• মতি মিয়ার অতি প্রীতি
    রাশেদ রাফি

    মতি মিয়ার জন্মটা বাংলাদেশের এক মফস্‌সলী-মধ্যবিত্ত পরিবারে হলেও তার ভাবনার ঘোড়া সর্বদাই আকাশ ছুঁয়ে যায়। মতি মিয়া তখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র; মা-বাবার চোখে জ্বল-জ্বল করে ভাসতো তাদের ছেলে একদিন সদরের আদালতে জজ হয়ে বসবে। মতি মিয়া মা-বাবাকে বুঝাতো, 'এ-তো খুব সহজ আর অতি ছোট আশা, দেখবে আমি একদিন বিলেত থেকে ব্যারিষ্টার হয়ে ফিরবো।'। কিন্তু সে-স্বপ্ন বেশি দিন টিকতে পারেনি।
    ঢাকা কলেজে উচ্চ-মাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার পর মতি মিয়া একটা বাম-পন্থী রাজনৈতিক সংগঠনে নাম লিখায়। উচ্চ-মাধ্যমিকে ভালো ফল না পাওয়ায় মতি মিয়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত মফস্‌সলের এক কলেজ থেকে পাসকৌর্সে স্নাতক হয়ে পছন্দের মেয়ে আফিয়ার সাথে বিয়ে-বন্ধনে নিজেকে বাঁধে। আমাদের মতি মিয়ার খরচের হাত আবার খুব বড়ো। নববধু আফিয়ার জন্য ঢাকা শহরের কেনা-কাটা করতে আসলে একদল পুরনো বন্ধুর সাথে তার দেখা হয়ে যায়। স্ত্রীর জন্য বরাদ্দ-করা সব টাকা খরচ হয়ে যায় বন্ধুদের আপ্যায়নে। ঐ দিন রেস্তোঁরায় বসে মতি মিয়া সিদ্ধান্ত নেয়, বন্ধুদের সাথে ঠিকাদারী ব্যবসা করবে। ভালোই শুরু হয় ব্যবসা। ছয় মাসের মাথায় জানা যায়, মতি মিয়ার স্ত্রীর দেয়া নগদ তিন লাখ টাকা-সহ মতি মিয়ার শ্রমমাখা কোটি টাকার স্বপ্ন সব ধুলায় মিশে গেছে। বন্ধুদের মিষ্ট কথায় পুষ্ট হয়ে একটা দীর্ঘ-শ্বাস ছেড়ে মতি মিয়া স্ত্রীর কাছে ফিরেন। এরই মধ্যে তার একটা ছেলে হয়। শুরু হয় ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা। এবার অবশ্য মতি মিয়ার মধ্যে কিছুটা স্থিরতা লক্ষ্য করা যায়। নীলক্ষেতে সে এবার একটা বইয়ের দোকান খোলে। কাছের বন্ধুরা আশায় ছিলো এবার মনে হয় তার দিন ফিরবে। কিন্ত দু'বছর না যেতেই পরিচিত ক্রেতা ও বন্ধু-বান্ধবদের বাকি দিতে বইয়ের ব্যবসা লাটে ওঠে। মতি মিয়া বুঝে যায়, ব্যবসা তাকে দিয়ে হবে না। তাছাড়া ছোটো-খাটো চাকরী করার মতো মানসিকতাও তার নেই।

    এদিকে ছেলে তুবনকে ঠিক জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাতে তার দরকার অনেক টাকা। অনেক ভেবে-চিন্তে বিশ্বস্ত এক বন্ধুর সহায়তায় বাবার জমি দুটো বিক্রি করে মতি মিয়া পাড়ি জ়মান বিলেত। পূর্ব লন্ডনের এক বড়ো মুদী-দোকানে বিক্রয়-কর্মী হিসেবে একটা কাজ হয়ে যায়। এবার মতি মিয়া দেশে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠাতে থাকে। মা-বাবা স্ত্রী সবাই আশাবাদী হয়ে উঠেন। কিছু দিনের মধ্যে লন্ডনে মতি মিয়ার অনেক বাঙালী-ইংলিশ বন্ধু-বান্ধব মিলে যায়। এসব বন্ধুদের টাকা-পয়সা ধার দিয়ে মনে-মনে গর্ববোধ করেন। মতি মিয়া তার সাপ্তাহিক ছুটির সময় বিনা পারিশ্রমিকে একটা চ্যারিটী শপে কাজ করে। লন্ডনের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে গৃহহীন মাতালদেরকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। আমাদের মতি মিয়া এসব মাতালদেরকে মাঝে-মাঝেই পাঁচ-দশ পাউন্ড করে দান করে কৃতার্থ হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন বিপদগ্রস্ত দেশের সহায়তার জন্য লন্ডনে রয়েছে অনেক দাতা-সংস্থা। মতি মিয়া এসব দাতা-সংস্থার একাউন্টে কখনো-কখনো পঞ্চাশ-একশো পাউন্ড জমা দিয়ে দেয়। বাঙালী বন্ধুরা তাকে হাজী মহসীন বলে ডাকতে শুরু করে। মতি মিয়া আনন্দে-আহ্‌লাদে গদ-গদ হয়ে ওঠে।এভাবে লন্ডনে তার দু'বছর কেটে যায়; একে-ওকে ধার দিতে-দিতে মতি মিয়া প্রয়োজন-মতো দেশে টাকা পাঠাতে পারে না। একদিন খবর আসে মতি মিয়ার স্ত্রী জটিল রোগে আক্রান্ত। শ্যালিকা রাহেলার সাথে আলাপ করে মতি মিয়া জানতে পারে তার স্ত্রীর বৌনম্যারো ক্যান্সার হয়েছে। তথাকথিত বন্ধু বা পরিচিতজনকে দেয়া ধারের টাকা তুলতে ব্যর্থ হয়ে, কোনো মতে বিমান ভাড়া যুগিয়ে আর ছেলে তুবনের জন্য সামান্য কিছু জিনিস নিয়ে মতি মিয়া ওরফে হাজী মহসীন দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দেশে এসে জানতে পারে, আফিয়াকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাতে বহু টাকার প্রয়োজন। পাগল-প্রায় মতি মিয়া হন্যে হয়ে এখানে-ওখানে ছুটতে থাকে। বিশ্বস্ত বন্ধুদের সহায়তায় প্রয়োজনের সামান্য কিছু অংশ অর্থ যোগাড় হলেও আফিয়া তার অতি ভালো মানুষ স্বামী মতি মিয়া ও ছেলে তুবনকে রেখে চির দিনের জন্য বিদায় নেয় ।  
    মতি মিয়া অবাক হয়ে আবার দীর্ঘ-শ্বাস ছাড়ে। আমাদের এই অতি-ব্যস্ত ও জটিল ছকে বাঁধা পৃথিবীতে মতি মিয়ার মতো মানুষের গুন-বিচারের সময় কারো নেই। মতি মিয়া নিজেই হয়তো একদিন বুঝে যাবে অতি ভাল-মানুষীই তার বড়ো অযোগ্যতা।
    ০৭/০১/১০
         
     
     
     
       
     
     
     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন