• আমি ভাষা খুঁজে পাই
    মতিন সরকার

    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ছাত্রলীগ-পুলিশ-প্রশাসনের ত্রিমুখী বর্বরতায় অনেকে ধিক্কার জানিয়েছেন; আবার অনেকে বলছেন তাঁরা ধিক্কার জানাবার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন। মানুষ কেনো ভাষা পায় আর কেনোই বা কোনো-কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে তা হারায়, তার ত্বাত্ত্বিক আলোচনা হাজির করে কাউকে মূর্খ বা জ্ঞানী প্রতিপন্ন করার কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই। তবে ভাষা যেহেতু ভাবের বাহন তথা ভাবাদর্শেরও বাহন, তাই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট ভাষাটা খুঁজে পাওয়া জরুরী মনে করি।

    প্রথমে আসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে-ক্রমাগত ছাত্র স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বেতন ফী বৃদ্ধি করে চলেছে, নানা রকম রঙ-বেরঙের কৌর্স চালুর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার পেছনের উদ্দেশ্য কি, সে-প্রশ্নে। আশু উদ্দেশ্য হতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে-অর্থ বরাদ্দ থাকে তার সিংহভাগ লুটপাটে চলে যাওয়া এবং নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের চাকুরীর সংস্থান করতে গিয়ে যে-অতিরিক্ত জনবলের সমাগম  ঘটে, তার সুরহা করতে গিয়ে ছাত্রদের উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানো। এ-বোঝা চাপানোটা বহুকাল ধরে চলে আসছে, চাহে সেটা আসহবেনিকলা যে-প্রশাসনই ক্ষমতাসীন থাকুক। যারা উপস্থিত সমাজকে আবহমান কালের জন্য সত্য মনে করেন (মানে সমাজের পরিবর্তন ধাপে ধাপে হবে মনে করেন- ইভলিউশনারি ওয়েতে) তারা ব্যাপারটাকে অর্থাৎ চলমান নীতির হেরফেরকে দুর্নীতি মনে করেন এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ-দেশ গড়তে পারলেই সব ঠিকঠাক হবে বলে সবক দেন। আবার কেউ-কেউ মনে করেন, যে-ই যায় লঙ্কায় সে-ই হন রাবন। মানে লঙ্কায় শঙ্কা। ব্যাপারটা কি তাই না-কি কে লঙ্কায় আছে, কি নীতি বাস্তবায়ন করতে চায়- সেটা মূখ্য বিষয়?

    দ্বিতীয়তঃ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নানান সময়ে নানান জাতের শিক্ষা কমিশনের শিক্ষা-নীতি এবং তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই তা স্পষ্ট হওয়ার কথা। বাংলাদেশ অভ্যুদয় পর্বে যে-গৌরবোজ্জ্বল দুর্বার ছাত্র আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো, তার পটভুমিই ছিল  কুখ্যাত শরিফ কমিশন; পরবর্তিতে আসে আরেক কুখ্যাত হামিদুর রহমান কমিশন - যার সারকথা ছিল শিক্ষা অল্প পয়সায় পাওয়া যায় না। তাই  ’৬৯-এর ছাত্রদের ১১ দফার প্রথম দফাতেই শিক্ষা কমিশন বাতিল এবং বর্ধিত মাসিক ফি প্রত্যাহারের দাবি যুক্ত ছিল।

    তৃতীয়তঃ বাংলাদেশ পর্বেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বহু শিক্ষা কমিশন হয়েছে, প্রত্যেকটার মাধ্যমে রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের উপর একটু-একটু করে দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেনো এমন হয় সেটা বুঝতে হলে, দেখতে হবে কারা ক্ষমতাসীন এবং কী তাদের শিক্ষা-দর্শন (যেমনঃ বাজারের আলু পটলের মত শিক্ষাও একটা কেনাবেচার জিনিস)। অথবা বিপরীত দিক থেকেও পর্যবেক্ষণ করা যায়ঃ শিক্ষা-দর্শন দেখে নির্ণয় করা যায় কারা ক্ষমতাসীন (যারা বস্তু জগতের সকল কিছুকে বিক্রয়যোগ্য মনে করে)। এরাই আবার আজকের নব-উদারীকরণের যুগে, বিশ্বায়নের যুগে প্রতিযোগীতার ত্বত্ত্বে বিশ্বাসী। সকল বাজারে সবার পণ্য বাধাহীনভাবে চলাচলের ত্বত্ত্বে অঙ্গীকারাবদ্ধ। ফলতঃ স্বাধীন অর্থনীতি, স্বকীয়তা ইত্যাদির ধার এরা ধারেন না। অর্থাৎ, কে শিক্ষা বঞ্চিত হল, কে অস্বাস্থ্যকর  জীবন যাপন করছে, অরক্ষিত থাকছে তার খেয়াল রাখা উদারীকরণের নীতি বিরোধী। তাই শিক্ষার ফী বাড়াটাই হলো নীতি। আর তাই বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২০ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন - শিক্ষাকে ক্রমশঃ সংকোচনের জন্য। তারা ক্রমান্বয়ে 'টাকা যার শিক্ষা তার' এ-নীতি বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করেন। একদা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট এই কথাগুলো বলার জন্য বিশেষ অভিমত বের করেছিলো কিন্তু অধিকাংশ ছাত্র তাচ্ছিল্য  করেছিলো যে, এরা কথায় কথায় বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ আমেরিকার জুজু দেখে। যাই হোক, এ-নীতির বিরুদ্ধে যারা দাঁড়াতে চাইবে তাদেরকে 'কঠোর হস্তে দমন' হচ্ছে এ-নীতি বাস্তবায়নের উপায়।

    একদা, বাংলাদেশ স্বাধীন অস্তিত্বের জন্য যতগুলো অঙ্গীকার নিয়ে বিশ্বে মাথা তুলেছিলো, তার সবগুলো অস্বীকার করে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। ’৬২-র ১১ দফার আন্দোলনের পুরোধা মতিয়া-মেনন-তোফায়েল, যারা একদিন একটা বিশেষ বাস্তবতায় ভিন্ন শিক্ষা দর্শনের জন্য লড়েছিলেন, তাঁদের কাছে আজও একই আশা করা ভুলের পুনরাবৃত্তি ছাড়া কিছুই না। তাঁরা মানে তাঁদের সরকার এবং তাদের বিপরীতে থাকা দলসমুহ - যারা অতীতে ক্ষমতাসীন ছিলো - প্রত্যেকটা দলই একই নীতির অনুসারী।

    পার্থক্য শুধু বুলিতে। কেউ ধর্মের দোহাই দিয়ে, কেউ মুক্তিযুদ্ধের দোহাই দিয়ে একইভাবে গণবিরোধী নীতি বাস্তবায়ন করতে থাকে। এবারও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন দমনের জন্য প্রশাসন মুক্তিযুদ্ধের দোহাই দিয়ে স্বাধীনতা-বিরোধী শিবির দমনের নামে গোটা শিক্ষার্থী-আন্দোলনে নির্মম নির্যাতন করলো; দুই শতাধিক ছাত্রছাত্রীকে রক্তাক্ত করলো। প্রশাসনের তথা আওয়ামী লীগের সূর্য সন্তানেরা পিস্তল উঁচিয়ে চমৎকার মহড়া দিলো। সর্বশেষ খবর পেয়েছি, অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা আর অন্ততঃ ১৯০ জন ছাত্রের নামে ৬টি মামলা রুজু। কিন্তু এর পরেও স্বভাবতঃই আওয়ামী প্রশাসকেরা এবং নবতরু-পল্লবিত কিছু নব্য আওয়ামী দালালেরা এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার 'তালেবানীকরণ' নিয়ে চিন্তিত। আশার কথা আন্দোলনরত শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা এগুলো পাত্তা দেননি।

    আন্দোলন মানুষকে সঠিক ভাষা দেয়, চিনতে শেখায় শত্রুর আসল চেহারা। আশা করি, এ-বিশাল আন্দোলনের ঢেউ তরুণ মাঝিদেরকে বলে দেবে, যাদের তারা স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি মনে করে এসেছে, মনে করে এসেছে যারা না থাকলে মৌলবাদ সব গিলে খাবে, আদতে এরা সকলেই এক। আর গিলেতো এরা সবাই খায় - মৌলবাদীই হোক আর জাতীয়তাবাদীই হোক। সুতরাং, শুরুতে যে 'নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট ভাষাটা'র কথা বলেছিলাম, সে-ভাষা নির্মিত না হলে এতো বড়ো আন্দোলন, এতো ত্যাগ, এতো সাহস, এতো এতো কিছু সব বৃথা যাবে।

    আরও একটা সতর্কীকরণ দিয়ে শেষ করছিঃ প্রশাসন তথা সরকার যদি আন্দোলনের চাপে আপাতত কিছু দাবি মেনেও নেয়, তাতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবারও ক্ষমতাসীনদের অথবা ক্ষমতা প্রত্যাশীদের স্বপক্ষ মনে করার ভুল করলে ভবিষ্যতে সে-ভুলের জন্য আরও বড়ো মাশুল দিতে হতে পারে।

    লণ্ডন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন