• বাসে চেঁচিয়ে ফোনালাপ ও একটি চড়
    আশফাক চৌধুরী

    ১৩ তারিখ, শুক্রবার, সাউথ লন্ডন থেকে ১৫ নাম্বার বাস নিয়ে ফিরছিলাম ইস্ট লন্ডন । দোতলা বাসের উপরের ডেকে আমার একটু সামনের সারির আসনে বসেছিলেন দুই বাঙালী তরুন। বয়স ২৫-২৬ হবে। তাদের মধ্যে একজন নির্বিকারভাবে নানান জাতের মানুষের মাঝখানে বসে উচ্চস্বরের বাংলায় ফোনালাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন দীর্ঘ-সময় ধরে। ইচ্ছা না থাকলেও তার কথাবার্তা ঢুকে যাচ্ছিলো কানে। যুবকটি দেশে তার বাবার সাথে কথা বলছিলেন। প্রায়-চিৎকার করে যুবকটি এটাই বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে তিনি অমুকের চেয়ে কম কাজ করেন, তমুক তার চেয়ে বেশি কাজ করেন; এসব কারণে তার আয়-ইনকাম কম। বাবাটি সম্ভবত তার কথাবার্তায় খুশী হতে পারছিলেন না। তাই চলছিলো বাস-ভর্তি নানান জাতের মানুষের উপস্থিতি অগ্রাহ্যকারী চেঁচানো।

     আশেপাশের যাত্রীদের খুব ক্লান্ত মনে হলো। কাজ শেষে বাড়ী ফেরার পথে সবাই ক্লান্ত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যুবকের ফোনালাপে তাদেরকে বেশ বিরক্ত মনে হচ্ছিলো। কিন্তু না পারতে কেউ কাউকে কিছু বলে না এখানে। আর বাসে-ট্রেনে বসে অভব্যভাবে চেঁচিয়ে কথাবার্তা বা উঁচু-শব্দে মিউজিক শোনা এসব লোকজন নিজের ভুল স্বীকারের পরিবর্তে অনেক সময় ভীষণ দুর্বিনীত আচরণ করে মানুষ-জনের সাথে; সেজন্য অসুবিধা বোধ করলেও লোকে এদের এড়িয়ে যায়। ২৫ নাম্বার বাসে কিছু অভব্য বাঙালীর এহেন আচরণ দেখতে-দেখতে গা-সওয়া হয়ে গেছে। আজ দেখছি একই ঘটনা ১৫ নাম্বারে।

    আমি বাঙালী ভাইটিকে একটু আস্তে কথা বলার জন্য অনুরোধ করার কথা ভাবছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত তা আর করা হয়নি। হঠ্যাৎ দেখি আমার ঠিক সামনের সারিতে বসা আঠারো-উনিশের এক বাঙালী তরুন তাকে আস্তে কথা বলার অনুরোধ জানিয়ে ব্যর্থ হলো। উচ্চস্বরের বিরক্তিকর এই পূর্ণ-দৈর্ঘ্য বাংলা ফোনালাপ থেকে মুক্তিরও কোন উপায় নেই ধরে নিয়ে হাতে থাকা পত্রিকার পাতায় মনোনিবেশের চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ শুনি সজোরে চড়ের শব্দ। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি ফোনকারী যুবকটি তার পাশের আসনে বসা অল্প বয়স্ক ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করছে, “ আফনে আমারে চড় দিলেন কেরে?”। অল্প বয়স্ক ছেলেটি বেশ উত্তেজিত হয়ে বলছে, “ আপনারে বার বার মানা করলেও আপনে ফোনে আওয়াজ করে কথা বলছেন। বাসে তো আপনি একা না, আরো লোকজন আছে।’’ এরপর যথারীতি তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি।

    কথা কাটাকাটির মধ্যেই চড় খাওয়া বাঙালী পুলিশ কল করে। বাক-বিতন্ডা চরম আকার ধারন করাতে আমি তাদের শান্ত হতে বলি। কিন্তু কে শুনে কার কথা। আশেপাশের যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে তাদেরকে বাস থেকে নেমে ঝগড়া করতে বলে। অবস্থা বেগতিক দেখে মনুমেন্ট স্টেশনের আগের স্টপে আমি তাদের সাথে বাস থেকে নেমে পুলিশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুলিশ হাজির। অল্প বয়স্ক ছেলেটিকে তখন বেশ শান্ত মনে হলো। পুলিশের উপস্থিতিতে তাকে একদম বিচলিত মনে হয় নি। পুলিশ দুজনকে আলাদা করে তাদের বক্তব্য শুনে নেয়। অল্প বয়স্ক ছেলেটির জন্য আমার একটু খারাপ লাগছিলো। আমি যদ্দুর জানি ইংল্যান্ডে কাউকে শারীরিক আঘাত গুরুতর অন্যায়।
     
    পুলিশ ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করছিলো, “তুমি কি জান তুমি অন্যায় করেছো?” ছেলেটি খুব শান্ত ভাবে বললো “হ্যাঁ, আমি জানি আমি অন্যায় করেছি”। পুলিশ তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি জেনেশুনে অন্যায় করতে গেলে কেন?” ছেলেটি বলে, “এই লোকটার উচ্চস্বরে ফোনালাপে আমি খুব বিরক্ত হচ্ছিলাম। আস্তে কথা বলার অনুরোধ করলেও সে তা শুনেনি। শেষে আমি রাগ নিয়ন্ত্রন করতে পারিনি।”  পুলিশ তাদের দুজনের ডিটেইলস নিয়ে পরবর্তীতে পুলিশ স্টেশনে যোগাযোগ করতে বলে। অল্প বয়স্ক ছেলেটের নির্লিপ্ততা দেখে আমি একটু অবাক হই। জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি ওকে চড় দিতে গেলে কেন?” ছেলেটি বলে,  “ ভাই, সহ্যের সীমা আছে। রাগ কন্ট্রোল করতে পারিনি।” লন্ডনের বাসে প্রায়-সময় অনেক বাঙালী ভাইদের উচ্চস্বরে ফোনালাপ করতে শুনি। খুব বিরক্ত হই। কিন্তু কিছু বলার সাহস পাইনা। এই ছেলেটি দেখি অন্যরকম।

    ১৪/০৮/১০

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন