমান নিরীক্ষার দিকে দৃষ্টিপাত করছে; এটা ইতিবাচক। তিনি আরও বলেন, 'অন্য দেশ নিয়ে আমি বলতে পারবো না, তবে আমার দেশ নিয়ে আমি বলতে পারি।' তিনি বলেন, 'আমাদের দেশে লোক এখন সমাজতন্ত্র নিয়ে, পুঁজিবাদ নিয়ে কথাবার্তা বলছেন - দুই ক্যাম্পের মধ্যে মেরুকরণ ধারালো হচ্ছে।' রিভাসের মতে, এসবই ইতিবাচক। এখন পর্যন্ত রাজধানী কারাকাস-কেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী সোশিওলিজমো রিভলুশিওনারিওর নেতা জৌহান রিভাস নিজের দলকে বর্ণনা করেন একটি বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক সংগঠন হিসাবে। হুগৌ শ্যাভেসের পিএসইউভিকে ভেনিজুয়েলার জনপ্রিয়তম সংগঠন হিসাবে মেনে নিলেও, এ-সংগঠনটিতে আমলাতন্ত্রের প্রাদুর্ভাবের কথা উল্লেখ করার সাথে-সাথে শ্রমজীবী মানুষ-জনের সক্রিয় হবার সুযোগ কম আছে বলেও উল্লেখ করেণ রিভাস।
হুগৌ শ্যাভেস আসলে কী করতে চাচ্ছেন? জানতে চাই আমরা।
জৌহান রিভাস বলেন, 'শ্যাভেস সামরিক বাহিনী থেকে আসা মানুষ, তবে তিনি প্রগতিশীল; তিনি প্রগতিমুখীন সংষ্কারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।' রিভাসের চোখে শ্যাভেস একজন জাতীয়তাবাদী এবং সেই সাথে সাধারণ মানুষের সাথে নিজেকে যুক্ত করার অসাধারণ ক্ষমতা-সম্পন্ন একজন মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্যাভেস হচ্ছেন সাম্রাজ্যবাদের-বিরোধী রুখে দাঁড়ানো অন্যতম ব্যক্তিত্ব যিনি মানুষকে 'অন্য ব্যবস্থা সম্ভব' ভাবার স্বপ্ন দেখাতে পারছেন। ভেনিজুয়েলাতে সব কিছু শ্যাভেস-ময় হয়ে উঠছে কি-না জানতে চাওয়া হলে রিভাস বলেন, 'একজন মার্ক্সবাদী হিসাবে আমি ব্যক্তি নয় বরং প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিতে ইচ্ছুক।' তবে রিভাস এটাও মনে করেন যে, শ্যাভেস ভেনিজুয়েলাকে বিশ্ব-রাজনীতির মানচিত্রে আলোচিত হবার মতো-করে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন।
দেশের ভিতরে শ্যাভেস-সরকারের গৃহীত ইতিবাচক জাতীয়তাবাদী উদ্যোগগুলোরও উল্লেখ করেন রিভাস। এসবের মধ্যে আছে শিক্ষা-প্রসার, ভূমি-সংষ্কার, উৎপাদন-বৃদ্ধি, শাসক-শোষিত সম্পর্কের উন্নতি, কৃষি-ক্ষেত্রে কৃষকের ক্ষমতায়নের মতো উদ্যোগগুলো। উদাহরণ-স্বরূপ তিনি জানান, শ্যাভেস-সরকার এ-পর্যন্ত ৩০ মিলিয়ন হেক্টর জমি রাষ্ট্রীয় মালিকানাতে নিয়ে এসেছে। তবে ভেনিজুয়েলা রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক চরিত্র অপরিবর্তিত থাকার কারণে হুগো শ্যাভেসের উদ্যোগগুলো ক্রমাগত বাধার মধ্যে পড়বে বলেই মনে করেন রিভাস। এছাড়াও বাস্তব অর্থে ভেনিজুয়েলাতে সমাজতন্ত্র-মুখীন তেমন কোনো নিগূঢ় পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন না তিনি।
পশ্চিমা মিডিয়ায় কখনও-কখনও শুনা যায় যে, শ্যাভেস আমলে দরিদ্রদের অবস্থা ভালো হবার সাথে-সাথে ধনীদের অবস্থাও ভালো হচ্ছে! অর্থ্যাৎ ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে। রিভাস কী মনে করেন? রিভাস মনে করেন, এ-ধরণের তথ্যের মধ্যে সত্যতা নেই। তবে ভেনিজুয়েলাতে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানালেন রিভাস। খানিকটা দূর থেকে দেখলে অনেকটা চে গুয়েভারার মতো লাগা রিভাস জানান, শ্যাভেস-আমলে দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা-সহ মৌলিক চাহিদাগুলোর দ্বার খুলে গেছে। দরিদ্রদের জীবন-যাত্রার মানের ক্ষেত্রে বড়ো ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে ৯৭ শতাংশ নাগরিক সুপেয় জলের আওতায়; গত কয়েক বছরে সমাজের নিন্ম-স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়-গামী শিক্ষার্থী বেড়েছে ৫০ শতাংশ; যোগাযোগ-ব্যবস্থা, হাসপাতাল স্থাপন ও শিক্ষার মতো খাতগুলোতে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ বেড়েছে বিপুলভাবে। তবে রিভাসের মতে, শ্যাভেস-পূর্ব আমলের দুর্নীতি ও আমলাতন্ত্রের প্রকোপ এখন পর্যন্ত বিরাজ করছে এবং চলমান প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
শ্যাভেসের তেল-নির্ভর অর্থনীতির ব্যাপারে প্রশ্ন আছে রিভাসের মধ্যে। তিনি মনে করেন, উত্তোলিত তেলের ৯০ ভাগ বিদেশে রপ্তানী করে দেয়াটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। উল্লেখ্য, ভেনিজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম তেল-সমৃদ্ধ দেশ। এ-প্রসঙ্গে ভেনিজুয়েলার জন্য 'পরিকল্পিত অর্থনীতির' প্রয়োজনীয়তার পক্ষে মত দেন জৌহান রিভাস।
ধনী-লোকেরা আর বহুজাতিক কৌম্পানীগুলো হুগো শ্যাভেসের ব্যাপারে ক্ষিপ্ত কেনো? তিনি কী করেছেন? জিজ্ঞেস করা হয় জৌহান রিভাসকে। তার কথায়, 'ভেনিজুয়েলাতে ধ্রুপদী অর্থে ধনী-গরীব দ্বন্দ্বের চিত্র পাওয়া যাবে না। তবে শ্যাভেস এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন, যা ধনীদের স্বার্থকে বিঘ্নিত করেছে। শ্রমজীবী মানুষ এখন শ্যাভেসের দিকে তাকিয়ে আছে; যদিও তিনি এক ধরণের 'ব্যালেন্স' করার পথেই হাঁটছেন। রিভাস মনে করেন, পুঁজিবাদী কাঠামো চালু রেখেই সমাজতন্ত্রের কথা বলে যাচ্ছেন শ্যাভেস। তিনি পুঁজিবাদের সাথে সমাজতন্ত্রের এক ধরণের সমন্বয় করতে চাইছেন। এ-প্রসঙ্গে রিভাস স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভেনিজুয়েলা আদতে একটি পুঁজিবাদী দেশ।
রিভাসের সাথে আলাপের শেষ অংশে এসে কথা হয় শ্যাভেসের আন্তর্জাতিক মিত্রদের প্রসঙ্গে। একদিকে, কিউবা, বলিভিয়া, নিকারাগুয়া, চীনের মতো দেশ; অন্যদিকে আছে ইরানের মতো দেশ। রিভাস মনে করেন, ইরানের মতো দেশকে মিত্রের তালিকায় রাখাটা রাজনৈতিকভাবে ভুল।
আপলৌডঃ ০৬/০১/১০


Vetorer kisu katha jana
Vetorer kisu katha jana gelo. Asabadi hoar moto onek kisu i ace. Valo laglo.