London Sunday 1 August 2010

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে সহিংসার প্রতিবাদে নাগরিক সমাজ

বাংলাদেশের রাঙ্গামাটির বাঘাইহাট ও খাগড়াছড়ি সদরে আদিবাসীদের হত্যা, হামলা, ভূমি-দখল, অগ্নি-সংযোগের প্রতিবাদে ২৫ ফেব্রুয়ারী, বৃহস্পতিবার, ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সমাবেশে নাগরিক সমাজ কর্তৃক প্রকাশিত বিবৃতির বিস্তারিত বিবরণ পড়ুন নীচেঃ

আমরা দেশের নাগরিক সমাজ গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে লক্ষ্য করছি যে, সাম্প্রতিক সময়ে আদিবাসীদের উপর  সহিংস হামলা, তাদের ভূমি জবরদখল ও অব্যাহতভাবে সেটেলার বাঙালীদের বসতি সম্প্রসারণের ঘটনা ঘটে চলেছে। তারই সর্বশেষ ঘটনা হলো রাঙ্গামাটির বাঘাইহাট ও খাগড়াছড়ি জেলা সদরে আদিবাসী পাহাড়ীদের উপর সংঘটিত নৃশংস হত্যাকান্ড, বাড়ি-ঘরে অগ্নি-সংযোগ ও বর্বরোচিত হামলা।

জানা যায় যে, রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইহাট উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাটে ১৯ ফেব্রয়ারি ২০১০-এর সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ২০ ফেব্রুয়ারি বিকাল পর্যন্ত এক নাগাড়ে সেটেলার বাঙালীরা আদিবাসী গ্রামে অগ্নি-সংযোগ, হত্যাকান্ড ও লুটপাট চালায়। এই ঘটনায় নিহত কমপক্ষে ২ জন আদিবাসী গ্রামবাসীর লাশ পাওয়া গেছে, যদিও আদিবাসীরা কমপক্ষে ৫ জন নিহত হওয়ার দাবী করছেন। এছাড়াও কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছে বলে পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে। এ-হামলায় ২টি বৌদ্ধ মন্দির, ১টি গির্জা ও ১টি স্কুলসহ আদিবাসীদের ১১টি গ্রামে দুই শতাধিক ঘরবাড়ী সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়। আদিবাসীরা অভিযোগ করে যে, তারা অগ্নি-সংযোগে সেটেলার বাঙালীদের বাধা দিতে গেলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এলোপাথাড়ী গুলি ছোঁড়ে। ফলে ঘটনাস্থলে কয়েকজন আদিবাসী নিহত হয় এবং আদিবাসীরা গ্রাম থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। আর এই সুযোগে সেটেলার বাঙালীরা লুটপাট চালায় এবং আদিবাসীদের ঘরে আগুন দেয়। আরো অভিযোগ রয়েছে যে, সেটেলার বাঙালীরা আদিবাসীদের উপর হামলা চালালেও ঘটনার পরই পুলিশ ও সেনাবাহিনী সেটেলার বাঙালীদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো আদিবাসীদের গ্রেপ্তার করে এবং তাদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা দায়ের করে।

ঘটনার পরই নিরাপত্তার জন্য আদিবাসীরা দুর্গম অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। ঘটনার পর পরই ১৪৪ ধারা জারী করার ফলে আদিবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তাদের নিহত বা আহত আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নিতে পারছে না। তাদের নিকট এখনো সরকারি ও বেসরকারি কোন ত্রাণ পৌঁছেনি। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী গ্রামবাসীরা খোলা আকাশের নিচে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

বাঘাইহাট হামলার প্রতিবাদে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে অবরোধ চলাকালে ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১০ খাগড়াছড়ি সদরে সেটেলার বাঙালীরা আদিবাসীদের উপর হামলা, ঘরবাড়ীতে অগ্নি-সংযোগ ও লুটপাট চালায়। এ-ঘটনায়ও বাঙালীদের প্রতি সেনা সদস্যদের পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায় যে, অবরোধ চলাকালে আদিবাসীরা মিছিল সহকারে খাগড়াছড়ি সদরের শাপলা চত্বরে পৌঁছলে সেটেলার বাঙালীরা তাদের উপর সংঘবদ্ধ হামলা চালায়। এরপরই লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সেটেলাররা আদিবাসী-অধ্যুষিত মহাজন পাড়ায় হামলা চালায়। এ-সময় আদিবাসী গ্রামবাসীরা সেটেলার বাঙালীদের প্রতিরোধ করতে চাইলে সেনা সদস্যরা তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে এবং এই সুযোগে সেটেলার বাঙালীরা আদিবাসী ঘরবাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে। এতে কমপক্ষে ৭টি বাড়ী সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। এরপরই সেটেলার বাঙালীরা সংঘবদ্ধভাবে যথাক্রমে মিলনপুর, মধুপুর ও উপালি পাড়ায় আদিবাসীদের ঘরবাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে। সর্বশেষ তারা সাতভেইয়া পাড়া আদিবাসী গ্রামে অগ্নি-সংযোগ করে। খাগড়াছড়ি হামলায় কমপক্ষে মোট ৫০টি বাড়ী ভস্মীভূত হয় বলে জানা গেছে। সেটেলার বাঙালীদের হামলায় অনেক আদিবাসী আহত হয়। এছাড়াও হামলাকারী একজন সেটেলার বাঙালী নিহত হয় বলে জানা গেছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, খাগড়াছড়ি ঘটনায়ও সেটেলার বাঙালী কর্তৃক আদিবাসীদের গ্রামে একতরফা হামলা হলে তার পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারী সেনাবাহিনী, পুলিশ ও রাব যৌথভাবে নির্বিচারে আদিবাসীদের গ্রেপ্তার করে। এতে কমপক্ষে ৭০ জন আদিবাসী পাহাড়ীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরীহ লোকরা এই গ্রেপ্তারের শিকার হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

আদিবাসীদের অভিযোগ, উভয় ঘটনায় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে সেটেলার বাঙালীরা পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে এসব হামলা চালিয়েছে। সেনাবাহিনীর সমর্থন না পেলে সেটেলার বাঙালীদের পক্ষে কখনোই এসব আদিবাসী পাহাড়ী গ্রামে হামলা চালানোর সাহস হতো না। অভিযোগ রয়েছে যে, সেটেলার বাঙালীরা আদিবাসী গ্রামের অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সময় পেছন থেকে সেনাবাহিনীর টহল-দল অনুসরণ করে থাকে। নিরাপত্তার নামে সেনা-ক্যাম্প থাকলেও বাঘাইহাট এলাকায় বাঘাইহাট সেনা জোনের লাগোয়া আদিবাসীদের কয়েকটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ঘটনার ধামাচাপা দিতে সেটেলার বাঙালীরা নিজেদের কিছু খুপড়িতেও অগ্নি-সংযোগ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বলাবাহুল্য, ভূমি নিয়ে বাঘাইহাটে পাহাড়ী-বাঙালী উত্তেজনা আজকেই বিষয় নয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সাজেক রাস্তার দুই ধারে দশ হাজার বাঙালী পরিবার বসতি প্রদানের পরিকল্পনা নেয়া হয় বলে জানা যায়। এসব ভূমি আদিবাসী পাহাড়ীরা প্রথাগত পদ্ধতিতে ভোগ-দখল করে আসছে। ভোগ-দখলে থাকা আদিবাসীদের ভূমির উপর বাঙালীদের বসতি প্রদানের ফলে ভূমি নিয়ে পাহাড়ী ও সেটেলার বাঙালীদের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে উঠে। তারই জের ধরে গত ২০ এপ্রিল ২০০৮ সেটেলার বাঙালীরা পাহাড়ীদের ৭টি গ্রামে ৭৬টি ঘর ভস্মীভূত করে দেয়। গত জানুয়ারি থেকে আবার সেটেলার বাঙালীদের বসতি সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া শুরু হলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি ও উন্নয়নের অনুকূল ক্ষেত্র গড়ে উঠে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতির কোন মৌলিক অগ্রগতি সাধিত হয়নি। বিশেষ করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া, অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার না করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্বলিত বিশেষ শাসন-ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর না হওয়া ইত্যাদির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা দিন-দিন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠে।

২৯ ডিসেম্বর ২০০৯ সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হয়ে আওয়ালী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম, মান-মর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছিলো। ক্ষমতায় আসার পর ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কিছু পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে; যদিও আদিবাসীরা চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের ধীরে-চলো নীতিতে হতাশ।

দেশের সার্বিক উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও এ-অঞ্চলের অনুকূল স্থিতিশীল পরিস্থিতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব নিয়েও সরকারকে বিবেচনা করতে হবে। সরকারকে ভাবতে হবে যখন আদিবাসীদের বিপরীতে সেনাবাহিনী এবং সেটেলার বাঙালীদের অবস্থান এক হয়ে যায়, তখন এই সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে যা কখনোই কাম্য নয়। বাঘাইহাট ও খাগড়াছড়ি সদরে এবারের বর্বরোচিত হামলা নিঃসন্দেহে সরকারের ভাবমুর্তিকে ক্ষুন্ন করবে যা কখনোই কাম্য নয় বলে নাগরিক সমাজ মনে করে।

আমরা, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে, মনে করি যে, রাঙ্গামাটির বাঘাইহাট ও খাগড়াছড়ি জেলা সদরে আদিবাসী পাহাড়ীদের উপর সংঘটিত নৃশংস হত্যাকান্ড, বাড়িঘরে অগ্নি-সংযোগ ও বর্বরোচিত হামলার সুষ্ঠূ তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিৎ। অত্র অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীদের মনে নিরাপত্তার আশ্বাসটুকু ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। এলক্ষ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিম্ম-লিখিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের নিকট উপস্থাপন করা হলোঃ

(১)সংসদীয় কমিটি গঠন করে সরেজমিন ঘটনাস্থল তদন্ত করা ও জনসমক্ষে উক্ত তদন্ত রিপোর্ট করা এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক।

(২)বাঘাইহাট ও খাগড়াছড়িতে সংঘটিত হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত, নিহত ও আহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

(৩)সেটেলার বাঙালীদের বাঘাইহাট থেকে পূর্বের গুচ্ছগ্রামে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

(৪)আদিবাসী জীবন ও সম্পদের পূর্ণ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।

(৫)বাঘাইহাট সেনা-জৌন প্রত্যাহারসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হোক।

(৬)সারাদেশের আদিবাসীদের উপর সকল প্রকার নিপীড়ন-নির্যাতন, ভূমি জবরদখল ও মানবাধিকার লঙ্ঘন অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।

 

 

আপলৌডঃ ২৬/০২/১০

পাঠকের মন্তব্য

পৃথিবীর

পৃথিবীর সর্বত্র নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবতা। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দাবীর সাথে একাত্বতা ঘোষনা করছি।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

The content of this field is kept private and will not be shown publicly.
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

More information about formatting options