• ইয়ং বেঙ্গলঃ আধুনিক ভারতবর্ষের প্রথম যুব-বিদ্রোহ ও আজকের প্রেক্ষিত
    পিনাকী ভট্টাচার্য

    উনিশ শতকের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় দশকে বাংলার পশ্চাৎপদ আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের পশ্চাৎপটে কলকাতা শহরে একদল তরুণ কিশোর বয়সের ছাত্র তৎকালীন সমাজের প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। বাংলার বাস্তব সামাজিক পরিবেশে বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কোন উদ্দীপক ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর একটা বিশেষ যুগ-সন্ধিক্ষণ ছিলো এ-বিদ্রোহের উদ্দীপনা। ঐতিহাসিক সে-সন্ধিক্ষণটি ছিলো সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিতন্ত্রে উত্তরণের কাল। এই কালের অভ্যুদয় হয়েছিলো মুলতঃ জ্ঞানবিজ্ঞানের কয়েকটি কালোত্তীর্ণ কীর্তির সমাবেশে - বাংলার ভূখন্ড থেকে বহুদুরে, ইউরোপে। সেখানকার বস্তুবাদী, যুক্তিবাদী এবং সংসয়বাদী-অভিজ্ঞতাবাদী, যান্ত্রিক পরিণামবাদী দার্শনিকেরা এবং বৈজ্ঞানিকেরা সমাজ, মানুষ ও জীবন সম্পর্কে আগের সব প্রত্যয় গুলোকে চ্যালেঞ্জ করে পাশাপাশি নতুন প্রত্যয় গড়ে তুলছিলেন। সমাজের কেন্দ্রস্থিত চালিকাশক্তি লৌকিক ও মানবিক - অলৌকিক অতিমানবিক বা ঐশ্বরিক নয়, এই-ই ছিল নতুন যুগের বাণী।

    সুদূর ইউরোপ থেকে এই যুগান্তকারী সমাজ দর্শন, বৈপ্লবিক জীবনবোধ, ব্যক্তিচেতনা ও প্রগতিবোধ কলকাতা শহরের হিন্দু কলেজের (বর্তমান প্রেসিডেন্সি কলেজ) একদল তরুণ ছাত্রের মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করলো। নতুন মৌলিক চিন্তার প্রভাব যে কতো সুদূরপ্রসারী হতে পারে, ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন তার প্রমাণ। এই বিদ্রোহের মন্ত্রদাতা গুরু হলেন একজন ফিরিঙ্গী শিক্ষক - হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। তিনিও বয়সে তরুণ, ছাত্রদের চেয়ে দু-তিন বছরের বড়। ডিরোজিও যখন হিন্দু কলেজের শিক্ষক নিযুক্ত হন তখন তার বয়স ১৭-১৮ বছর। আর ছাত্রদের বয়স ১৩-১৬ বছর। অর্থাৎ গুরু ও শীষ্য সকলেই 'টিন এজার' - কিশোর।

    আঠারো বছরের শিক্ষক ডিরোজিও এমন কী জীবন-মন্ত্রে তাঁর কিশোর ছাত্রদের দীক্ষা দিয়েছিলেন যা তাঁদের মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল? সেটা ছিল নতুন জীবনবোধ এবং সমাজচেতনার মন্ত্র; ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য ও আত্মমর্যাদার মন্ত্র; যুক্তিবাদ আর বুদ্ধিবাদের মন্ত্র; প্রগতিবাদের মন্ত্র। নবযুগের দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিকদের রচনা ডিরোজিও তাঁর ছাত্রদের পাঠ করে শোনাতেন, ক্লাসের পাঠ্য বিষয়ের বাইরে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিচিত্র জগতের রূপের সাথে ছাত্রদের পরিচয় করিয়ে দিতেন। ডিরোজিওর ছাত্ররাই বলেছেন যে, তাঁর ক্লাস ছিল প্লেটো-আরিস্টটলের অ্যাকাডেমির মতো। ক্লাস রুম থেকে, কলেজের বারান্দা, বারান্দা থেকে রাস্তা, রাস্তা থেকে ডিরোজিওর বাড়ির ড্রয়িং রুম পর্যন্ত আলোচনা চলত। আলোচনা থেকে বিতর্ক। বিতর্কে উৎসাহ দিতেন ডিরোজিও। ডিরোজিও বলতেন, বুদ্ধিমান মানুষ তাঁর নিজের বুদ্ধি, যুক্তি, বিবেক ও বিচারশক্তি দিয়ে ন্যায় অন্যায়, কর্তব্য-অকর্তব্য বিচার করবে -  শাস্ত্র-বচন, গুরু-বচন বা দৈব-বচন বলে কিছু অন্ধের মতো গ্রহণ বা পালন করবে না।

    ডিরোজিও র ছাত্রদের বিতর্ক সভা গঠিত হোল, নাম, 'অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন', স্থান ছিল শ্রীকৃষ্ণ সিংহের মানিকতলার বাগানবাড়ি। এই অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন সম্পর্কে রেভারন্ড লাল বিহারী দে লিখেছেন, মানিকতলার এই বাগানবাড়ীর হলঘরে ইয়ং ক্যালকাটা গোষ্ঠীর সেরা রত্নরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ সামজিক, নৈতিক, দার্শনিক ও ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্কের ঝড় বইয়ে দিতেন। ঝড়ের মধ্যে জীর্ণ পুরাতনের বিরুদ্ধে তরুণদের বিদ্রোহী মনের পুঞ্জিভুত ক্ষোভ প্রকাশ পেত। ভয়ঙ্কর ক্ষোভের প্রচণ্ড প্রকাশ। মনে হতো যেন কোন গুহাভ্যন্তর থেকে সিংহ শাবকরা গর্জন করছে। তাঁদের মুখের বুলি ছিল “ডাউন উইথ হিন্দুইজম, ডাউন উইথ অর্থোডক্সি”। এই বুলি মিছিলে উচ্চারিত হতো না, উচ্চারিত হতো বিতর্কসভায়। সেই বিতর্কের মান সম্পর্কে আলেকজাণ্ডার ডাফ লিখেছেন, প্রত্যেক বিষয়ে মতবাদ ব্যক্ত করার সময় বক্তারা ইংরেজি সাহিত্য থেকে, বিশেষ করে বায়রন, স্কট, বার্নস থেকে অনর্গল উদ্ধৃতি প্রয়োগ করতেন। ঐতিহাসিক বিষয় হলে রবার্টসন ও গিবন; রাজনৈতিক বিষয় হলে অ্যাডাম স্মিথ ও জেরোমি বেন্থাম; বৈজ্ঞানিক বিষয় হলে নিউটন ও ডেভি; ধর্মীয় বিষয় হলে হিউম ও টমাস পেইন; আধ্যাত্মিক বিষয় হলে লোক রীড, স্টুয়ার্ট ব্রাউন প্রমুখ মনিষীর রচনা তরুণ তার্কিকেরা নিজেদের বক্তব্যের সমর্থনে অবলীলাক্রমে আবৃতি করতেন।

    সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক বিষয় হলো এই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা। সে সময় হিন্দু কলেজের মোট ছাত্র ছিল ৫০০ র মতো; পরিবার ও সমাজের বিরুদ্ধে কিছু করার মতো সাহস তাঁদের অনেকেরই ছিল না। ডিরোজিওর শিক্ষাদর্শের প্রভাব তাঁদের অনেকের উপরেই পড়েনি। কাজেই ইয়ং বেঙ্গল তরুণ চক্রের আয়তন খুবই ক্ষুদ্র ছিল। খুব বেশী হলে ২০-২৫ জন এই বিদ্রোহে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠী তাঁদের মেধা আর মননের বিদ্রোহ দিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙ্গালী মনীষাকে প্রভাবিত করেছেন আর আজকেও আলোচনার আর প্রেরণার বিষয় হয়ে থেকেছেন।

    ইয়ং বেঙ্গলের বুদ্ধি-সেনাদের সামনে বাধাও ছিল অনেক। শুরুতে বড়ো বাঁধা ছিল তরুণদের বক্তব্য প্রকাশ করার মতো কোন মুখপত্র ছিল না। ইতিমধ্যে তাঁদের বিষয়ে হিন্দু সমাজের কর্ণধাররা রীতিমতো বিচলিত হয়ে উঠছিলেন। ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বিতারন করা হয়।  প্রতিদ্বন্দ্বী প্রবীণদের হাতে ছিল অসংখ্য পত্রিকা। দিনের পর দিন তাঁরা সেইসব তরুণদের ধ্যানধারণা ও আচার ব্যবহারের দুর্মর সমালোচনা করতেন।

    নিজেদের প্রতিষ্ঠিত এনকোয়েরার, পার্থিনন আর জ্ঞানান্বেষণ নামে দুটো ইংরেজি আর একটা বাংলা পত্রিকায় সেই সব প্রচারের জবাব দিতেন তরুণরা। জবাবের নমুনা, "আমরা হিন্দুধর্মের তথাকথিত পবিত্র মন্দির ত্যাগ করেছি বলে গোঁড়া বৃদ্ধরা আমাদের উপর মারমুখী হয়েছেন। আমাদের তাঁরা সমাজচ্যুত করবেন, আমরা কুসংস্কার বর্জন করতে চাই এই অপরাধে। কিন্তু আমাদের বিবেক ও বুদ্ধি যথেষ্ট সজাগ এবং আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে আমরা যা করছি তা খুবই ন্যায়সঙ্গত। অসীম ধৈর্য ধরে আমরা আমাদের কর্তব্য করবো প্রতিজ্ঞা করেছি। আমাদের প্রতিপক্ষ বয়োবৃদ্ধরা যদি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে আমাদের উপর খড়গহস্ত হন, আমরা ভীত হবো না, প্রয়োজন হলে মৃত্যুও বরণ করবো। সংগ্রাম করে আমরা যেটুকু অধিকার অর্জন করেছি তা এক তিলও ছাড়বো না। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সমাজের প্রবীণ কর্ণধাররা মিত্থার আশ্রয় নিয়ে কীভাবে প্রতিদিন নানা রকমের প্রচারপত্র বিলি করে আমাদের স্বভাবচরিত্র সম্বন্ধে কলঙ্ক রটাচ্ছেন। যাবতীয় অপকৌশল করে তাঁরা আমাদের দমন করতে উদ্যত হয়েছেন, কোন ধর্মবোধ বা নীতি বোধ বাধছে না। কিন্তু কোন অপকৌশল, কোন চক্রান্ত বা হুমকির কাছে আমরা মাথা হেঁট করবো না। যত নির্মম হোক, সমস্ত অত্যাচার আমরা সহ্য করতে প্রস্তুত, কারণ আমরা জানি একটা জাতিকে সংস্কার মুক্ত, উদার ও উন্নতিশীল করতে হলে সমাজে খানিকটা গণ্ডগোল ও বিভান্ত্রির সৃষ্টি হবেই। কাজেই গণ্ডগোল আমরা করবো, হল্লা করবো, চেঁচামিচি করবো, তারস্বরে প্রতিবাদ করবো, সমাজে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার কুসংস্কার ও কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে।"

    প্রবীণদের প্রচারণা-কর্মে একটা মজার চরিত্র ছিলেন বৃন্দাবন ঘোষাল। এই দরিদ্র ব্রাহ্মণ সকালে গঙ্গাস্নান করে বাড়ী-বাড়ী ঘুরে বিদ্রোহী তরুণদের বিরুদ্ধে আজগুবি গল্প করে বেড়াতেন, বিনিময়ে পেতেন সমাজপতিদের নগদ দাক্ষিণ্য। এমন জীবন্ত প্রচারপত্র যখন আজকের দিনেও বেশ কাজ দেয়, তা যে তখনও দিয়েছিল সেটা অনুমান করা যায়।

    ইয়ং বেঙ্গলের বিদ্রোহ এমন প্রেক্ষিতে শুরু হয়েছিলো যখন পাশ্চাত্য সমাজের জীবন দর্শনের সঙ্গে আমাদের মানসিক ক্ষেত্রে সামান্য সংযোগ হয়েছিলো। যে-বিদ্রোহ শুরু হয়েছিলো তা ছিল বুদ্ধিপ্রনোদিত। পাশ্চাত্যের দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও মনীষীরা সেই বিদ্রোহের প্রেরণা সঞ্চার করেছিলেন। তরুণদের স্বপ্নে প্রতিভাত হয়েছিলো পাশ্চাত্যের উদার, স্বাধীন, যুক্তিভিত্তিক, বুদ্ধি-নির্ভর সমাজপ্রতিমা। যদিও এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর উত্তপ্ত বিতর্ক আর রচনার আবেগ নিঃশেষিত হয়ে এক সময় শান্ত হয়েছিলো, তবুও তা যুগে যুগে বাঙালী তারুণ্য আর মনীষাকে পথ দেখিয়েছে।

    আজকের বাংলায় তরুণদের সমস্যা অনেক এবং বিচিত্র। যে-বয়সে আশা ও কল্পনায় তার বিশ্ব রাঙানোর কথা সেই বয়সেই অগাধ নৈরাশ্যে তাঁরা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি পরিবারতান্ত্রিক উৎকট লক্ষ্যহীন রাজনীতি জাতির গলায় যে-ফাঁস পড়িয়েছে, সেটায় যুবসমাজের সতেজ প্রান হাঁসফাঁস করছে। তরুণদের ক্রুদ্ধ ও বিক্ষুব্ধ হবার সঙ্গত কারণ আছে, স্ফুলিঙ্গের অভাবে শুধু সেটা বিস্ফোরিত হতে পারছে না। আজকের নতুন যুব বিদ্রোহকে শুধু সমাজের অন্ধকার কাটানোর জন্য নতুন সংগ্রামের সুচনা করলেই চলবে না তাকে এক নতুন লক্ষ্যে প্রত্যয়ী জাতিকে ধাবিত করার যে অতি জরুরী কাজটি অসমাপ্ত থেকে গেছে, সেটিকেও সম্পন্ন করতে হবে। আর এই কাজটি শুরুর জন্য খুব বেশী মানুষের প্রয়োজন নেই, ইয়ং বেঙ্গল সেই শিক্ষাই দেয়।

    শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৩
    ঢাকা, বাংলাদেশ

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন