• গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচন এবং আন্দোলনে সহিংসতার বিস্তৃতি
    এ কে এম ওয়ারেসুল করিম

    দেশে সরকার-বিরোধীদের ডাকে একটানা ছয় দিনের অবরোধের আজ চতুর্থ দিন শেষ হলো। পুরো দেশ মনে হয় এক মৃত্যু-উপত্যকা। এক দিকে চলছে আতশবাজির মত দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে মানুষের গায়ে ককটেইল বিস্ফোরণের উৎসব আর যানবাহন দেখে-দেখে পেট্রোল বোমা মারার বর্বর মহড়া, অন্যদিকে চলছে কমপক্ষে দু’টি সুসংগঠিত বাহিনীর নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। পুলিশ-বিজিবি’র reckless ফায়ারিং-এ আজ (৩ ডিসেম্বর ২০১৩) সকালেই নির্মমভাবে হত্যা করা হলো মাত্র ১৫ বছরের কিশোর সিয়ামকে। কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর হাতেই গত চার দিনে নিহত হয়েছেন প্রায় ২৭ জন প্রতিবাদকারী। সেদিনের অগ্নিদগ্ধ আরও একজন মারা গেলেন আগকেই। মৃত্যুর বিভীষিকা দেশটিকে ভালো ভাবেই পেয়ে বসেছে মনে হয়।

    গত চারদিন ধরে যা চলেছে তাকে madness বললে খুব কমই বলা হবে। এর আগে হয়ে গেলো বিরোধীদের ডাকা টানা তিন দিনের প্রথম অবরোধ। সেই তিন দিনের প্রতিটি দিনই কারো না কারো জন্য ছিলো বিভীষিকাময়। কেউ হারিয়েছেন পিতা বা মাতা; কেউ পুত্র বা কন্যা; কেউ ভ্রাতা বা ভগিনী; আর কেউ বা প্রিয় বন্ধু-বান্ধবী। অবরোধের প্রথম প্রহর থেকেই শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। মনে হয়েছিলো পুলিশের গুলি আর অবরোধকারীদের ককটেইল-বোমার মধ্যে চলছে নরহত্যার এক বিকৃত প্রতিযোগিতা। কিন্তু সব নিষ্ঠুরতা আর কাণ্ডজ্ঞানহীনতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে যে-বর্বরতা, সে-দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটলো অবরোধ শেষ হবার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। সবাই জানেন কী ঘটেছিলো সেদিন শিশু পার্কের সামনের রাস্তায় চলন্ত বাসে।

    বৃহস্পতিবার শিশু পার্কের সামনে যে নারকীয় ঘটনা ঘটে গেলো – বিহঙ্গ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে দুর্বৃত্তদের ছুড়ে দেয়া পেট্রোল বোমার বিস্ফোরণে ১৮-১৯ জন নিরীহ বাসযাত্রী অগ্নিদগ্ধ হয়ে দুজন হতভাগ্য কিশোর ইতোমধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। বাকিরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ণ ইউনিটে তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। হয়তো দুয়েকদিনের মধ্যে আরও কয়েকজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন। শিশুপার্কের সামনের এ ঘটনাটি কিন্তু নিরীহ মানুষকে আগুনে পুড়ে মারার প্রথম ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক আন্দোলনে, বিশেষ করে বিরোধী দলের ডাকা হরতাল-অবরোধের সময় চলন্ত, এমনকি পার্ক করা যানবাহনেও অগ্নিসংযোগের এক ভয়াবহ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মনির নামের ১৪ বছরের একটি কিশোর তার বাবার সাথে ঢাকা শহর ঘুরে দেখতে এসে আগুনে অঙ্গার হয়ে তাঁর হতভাগিনী মায়ের কাছে ফিরে গিয়েছে। মনিরের পথ ধরে গতকাল চিরনিদ্রায় ঢলে পড়লো কৈশোর পার করে যৌবনে পা দেয়া ২০ বছরের নাহিদ, যে ঢাকায় এসেছিলো শীতের শুরুতে একটি লাল জ্যাকেট কিনতে। তার পরদিন নাহিদের কাজিন রবিনও তাঁর অগ্নিদগ্ধ দেহ নিয়ে মৃত্যুর সাথে অসম যুদ্ধে হেরে গেলো।

    মনিরের অকাল মৃত্যু আমাদের বিবেক কে নাড়া দিয়েছে। মনিরকে নিয়ে গান লিখেছেন প্রীতম। সুস্থ চিন্তা সম্পন্ন দেশবাসী মনিরের মৃত্যুতে অসহিষ্ণু আর সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির চলমান অসুস্থ ধারাকে ধিক্কার জানিয়েছে, নিন্দা করেছে অসুস্থ রাজনীতির সহিংস ধারার। রাজনীতির নামে এভাবে নিরীহ মানুষের গায়ে পেট্রোল ঢেলে যানবাহনের ভিতরেই নির্দয়ভাবে পুড়িয়ে মারার নির্মমতায় বিবেকবান দেশবাসী হয়েছে শোকাহত। কিন্তু কে শোনে কার কথা! বিরোধীদলগুলোর চলমান আন্দোলন তাঁদের নিয়ন্ত্রনে আছে কি না এ-নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশের সাথে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, পুলিশের লাঠি চার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ এমন কি কখনও কখনও গুলিবর্ষণের ঘটনাও আমাদের অজানা নয়। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে আন্দোলন দমনের এক ভিন্ন কৌশল। ৫ থেকে ১০ জন প্রতিবাদকারীর ছোট একটি গ্রুপের মিছিলও যদি রাস্তায় দেখা যায় তার ওপরই লাঠি, গুলি আর টিয়ার গ্যাস নিয়ে হামলে পড়ছে পুলিশ, আধা-সামরিক বাহিনী আর সাথে অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে ছাত্রলীগ বা যুবলীগের বীরসেনানীরা থাকেন বলে প্রায়ই খবরে দেখা যায়। একদিকে হরতাল-অবরোধে নিরীহ মানুষ পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে আর অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভয়াল থাবায় ঝরে পড়ছে রাশি রাশি তাজা প্রাণ। মানবতার এমন আর্তনাদ স্বাধীনতার পর আর কবে দেখা গেছে মনে করতে পারেন কি কেউ?

    মৃত্যুর এ অন্তহীন মিছিলে আরও ক'জনকে কবে যোগ দিতে হবে তা কেবল ঈশ্বরই জানেন। ঢাকা মেডিক্যালের বার্ণ এ্যণ্ড প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ডের বাতাস অগ্নিদগ্ধ নরনারী আর শিশুর মৃত্যু যন্ত্রণা আর বাঁচার আর্তিতে ভারী হয়ে গেছে অনেক আগেই। দেশে কোনও ওয়াইল্ডফায়ার নেই, কোথাও কোনো দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি অথচ অগ্নিকাণ্ডে আহতদের ভীড়ে হাসপাতালের বার্ণ ইউনিট উপচে পড়ছে – এমন অভাবিত পরিস্থিতি বুদ্ধিবিবেকসম্পন্ন প্রতিটি মানুষকে যার পর নাই ব্যথিত, ক্ষুব্ধ আর ক্রুদ্ধ করেছে। এ-ধরণের ক্রিমিনাল, ঘৃণ্য আর গণবিরোধী কার্যক্রমকে কোনভাবেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলতে নারাজ দেশবাসী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সরকার এ-জঘন্য ঘটনাগুলো থেকে সস্তা 'প্রপাগাণ্ডা বেনেফিট' নিতে যতটা আগ্রহী, অগ্নিসংযোগকারী দুর্বৃত্তদের ধরতে এবং তাদের এ-অপকর্মে কেউ নিয়োগ করে থাকলে তাদের বিচারেরর আওতায় নিয়ে আসতে ততটাই অনিচ্ছুক। কোনও তথ্য প্রমান ছাড়া সরকারী দল আর অনুগত এক শ্রেণীর গণমাধ্যম সকল বোমা হামলার জন্য বিরোধীদলকে দায়ী করছে আবার বিরোধীদলও কোনও সাক্ষ্য প্রমান ছাড়া এ-হীন কাজগুলোর পেছনে সরকারের নিযুক্ত এজেণ্টদের’ দায়ী করে যাচ্ছে। এতে বোমা হামলা যেমন বন্ধ হচ্ছে না, এ-নিষ্ঠুরতার শিকারদের ভাগ্যেরও কোন পরিবর্তন হচ্ছে না।

    সরকারের কোনো কার্যক্রম মনঃপুত না হলে তার প্রতিবাদ করতে পারা জনগনের সাংবিধানিক অধিকার। সরকারের দায়িত্ব কোন নির্দিষ্ট দলকে নয়, সকল মতের মানুষের সকল বৈধ অধিকার সংরক্ষা করা। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে সরকার পুলিশ, আমলাতন্ত্র, আধা-সামরিক, সামরিক বাহিনী - সবকিছুকে জনগনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। পাকিস্তানীরা করেছে, বঙ্গবন্ধু, জিয়া, এরশাদ, খালেদা, হাসিনা, সবাই করেছেন - কেউ বেশি, কেউ কম। কিন্তু গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের বাণী দু’টোই নির্বাসিত। দেখা যাচ্ছে, বর্তমান সরকারের পুরো সময়জুড়ে, বিশেষ করে এ বছরের শুরু থেকে পুলিস প্রতিবাদকারীদের রাস্তায় দাঁড়াতেই দিচ্ছে না। প্রতিবাদকারীরাও যে সব সময় শান্তিপূর্ণ আর নিরস্ত্র ছিলো, সেটা বলা যাচ্ছে না। বিরোধীদলের আন্দোলন এবং কয়েকটি হরতালে বিরোধীদলীয় কর্মীদের আক্রমণে পুলিস বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্যের প্রাণহানিও দেশবাসীকে দেখতে হয়েছে। তথাপি তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক সহিংস প্রতিবাদের ঘটনাগুলোর অজুহাতে বছরজুড়ে দেশব্যাপী নাগরিকের প্রতিটি মিছিল, সমাবেশ, এমন কি মানব বন্ধনেও লাঠিচার্জ আর গুলি চালানো কতটা গণতন্ত্র আর সংবিধান-সম্মত? সহিংসতা দমনের নামে সরকারী বাহিনীগুলো নিজেদের অসহিষ্ণু আচরণের দ্বারা  নিজেরাই কয়েকগুণ বেশী সহিংসতার আশ্রয় নিচ্ছে। একাত্তর জার্নালের ২ ডিসেম্বর রাতের একজন আলোচকের মতে, পুলিসের গুলিতে গত কয়েক মাসে ৩০০ এর বেশী প্রতিবাদকারী মারা গিয়েছেন।

    সরকার-বিরোধীদের আন্দোলন দমনে সরকারী বাহিনীগুলোর এহেন আক্রমণাত্মক, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী, অগণতান্ত্রিক এবং অসাংবিধানিক অত্যাচার, নির্যাতন আর নিপীড়নের ফলে বিরোধীদলের পক্ষে শান্তিপূর্ণ পন্থায় দাবী আদায়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করার সুযোগ আশংকাজনকভাবে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের একচেটিয়া দলীয়করণের ফলে বিরোধীদলের পক্ষে রাজনীতির ট্র্যাডিশনাল আচার-আচরণ মেনে রাজনীতি করা এক ধরণের আত্মহত্যার শামিল বলে অনেকে মনে করেন। একজন নাগরিকের শেষ আশ্রয়স্থল বিচারবিভাগ। সরকার বিরোধীদলের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা মোটামুটি জানা কথাই। কিন্তু আদালতে গিয়েও এর কোন রিকোর্স পাওয়া যাবে না - এ-বার্তা একজন নাগরিকের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত, খুবই ভয়ঙ্কর। সবকিছু মিলে রাজপথে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের রাস্তা দিনে-দিনে সরকারই বন্ধ করে দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। একজন চীফ হুইপ দিনে দুপুরে রাজপথে ক্যামেরার সামনে পুলিশের হাতে বেধড়ক মার খাবার পর এ-ঘটনার বিচার করা তো দুরের কথা ঐ-ফৌজদারি অপরাধকারী পুলিস-সদস্যকে যদি Presidential medal দেয়া হয় আর বলা হয় যে, ঐ medal টি দেয়ার ক্ষেত্রে চিফ হুইপকে প্রহারের ঘটনা বিবেচনায় নেয়া হয়েছিলো, তারপর আর কোন্‌ পাগল সরকারের 'সভ্য' আচরণের ওপর আস্থা রাখবে?

    ৪ ডিসেম্বর ২০১৩

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন