• [গ্রন্থালোচনা] লোকসংস্কৃতির তত্ত্বগত পরিচায়ক গ্রন্থ ‘লোকশিল্প : তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত’
    রাজেশ খান

    ‘লোকশিল্প : তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত’ গ্রন্থখানি, ড. মণ্ডলের প্রায় দেড় দশক অধ্যাপনা ও দুই দশক ধরে গবেষণা করার ফসল। ‘লোকসংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে লোকশিল্পের যথার্থ তাৎপর্য ও ব্যবহারিক মূল্য নির্ধারণে প্রয়োজন লোকসংস্কৃতিবিজ্ঞানের নিরিখে সমাজবিজ্ঞাননিষ্ঠ অনুশীলন।’ আর তার সার্বিক প্রকাশ ঘটেছে তাঁর নিবিড় পরিশ্রমে। ড. মণ্ডলের গবেষণার বিষয় ছিল ‘ পশ্চিমবঙ্গের শঙ্খশিল্প ও শাঁখারী শিল্পীসমাজ’। এই গ্রন্থ সেই বিষয়নিষ্ট গভীর চিন্তন-চেতনা ও গবেষণার সুচিন্তিত অনুশীলনের টেক্সুয়াল রূপ। লোকসংস্কৃতির বিষয়গত পরিধিতে অবস্থান লোকশিল্পের। আর এই লোকশিল্প নিয়ে এযাবৎকাল গ্রন্থ-প্রবন্ধাদি রচনার প্রয়াস, সংখ্যার নিরিখে নেহাতই কম নয়। তত্ত্ব-পদ্ধতি ও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের নিরিখে, বাংলা ভাষায় লোকশিল্প নিয়ে, এমন মৌলিক জ্ঞানগর্ভী রচনা এই প্রথম। লোকসংস্কৃতি উপাদানের আলোচনাকে, লোকসংস্কৃতি থেকে লোকসংস্কৃতিবিজ্ঞানে উত্তীর্ণ করতে এমন ধরনের আলোচনা বিশেষ সাধুবাদ পাবার যোগ্য।




    লোকশিল্প : তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
    ড. সুজয়কুমার মণ্ডল
    নটনম্‌কোলকাতা
    ৪০ ই/৩, অনুপমা হাউজিং কমপ্লেক্স
    ভি. আই. পি রোড, কোলকাতা - ৭০০০৫২
    প্রচ্ছদ - ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য


    ‘লোকশিল্প : তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত’ গ্রন্থে, ড. মণ্ডল আলোচনাকে তিনটি অধ্যায়ে  বিন্যস্ত করেছেন। বেশ কিছু উপ অধ্যায়ও বর্তমান। প্রথম অধ্যায় - প্রসঙ্গ লোকশিল্প। এর আবার চারটি উপ অধ্যায় রয়েছে। ১) প্রেক্ষাপট; ২) শিল্পঃ চারু ও কারু; ৩) লোকশিল্প-হস্তশিল্প-কুটিরশিল্প এবং ৪) লোকশিল্পকলা সংজ্ঞা, স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য ও বর্তমান অবস্থা। এই অধ্যায়টিতে আলোচনার মূল সুরটি বাধা রয়েছে - লোকশিল্প সম্পর্কে ধারণা দান, বৈশিষ্ট্য এবং অবস্থানগত ক্ষেত্র। ‘..... শিল্পধারায় শিকড়ের সংযোগ কতটা সজীব’ তাও অনুসন্ধানের দূরবীণে রয়েছে। এক কথায় লোকশিল্পের একটি সার্বিক ধারণা দানের উদ্দেশে এই অধ্যায়টি রচিত। তবে তা কেবল পূর্ববর্তী গবেষক ও গ্রন্থ প্রণেতাদের আলোচনা ও চিন্তনের অনুবর্তন নয়, নিজস্ব ভাবনা-গুনে ভাস্বর এই আলোচনাংশ।

    গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ের নামাঙ্কিত শিরোনাম - প্রসঙ্গ বাংলা লোকশিল্পের বৈচিত্র্য ও শ্রেণীগত বিভাগ। এই অধ্যায়ে গ্রন্থকার লোকশিল্পকলার শ্রেণীগত বিভাজন করেছেন। একটু ভিন্নভাবে, অন্য দৃষ্টিতে। অগ্রজদের আলোচনাকে মাথায় রেখে, নিজস্ব ভাবনাকে তুলে ধরেন। যেখানে অগ্রজদের (লোকশিল্পকলার শ্রেণীগত বিভাজন) ভাবনার যে সীমাবদ্ধতা, তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রন্থকার উত্তীর্ন হয়েছেন । লোকশিল্পের শ্রেণি-বিভাজনে রেখেছেন নিজস্বতার ছাপ। পূর্ববর্তীদের লোকশিল্পের শ্রেণী বিভাজনে সীমাবদ্ধতা লক্ষ্যণীয়। লোকশিল্পের সার্বিক অবয়ব এখানে ধরা পড়েনি। এই শূন্যতা ড. মণ্ডলকে বহুকৌণিক দিক থেকে ভাবিয়েছে এবং তার ফল - ‘ সুনির্দিষ্ট ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণের আলোকে’ লোকশিল্পকলার তদাপেক্ষা বেশি গ্রহণযোগ্য শ্রেণীবিভাগ।

    এক্ষেত্রে ড. মণ্ডল নিজের আয়ত্ত্বগত পরিসীমার কথা মাথায় রেখেছেন। একজন গবেষক বা গ্রন্থ প্রণেতার পক্ষে  সারা ভারত বা বিশ্বের লোকশিল্পকলার শ্রেণী বিভাজন করা সম্ভব নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেকে তেমনটা করার দুঃসাহস দেখালেও, গ্রহণযোগ্যতা বা সার্বিকতার প্রশ্নে ধরা পড়ে সমালোচিত হন। তাই তিনি কেবলমাত্র বাংলার নিরিখে লোকশিল্পকলার শ্রেণী বিভাজন করেছেন। যদিও শ্রেণী-বিভাজনের কোনো বিধিবদ্ধ রূপ হয় না, তবুও তিনি লোকশিল্পকে চৌদ্দটি বিভাগে ভাগ করেছেন। প্রতিটি বিভাগকরণে লেখকের সুচিন্তিত মতামত রয়েছে, যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। ভৌগোলিক অঞ্চলভিত্তিক, উপাদানভিত্তিক, লিঙ্গভেদভিত্তিক (শিল্পী), শিল্পীশৈলীভিত্তিক (শিল্পরূপ), ব্যবহারগত, শিল্পমোটিফ ভিত্তিক, জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক, গঠনগত শৈলীভিত্তিক ইত্যাদিগত দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যময় লোকশিল্পের, এতগুলি প্যারামিটারে বিভাজন সম্ভব - তা ড. মণ্ডলই প্রথম দেখালেন।

    গ্রন্থটির 'ফাইণ্ডিংস' অংশ হল তৃতীয় অধ্যায়। গ্রন্থের বুননে তিনটি অধ্যায়েরই প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। তার মধ্যে তৃতীয় অধ্যায় বিশেষত্বের দাবী রাখে। লোকসংস্কৃতির উপাদানের বহুমাত্রিক অনুশীলনের পথরেখা দেওয়া হয়েছে ‘প্রসঙ্গ লোকসংস্কৃতিবিজ্ঞান এবং লোকশিল্প অনুশীলনে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও তত্ত্ব-পদ্ধতির ভূমিকা’ নামাঙ্কিত অধ্যায়ে। লোকশিল্প ও শিল্পী সমাজের সামগ্রিক রূপচিত্র - লোকসংস্কৃতিবিজ্ঞানের প্রেক্ষিতে গভীর বিচার-বিশ্লেষণে আরোও বিধিবদ্ধ রূপ কিভাবে দেওয়া যেতে পারে, তারই প্রামাণ্য ‘লোকশিল্প : তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত’ গ্রন্থখানি। লোকসংস্কৃতির বিজ্ঞান ভিত্তিক আলোচনায়, অর্থাৎ লোকসংস্কৃতিবিজ্ঞান কেন্দ্রিক অনুশীলনে, লোকশিল্প-চর্চার যথেষ্ট পরিসর রয়েছে।

    সমাজ-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি আলোচনায় একটা বিশেষ প্রবণতা হলো, তা বিবৃতিধর্মী থেকে বিশ্লেষণধর্মী হয়ে ওঠা। লোকশিল্প চর্চাও একই রাস্তা বেছে নিয়েছে। ড. মণ্ডলের অগ্রজদের আলোচনা ছিল অনেকটাই বিবৃতিধর্মী। কিন্তু তাঁর এই প্রয়াস সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছে। বিবৃতিধর্মী থেকে বিশ্লেষণধর্মীতায় পা মাড়িয়েছে। এবং তাতে তত্ত্বকথার ভারি ভারি কথা দিয়ে বইটিকে মুড়ে দেওয়া হয়নি।

    তত্ত্ব-পদ্ধতি ও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের প্রয়োগ কৌশল যথাযথ ভাবে বর্ণিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে। বিশেষভাবে মেটাফোকলোর বা পরালোকসংস্কৃতি ও প্রসঙ্গবাদ বা কনটেক্সুয়াল থিয়োরির কথা। Recent trends in Folkloristic-র ধারায় এমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং জ্ঞানগর্ভী আলোচনা লোকসংস্কৃতিবিজ্ঞান কেন্দ্রিক অনুশীলনে মেলা ভার। তবে তত্ত্বকথার ভূত পাঠকদের তাড়া করবে না। লোকসংস্কৃতির অনুশীলন, লোকসংস্কৃতি থেকে লোকসংস্কৃতিবিজ্ঞানধর্মী হয়ে ওঠার যে ইতিহাস - সেই ধারায় লোকশিল্পের তত্ত্বগত প্রেক্ষিত নিয়ে এই গ্রন্থ-সংকলন অনন্যতার নজির। সত্যই লোকসংস্কৃতিবিজ্ঞান কেন্দ্রিক অনুশীলনে লোকশিল্প-চর্চার একটি ক্রোশদর্শিকা আলোচ্য গ্রন্থটি। সহজ ভাষা এবং সুনিপুণ বর্ণনা ও বিশ্লেষণ পাঠক মনকে পেন্ডুলামের মতো নাড়িয়ে দেয়। প্রবীণ লোকসংস্কৃতিবিদদের খানিকটা নড়ে চড়ে বসায়। আর নবভাবে ভাববার জন্য নবীনদের মনকে খানিকটা উসকে দেয়। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ বেশ নয়নাভিরাম এবং গ্রন্থটির সঙ্গে সুসামঞ্জস্যপূর্ন।

    প্রথম প্রকাশঃ ৩০/অক্টোবর/২০১৬
    লেখকঃ এম.ফিল ছাত্র। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ায় অবস্থিত কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসংস্কৃতি বিভাগে গবেষণারত।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন