• পথের শেষ কোথায়-৪
    লিখেছেন: 
    মিনার মনসুর

    বঙ্গবন্ধু তখন সত্যিই খুব একা হয়ে পড়েছিলেন 

    লোকটিকে ঘিরে ছোটখাটো একটি ভিড় জমে উঠেছিল। খালি গা। উস্কুখুস্কো চুল। সারা গায়ে আলকাতরার মতো ধুলো-ময়লার পুরু আস্তরণ। চারপাশে ভনভন করছে অসংখ্য মাছি। প্রথম দর্শনে মানুষ বলে মনে হয় না লোকটিকে। তার বিপন্ন অবয়ব জুড়ে শুধু চোখদুটো জ্বলজ্বল করছিল ক্ষুধার্ত চিতার চোখের মতো। মল-মূত্রে ভরা একটি ডোবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বেপরোয়া ভঙ্গিতে কিছু একটা করছিল লোকটি। সবার চোখ সে দিকে। বছরের পর বছর ধরে মহল্লার যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা ফেলা হতো সেই ডোবায়। তার দেহের বেশির ভাগই ডুবে গেছে গা ঘিনঘিন করা সেই থকথকে কাদায়।  

    ভিড়ের ভেতর থেকে অকস্মাৎ কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে। কিছু একটা বলার চেষ্টা করে বিকৃত স্বরে। কিন্তু কথার বদলে তার মুখ দিয়ে হড়বড় করে বেরিয়ে আসে বমি। মুখ চেপে ধরে লোকটি বসে পড়ে মাটিতে। অচিরেই তার সঙ্গে যোগ দেয় আরও কয়েকজন। হৈ চৈ চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায় ভিড়ের মধ্যে। দু'একজন দৌড়ে পালিয়ে যায়। একজন ছুটে গিয়ে থালায় করে কিছু ভাত-তরকারি নিয়ে আসে। দূর থেকে থালাটি বাড়িয়ে ধরে ডোবার মাঝখানে দণ্ডায়মান অদ্ভুত লোকটির দিকে। অন্যরা চিৎকার করে ডাকতে থাকে তাকে। কিন্তু কোনো কিছুর পরোয়া না করে লোকটি তার কাজ করতে থাকে। ভিড়ের পেছনে থাকায় আমি প্রথমে ব্যাপারটি বুঝে উঠতে পারি নি। ভিড় একটু হালকা হওয়ার পর নিজের চোখেই দেখে ফেলি বীভৎস সেই দৃশ্যটি। মলমূত্রের মধ্যে পড়ে থাকা একটি মরা মুরগি দু'হাতে ধরে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে গোগ্রাসে গিলছিল লোকটি।  

    ঘটনাটি ১৯৭৪ সালের। আমি তখন চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। আমার স্কুলের কাছে, লালদিঘীর মাঠ-সংলগ্ন টিলার উপর, বাবার একটি নির্মাণ কাজ চলছিল তখন। আমি সাধারণত বাবার সঙ্গে রিকশায় স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। তবে একাও যেতে হতো মাঝেমধ্যে। একাধিক কারণে সেটাই আমি বেশি উপভোগ করতাম। বেশির ভাগ সময়ে হেঁটেই যেতাম। মূল উদ্দেশ্য ছিল দু'টি। প্রথমত, রিকশার ভাড়া বাঁচানো। আমার কাছে এ পয়সাগুলোর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। লালদিঘীর পশ্চিম পাশে 'নভেলটি' নামে ছোট্ট একটি রেষ্টুরেন্ট ছিল। তাদের তৈরি ডিমে ভাজা আলুর চপের কথা মনে এলে আমার এখনও জিভে জল আসে। পকেটে পয়সা থাকলেই স্কুল ছুটির পর আমি ছুটে যেতাম সেখানে। নভেলটির কাছাকাছি ছিল একটি বইয়ের দোকান। নামটি এখন আর মনে নেই। নামমাত্র দামে তারা বই ভাড়া দিত। সেবা প্রকাশনীর 'কুয়াশা' ও 'মাসুদ রানা' সহ বিচিত্র সব বই। পেটপুরে আলুর চপ খেয়ে গোটা দুই বই বগলদাবা করে দিগ্বি¦জয়ী সম্রাট আলেকজাণ্ডারের মতো দৃপ্ত পায়ে আমি বাসায় ফিরতাম।  

    সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণটি ছিল, চারপাশের বিচিত্র মানুষ এবং তাদের ততোধিক বিচিত্র জীবনযাপন ও কাজকর্ম দেখা। কোরবানিগঞ্জ, আছদগঞ্জ ও বকশিহাটের ভেতর দিয়ে এসে চট্টগ্রাম জেলা কারাগারের বিশাল দেয়াল ঘেঁষে আমি হাঁটতাম। তারপর লালদিঘীর মাঠের মাঝখান দিয়ে পৌঁছে যেতাম স্কুলে। পথ আরও ছিল। তবে কিছুটা দীর্ঘ হলেও এ-পথটিই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়। বাণিজ্য-নগরী চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল-কেন্দ্র ছিল এটাই। আড়তের পর আড়ত। চাল-ডাল, শুঁটকি থেকে শুরু করে রকমারি সুগন্ধি পর্যন্ত কী না ছিল সেখানে! শুধু ঘ্রাণ দিয়েই আড়তগুলোকে আলাদাভাবে চেনা যেত। আসা-যাওয়ার পথে নানা রকম ঘ্রাণ আমাকে মাতোয়ারা করে তুলতো। চট্টগ্রামের বনেদী সওদাগররা ধবধবে শাদা লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে থাকতেন সেইসব আড়তে। কারো-কারো কোমরে থাকতো চামড়ার পুরু বেল্ট। সেখানে অনেকগুলো গুপ্ত পকেটও থাকতো। তাদের অনাড়ম্বর বেশভূষা দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে তারা কী বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী।

    আসা-যাওয়ার পথে পড়তো হজরত শাহ বদর ও হজরত শাহ আমানত আউলিয়ার মাজার। সেখানে সর্বক্ষণ ভক্তদের ভিড় জমে থাকতো। থাকতো বিচিত্র বেশভূষার নানা বয়েসী কিছু 'খানদানি' ভিক্ষুকও। তাদের ভিক্ষার ধরনও ছিল দেখার মতো। আরও একটি জটলা থাকতো কারাগারের প্রধান ফটকে। দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ এখানে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা  করতো কারাবন্দী প্রিয় মানুষটিকে একনজর দেখার জন্য। নারী ও শিশুর সংখ্যাই ছিল বেশি। অধিকাংশই গ্রামের সহজ-সরল মানুষ। তাদের সঙ্গে থাকতো নানা ধরনের পিঠা ও রান্না করা খাবার। কারারক্ষীরা নানা কৌশলে তাদের সব টাকাপয়সা ও খাবার-দাবার হাতিয়ে নিতো। মাঝেমধ্যেই তারা সমস্বরে ডুকরে কেঁদে উঠতো আর বড়ো বড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে আল্লাহর কাছে নালিশ জানাতো। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে আমি বিপুল কৌতূহল নিয়ে এ-সব দেখতাম। মজার ব্যাপার হলো, বহু দিন ধরে দেখার পরও আমার আগ্রহে কখনও ভাটা পড়ে নি।  

    চারপাশের সবকিছুই আমাকে টানতো। তবে আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষ। তিয়াত্তরের শেষ দিকে কিংবা চুয়াত্তরের শুরুতে এসে হঠাৎ করে এ চেনা দৃশ্যপটটি বদলে যেতে থাকে। বিস্ময়করভাবে বাড়তে থাকে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা। কারাগারের সুউচ্চ দেয়াল ঘেঁষে মাঠের মতো যে খালি জায়গাটি ছিল তা ভরে যায় মানুষে-মানুষে। কারাগারের মূল ফটকসহ লালদীঘির মাঠের চারপাশেও ঠাঁই নেয় অনেকে। দীর্ঘদিন ধরে দেখা আমার অতি-পরিচিত মানুষ-গুলোর সঙ্গে এদের কোনো মিল ছিল না। একেবারে অন্য-রকম সব মানুষ। অনেকটা জয়নুলের আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবিগুলোর মতো। এদের ভাষা, চলাফেরা সব যেন আলাদা। ঠিক স্বাভাবিক মানুষের মতো মনে হয় না। হাড়-জিরজিরে শিশুগুলো সারাক্ষণ গলা ফাটিয়ে কাঁদতো। বৃদ্ধরা শুয়ে থাকতো মৃত মানুষের মতো। আর মায়েরা তাদের মৃত-প্রায় শিশু-সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করতো। পথচারীরা দ্রুত তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যেত। তাদেরও চোখেমুখে ছিল কেমন যেন ত্রস্ত একটা ভাব। আমি এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখি নি।         

    অকস্মাৎ এতো মানুষ কোত্থেকে আসলো, কেন আসলো এবং কী তাদের পরিচয় তা বুঝে উঠতে আমার সময় লেগেছিল। মুসলিম হাই স্কুলে আমার অন্যতম প্রিয় শিক্ষক ছিলেন আলী আজম স্যার। তিনি কিছুদিন আমার গৃহশিক্ষকও ছিলেন। আমি স্যারকেই জিজ্ঞেস করি। বিশাল এক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে তিনি বলেছিলেন, 'সময় ভালো না রে সময় ভালো না। গ্রামে-গঞ্জে কাজ-কাম নাই। মানুষের পেটে ভাত নাই। হের লাইগ্যা মানুষ শহরে ছুইট্যা আইতাছে দলে দলে।' দান-খয়রাত করার ব্যাপারে চট্টগ্রামের মানুষ বরাবরই উদারহস্ত। নানা উপলক্ষ্যে শাহ আমানত আউলিয়ার মাজারে প্রায় প্রতিদিনই চলতো ভিক্ষুকদের জন্য ভোজ। কেউ না কেউ এসে উপাদেয় সব খাবার দিয়ে যেতো চারপাশের অভাবী মানুষগুলোকে। হঠাৎ করে সবই যেন স্মৃতি হয়ে যায়। শহরের সর্বত্রই ভুখানাঙ্গা মানুষের ভিড়। কিন্তু ভিা দেওয়ার মতো মানুষ চোখেই পড়তো না। কদাচিৎ যৎসামান্য খাবার কেউ দিলে তা নিয়ে কাক-কুকুর আর মানুষে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে প্রতিদিনই দু'একটি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখতাম। বৃদ্ধ আর শিশুর সংখ্যাই ছিল বেশি।  

    আমাদের হাঁড়িতেও টান পড়েছিল। কমে গিয়েছিল আয়-উপার্জন। চালের দাম তখন আকাশচুম্বী। কম দামি বেশিরভাগ চালই ছিল খাওয়ার অনুপযোগী। কাঁকড় আর পোকা-মাকড়ে ভর্তি। আমাদের বাসায়ও তখন ভাতের পরিবর্তে একবেলা রুটি খাওয়ার কথাবার্তা হচ্ছিল। তাতেই আমরা খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। ভাতের অভাব বাঙালির জীবনে কতোটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে সেটা আমি তখন হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছিলাম। তবে মাত্র দু'বছর আগে পাকিস্তানি দুর্ধর্ষ হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে যারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, তারা এতো সহজে হাল ছেড়ে দিল কিভাবে তা আজও আমার মাথায় আসে না। এখন আমার মনে হয়, এ-ধরনের ভয়াবহ একটি পরিস্থিতি যে হতে পারে সেটা সম্ভবত কেউ কল্পনাও করেন নি। তাই ঘটনার আকস্মিকতায় হয়তো সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। যাই হোক, কিছুটা বিলম্বে হলেও রাজনৈতিক কর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা মাঠে নামার পর পরিস্থিতির ভয়াবহতা কমে আসতে শুরু করে।

    বিস্ময়কর দ্রুততা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে আমার বাবা তার করণীয় ঠিক করে ফেলেছিলেন। প্রায় নিঃশব্দে তার শহর-কেন্দ্রিক কাজ-কারবার অনেকটাই গুটিয়ে ফেলেছিলেন রাতারাতি। গ্রামে দীর্ঘদিন যাবৎ অয্তনে-অবহেলায় পড়ে থাকা জমি চাষাবাদে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন তিনি। বাদ পড়েনি পরিত্যক্ত নালা-ডোবাও। জীবিকার তাগিদে শহরবাসী হলেও মনের দিক থেকে বাবা ছিলেন শতভাগ গ্রামের কাদা-মাটির সন্তান। অভাবনীয় খাদ্যাভাব তার মতো শেকড়চ্যুত অজস্র মানুষকে আবার শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে এনেছিল। এর ফল হয়েছিল অভাবনীয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে বাম্পার ফলন হয়েছিল সারা দেশে। দুর্ভিক্ষের আতঙ্ক জয় করে আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল মানুষ। আমাদের ভাতের আতঙ্কও ঘুচে গিয়েছিল স্থায়ীভাবে। বাবা ব্যবসায়ী মানুষ। শহরে তার উপার্জন খারাপ ছিল না। তবু বরাবরই তার একটি পা ছিল গ্রামে। মা গ্রাম পছন্দ করতেন না। কিন্তু বাবার কারণে মাকে বছরের বেশ কিছুটা সময় সেখানে কাটাতে হতো। বর্গাদারদের কাছ থেকে বুঝে নিতে হতো ফসলের হিস্যা। ছিল পুকুরের মাছ, গাছের নারকেল-সুপারিসহ বৈষয়িক আরও নানা হিসাব-নিকাশ। এ-নিয়ে বাবার সঙ্গে যথেষ্ট খিটিমিটিও হতো মার। বাবা বলতেন, 'এটা হলো আমার নিজের মাটি। আর কিছু না থাকলেও এ মাটি যতোক্ষণ আছে ততোক্ষণ আমরা অন্তত না খেয়ে মরবো না। পেটে ভাত না থাকলে সবই অসার'।  

    সেদিন বাবার মতো আরও অনেকেই হয়তো মহামূল্যবান এ সত্যটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাদের সহজাত প্রজ্ঞা দিয়ে। বুঝতে পেরেছিলেন বলেই মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা চুয়াত্তরের সেই মহা-দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম। অথচ এ-সহজ সত্যটি উপলব্ধি করতে আমাদের নীতি-নির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের লেগে গেছে কয়েকটি দশক। বলতে দ্বিধা নেই যে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ আমার জীবনকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিল। বদলে গিয়েছিল আমার জীবন-দর্শনও। মৃত্যু আমি একাত্তরেও দেখেছি। একাত্তরের আগেও গ্রাম পর গ্রাম উজাড় হতে দেখেছি গুটি বসন্তে। আমি যে পাড়ায় থাকতাম তার বেশিরভাগ শিশুই এর অসহায় শিকারে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু চুয়াত্তরের ঘটনা আমি কখনই মন থেকে মুছে ফেলতে পারি নি। আমার কবিতায় ঘুরে-ফিরে এনেছি এ-প্রসঙ্গ। বাজার-ভর্তি খাদ্য আছে, অথচ মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে; এটা কেন হবে ? এ-প্রশ্ন এখনও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।  

    আমার অন্যতম প্রিয় লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্পে অসাধারণ নৈপুণ্যের সঙ্গে চিরকালীন এ-প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে। গল্পটির নাম সম্ভবত 'মানুষ কেড়ে খায় না কেন?' মূল বক্তব্যও ছিল তাই। সেই প্রশ্ন আমারও। অমর্ত্য সেন এ-প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন তার একাধিক গবেষণাধর্মী লেখায়। তার বক্তব্য আমি যতোটা বুঝেছি তাতে আমার মনে হয়েছে যে দুর্ভিক্ষের জন্য তিনি প্রধানত গণতন্ত্রহীনতা এবং অপশাসন বা দুর্বল শাসনকেই দায়ী করেছেন। তার মতে, গণতন্ত্র ও সুশাসন থাকলে দুর্ভিক্ষ বা খাদ্যাভাব হতে পারে না। এখানে কিছুটা বিভ্রম দেখা দিতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে যে গণতন্ত্র সর্বজনীন ভোটাধিকার দেয় ঠিকই, কিন্তু অনাহারে মৃত্যুর জন্য মূলত যে-বিষয়টি দায়ী সেই নিষ্ঠুর আর্থ-সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্তি দেয় কি? এ-প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেনের যুক্তি কিছুটা চমকপ্রদ বৈকি। তার মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবাধ তথ্য-প্রবাহের কারণে দেশের যে-কোনো স্থানে সম্ভাব্য খাদ্যাভাবের খবর আগেই সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাই জেনে যায়। পত্র-পত্রিকায় এ-নিয়ে লেখালেখি চলতে থাকে। ফলে সরকার দ্রুত খাদ্য সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে কিংবা জনমতের চাপে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। এ বক্তব্য যে অ-যথার্থ নয় তার একটি প্রমাণ আমি পেয়েছি উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা মোকাবেলার ক্ষেত্রে। 

    চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নিয়ে অনেক লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ফাঁস হয়ে গেছে খাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বিষয়টিও। সদ্য-স্বাধীন দেশটিকে শায়েস্তা করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী চক্র খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। শত-শত মানুষকে ঠেলে দিয়েছিল অসহায় মৃত্যুর দিকে। আর বাংলাদেশকে 'তলাবিহীন ঝুড়ি' আখ্যা দিয়ে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে তুলে দিয়েছিল মোক্ষম একটি অস্ত্র। এসব খবর শুনে এখন আর কেউ বিস্মিত হয় না। কারণ আগে কিছুটা রাখঢাক করা হলেও অর্থনৈতিক অবরোধের নামে আজকাল ঘোষণা দিয়েই এ-ধরনের অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়। যুগ-যুগ ধরে এ ধরনের অমানবিক অবরোধের শিকার হচ্ছে কিউবা। তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত ছিল সাদ্দাম-শাসিত ইরাক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ চলাকালে সেখানে খাদ্যের অভাবে কয়েক লাখ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।  

    আমি বঙ্গবন্ধুর কথা ভাবি। ভাবি তার মাত্র ২৪ মাস বয়সী অনভিজ্ঞ সরকারের কথা। চুয়াত্তরের খাদ্যাভাবের জন্য এখনও বঙ্গবন্ধু এবং তার সরকারকে দায়ী করা হয়। আমার মনে আছে, জাসদ তখন গলা ফাটিয়ে শ্লৌগান দিয়েছে, 'শেখের গলায় জুলিও কুরি, আমরা সবাই ভাতে মরি'। এ-সুযোগে বহু বিতর্কিত ব্যক্তিকে তাদের পতাকাতলে সমবেত হতেও দেখেছি। আর বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যা পরবর্তীকালে সামরিক বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ার রাজনৈতিক দল গঠন-পর্বে উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানও চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রশ্ন হলো, বঙ্গবন্ধু বা তার সরকার কি সত্যিই দায়ী ছিল এ দুর্ভিক্ষের জন্য? মারাত্মকভাবে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত একটি দেশ। ধন-সম্পদ যা ছিল সবই পাকিস্তানিরা নিয়ে গেছে কোষাগার শূন্য করে। পুরো একটি বছর মিল-কারখানা বন্ধ। ক্ষেত-খামারে ঠিকমতো চাষবাস হয় নি। বেশিরভাগ রাস্তা-ঘাট ও সেতু চলাচলের অনুপযোগী। প্রধান দু'টি বন্দরের অবস্থাও তথৈবচ। সর্বোপরি, ঘরে-বাইরে শত্রু। যে সে শত্রু নয় আমেরিকা, চীন ও সৌদি আরবের মতো পরাক্রমশালী সব শত্রু চারপাশে। পাকিস্তান তো ছিলই। ছিল হানাদারদের সহযোগী দেশি নরঘাতক-চক্রও। সদ্যোজাত বাংলাদেশকে শিক্ষা দিতে তারা বদ্ধ-পরিকর। এদিকে ঘরে-ঘরে তখন হাহাকার। সহায়-সম্পদ ও স্বজন হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে কয়েক কোটি মানুষ। তাদের মধ্যে স্বদেশ প্রত্যাগত শরণার্থীর সংখ্যাই ছিল এক কোটির বেশি। এ- অবস্থায় মাত্র দু'বছর বয়েসী অনভিজ্ঞ একটি সরকারের প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু কীই বা করতে পারতেন?    

    রাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ বোঝার বয়স তখন আমার হয় নি। কিন্তু একটি বিষয়ে আমার মনে কোনো সংশয় ছিল না। সেটি হলো, দেশ ও জনগণের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ মমত্ববোধ। সেখানে যে কোনো খাদ ছিল না সেটা আমি বুঝতে পারতাম। ফলে আমার কখনই চুয়াত্তরের দুর্ভিরে জন্য বঙ্গবন্ধুকে দায়ী বলে মনে হয় নি। তবে তার দলের নেতা-কর্মীদের উপর আমার ভীষণ রাগ হয়েছে তখন। বিজয়ের আনন্দে তারা তাদের কর্তব্যই শুধু বিস্মৃত হন নি, বরং হিতাহিত জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেছিলেন অনেক ক্ষেত্রে। তাদের অনেকেই তখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন নিজেদের আখের গোছানোর কাজে।  এ-ক্ষেত্রে কোনো বাছ-বিচারের বালাই ছিল না। সংকীর্ণ ব্যক্তিগত স্বার্থে স্বাধীনতা-বিরোধী বহু ঘৃণ্য ব্যক্তিকে আশ্রয-প্রশ্রয় দিতেও তারা কুণ্ঠিত হয় নি। বলা বাহুল্য, সদ্যস্বাধীন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সহায়-সম্পদহীন একটি দেশ পরিচালনার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি ও সতর্কতার দরকার ছিল সেটাও তাদের অনেকেরই ছিল না। আর এ-সুযোগটিই সফলভাবে কাজে লাগিয়েছিল বাংলাদেশের প্রতি বৈরি দেশি-বিদেশি দুর্বৃত্ত চক্র। অন্যদিকে, আমার মনে হয়েছে, তার প্রাণ-প্রিয় স্বদেশে ভক্ত-চাটুকারদের প্রবল ভিড়ের মধ্যেও বঙ্গবন্ধু তখন সত্যিই খুব একা হয়ে পড়েছিলেন। আমি নিশ্চিত যে  দেশ ও জনগণের প্রতি অপরিসীম মমত্ববোধই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পঁচাত্তরের ঘৃণ্যতম হত্যাযজ্ঞের আসল প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল তখনই।  

    minarmonsur@gmail.com    

    ০৯/০১/১০

     

     

     

     

     

     

     

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

মিনার মন্সুরের এ লেখা আমার কাছে অসাধারণ, এ লেখার ভাষার নিপুনতার জন্ন্য নয়. এ লেখার সততার জঁন্য, আর এ লেখার , চেনা পরিপারসিকতার জ্ন্ন্য

শেখ মুজিব  বাংলার  ইতিহাসের এক নক্ষত্র ,   কিন্তু পরবর্তীতে তার দল তথা আওয়ামীলীগ
সে নীতিতে আর নেই বললে চলে।

শেখ মুজিব  বাংলার  ইতিহাসের এক নক্ষত্র ,   কিন্তু পরবর্তীতে তার দল তথা আওয়ামীলীগ
সে নীতিতে আর নেই বললে চলে।

মুজিবরের জন্য লেখকের গভীর ভালোবাসা লেখাতে স্পষ্ট।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন