• মলাটে সংস্কৃতি, ভেতরেও সংস্কৃতি
    জব্বার হোসেন

    ফজলুল আলমের সংস্কৃতি সমগ্র
    ঢাকা: অনন্যা, পহেলা বৈশাখ ১৪১৭
    ৬০৯ পৃষ্ঠা, পরিভাষা, গ্রন্থপঞ্জী, নির্ঘন্ট। মূল্য ৬০০টাকা
    আইএসবিএন: ৯৮৪ ৭০১০৫ ০২৭৫ ৬


    শিরোনামাই বলে দিচ্ছে যে বইটির বিষয় ‘সংস্কৃতি’র আদ্যোপান্ত নয়, এটা এই বিষয়ে লেখকের গ্রন্থাবলীর একটা অখণ্ড ও পরিমার্জিত সংস্করণ। এই নামকরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এই কারণে সংস্কৃতির মতো একটা বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে বিস্তৃত ও সুগভীর বিষযের সমগ্র হয় না। শুধু ‘সংস্কৃতি’ শিরোনামের বই এককভাবে খুব একটা নেই, অন্য প্রত্যয়কে জড়িয়ে বেশ কিছু গ্রন্থ ও রচনাসম্ভার আছে। বঙ্গের পাঠাগারগুলো ও বই বিপণনীতে সেসব থাকার কথা, কিন্তু খুঁজে পাওয়ার সমস্যাও আছে। আরো একটা সমস্যা যে মলাটে ‘সংস্কৃতি’ শব্দ বা প্রত্যয়টি থাকার অর্থ এই না যে পুরো বইটি এই বিষয়ে, অনেক সময়ে একটিমাত্র ‘সংস্কৃতি’ নামের রচনার ভিত্তিতে কিছু প্রবন্ধ সংগ্রহ বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আবার অনেক গ্রন্থে মনে হয় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি শিরোনামের জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে, অনেকে শুধু বিনোদনকে ‘সংস্কৃতি’ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেণ। সে-সবের প্রেক্ষিতে ফজলুল আলমের ‘সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রকাশিত চারটি গ্রন্থকে (সংস্কৃতির সত্যমিথ্যা ২০০৭, সভ্যতার দুর্গে সংস্কৃতির করাঘাত ২০০৮, সংস্কৃতির স্বরূপ ও বাঙালি মনন ২০০৯, সংস্কৃতির নব্য রূপরেখায় সমকাল ২০০৯) ব্যতিক্রমী বলে অভিহিত করা যায়। অনন্যা প্রকাশক প্রথম তিনটি ও শেষ গ্রন্থের কয়েকটি মৌলিক রচনা নিয়ে ফজলুল আলমের সংস্কৃতি সমগ্র প্রকাশ করলেন এ- বছর।

     

    Cover page - Songskriti Somogro

    স্বাভাবিকভাবেই চারটি গ্রন্থের অখণ্ড সংস্করণে বক্তব্য, দৃষ্টান্ত ও তত্ত্বে কিছু পুনরাবৃত্তি থাকবেই, তবে তাত্ত্বিক বিষযে লেখক যে নতুনতর জ্ঞান আহরণ ও তথ্য সংগ্রহ করে ২০০৭ থেকে ২০১০ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছেন তা সন্তোষজনক। সচরাচর একই বিষয়ে একই লেখকের শুরুর ও পরবর্তী গ্রন্থের মধ্যে কোনও চলমানতা-ভিত্তিক উন্নতি হয় না, এ ক্ষেত্রে লেখকের ব্যতিক্রম প্রশংসার দাবিদার। এটা পরিষ্কার হয় তৃতীয় গ্রন্থ সংস্কৃতির স্বরূপ ও বাঙালি মনন থেকে। পূর্বের দুটো গ্রন্থে লেখক বাংলায় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির আমদানী নিয়ে যা লিখেছেন তা এখানে এসে আরও বিশদ হয়েছে। আমার ধারণায় এই তৃতীয় গ্রন্থটির উদ্দেশ্য ও উপস্থাপনা ব্যতিক্রমী। এই গ্রন্থে লেখক প্রতিষ্ঠিত কিছু ধারণাকে প্রশ্ন করে দেখিয়েছেন যে ইতিহাসে অনেক তথ্য অ-প্রমাণিত হলেও সে-সবে অনেকে বিশ্বাস করছে, যেমন জগৎশেঠের মুসলমান বিদ্বেষের কোনও প্রমাণ কোথাও নাই। লেখক উদাহরণ দিয়েছেন বারো ভূঁইয়াদের প্রাপ্ত ৩৫ নামের মধ্যে ১৯জনই মুসলমান ছিলেন। (পৃ৪২৯-৩০)। একই অধ্যায়ে বঙ্গের পূর্বাঞ্চল থেকে ইংরেজি শিক্ষার জন্য মুসলমান ছাত্রদের দলে দলে যোগদান না করার কারণ (মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য) তিনি প্রমাণের অভাবে ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছেন।

    বিশ্বে উচ্চশিক্ষাঙ্গনে সংস্কৃতি অধ্যয়ন (ইংরেজিতে কালচারাল স্টাডিজ) শুরু হয় ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৩ সনে। যদিও প্রস্তুতি পর্বের পর পালে হাওয়া পেতে আরো কয়েক বছর লেগে যায়। এই গ্রন্থের শুরুতে (পৃ৩০-৩৪) এই প্রতিষ্ঠানপ্রদত্ত শিক্ষা ও গবেষণার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। অনেকে মনে করতে পারেন যে সংস্কৃতি ও সংস্কৃতি-সচেতনতা বুঝি সেখানেই শুরু হয়েছে। সেটাও যে আমাদের মস্ত বড় ভ্রান্তি। লেখক নীহাররঞ্জন রায়ের অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে বাঙালির সংস্কৃতি সচেতনতা ইংল্যান্ডের অনেক আগে, প্রায় দেড় যুগ আগেই প্রতিষ্ঠিত ছিল (পৃ৪০৮, ৪৪৬, ৪৬৬)। অনেকেই জানেন সংস্কৃতি বিষয়ে নীহাররঞ্জন রায় ও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় নির্ভরযোগ্য বক্তব্য রেখেছেন, কিন্তু সে-সবের বিশ্লেষণের একটা নতুন দিক উন্মোচন করলেন বর্তমান লেখক। অতীতে মনে করা হতো  ‘সংস্কৃতি’ ও ‘সভ্যতা’ একে অপরের সম্পূরক, ফলে ‘সংস্কৃতি’কে হতে হবে মার্জিত, পরিশীলিত, উচ্চমানের জীবনযাত্রা ও উচ্চশ্রেণীর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দাবিদার। ব্রিটেনে ‘সংস্কৃতি’র এই সনাতন ধারণা বর্জন করার একাডেমিক আন্দোলন শুরু হয়েছে মাত্র ১৯৬০ দশকের প্রথম সিকিভাগে, কিন্তু তারাই সেটা প্রথম ভেবেছে এই দাবি করলেও বঙ্গে তাদের তথাকথিত ‘নতুন’ ধারণার উপলব্ধি ঘটেছিল পূর্বেই। ফজলুল আলম এই উপলব্ধিকে যথার্থই ‘সংস্কৃতি সচেতনতা’ বলে অভিহিত করে সাক্ষ্যপ্রমাণসহ তথ্য হাজির করেছেন এই গ্রন্থে (পৃ.৪২৪)। এদিক দিয়ে লেখক উত্তর-ঔপনিবেশিকতার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।

    পৃ৪৫২ থেকে ৪৮৭ পর্যন্ত তিনি একে একে ইতিহাসে, চিন্তাচর্চা, ধর্মে ও সাহিত্যে বাঙালির সংস্কৃতি সচেতনতার প্রমাণ দিয়েছেন।

    সংগ্রহটি কাটাছেঁড়া করলে প্রতীয়মান হবে এতে মৌলিক ও অমৌলিক দুই ধরনের রচনা আছে। সাধারণত অমৌলিক বিষয় নিয়ে অধিকাংশ লেখালেখি বিদ্যালয়/বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশে দাখিল করা রচনার সমগোত্র হয়ে ওঠে। সুখের কথা ফজলুল আলমের কোনো অ-মৌলিক রচনাই সে-ধরনের রূপ ধারণ করে নাই; বোঝা যায় যে, লেখক বিষয়গুলো আত্মজ করে নিয়েই লিখতে বসেছেন। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে কয়েকটি অনুবাদ প্রবন্ধের অন্তর্ভুক্তিকরণে। মিশেল ফুকো, রোলা বার্থ, এবং নোয়াম চমস্কির তিনটি অতি সম্পৃক্ত বিষয়ে প্রবন্ধের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ হাজির করেছেন লেখক। তিনটাই তাঁর অনুবাদ। অপরপক্ষে ‘ক্রিটিকেল থিয়োরি’ প্রবন্ধে এই তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা হর্কহেইমার ও অ্যাডর্নোর কোনও অনুবাদ না এনে তত্ত্বটির প্রধান প্রধান বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। আমার ধারণায় হর্কহেইমার ও অ্যাডর্নোর এমন একটা বিশেষ রচনা নেই যে একটা থেকে তাঁদের তত্ত্বের পরিচয় বিশদভাবে পাওয়া যাবে। সেজন্যই লেখক সারাংশকরণের পন্থা অনুসরণ করেছেন। তবে এই সংক্ষিপ্তকরণের জন্যই ৮৪ – ৮৬ পৃষ্ঠায় ‘সংস্কৃতি-বাণিজ্য ও ক্রিটিকেল থিয়োরি’ অনুচ্ছেদটি পড়ে আরও কিছু না জানতে পারার অতৃপ্তি থেকে যায়। তবে সূচি ও নির্ঘণ্ট অনুসরণ করে ৫৪২পৃষ্ঠায় শুরু ‘সংস্কৃতি ও পণ্য’ শিরোনোমের প্রবন্ধটি কিছুটা ক্ষুধা মিটালো। তারপরেও আমি মনে করি এই বিষয়টা নিয়েই একটা পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ বঙ্গের পাঠক ও সুধীজনের জন্য প্রয়োজন।

    এই সংগ্রহের তৃতীয় গ্রন্থটি (পৃ ৪০৫-৫৫২) মৌলিকতার দাবিদার। মনে হয় ২০০৭ সনে সংস্কৃতির সত্যমিথ্যা প্রকাশ করার পর লেখক ক্রমাগত বিষয়টি নাড়াচাড়া করে এবং আরও গবেষণা করে যা পেয়েছেন তার প্রকাশ এই গ্রন্থে দেখা যায়। বঙ্গের সংস্কৃতি-সচেতনতা এতটি নতুন বিষয়, এটাকে প্রমাণিত করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর উপস্থিতির উদাহরণ দিয়ে লেখক ফজলুল আলম আমাদের সমালোচনা সাহিত্যে একটা নতুন দিক দর্শন করালেন বলা যেতে পারে।

    নতুন রচনা অংশে (২০০৯-২০১০এ রচিত) মাত্র চারটিমাত্র রচনা স্থান পেয়েছে, যথাক্রমে ‘সংস্কৃতির নতুন ব্যাখ্যা কী ও কেন’, 'লেখকের সংস্কৃতিতে সমাজতন্ত্র’, ‘সমসাময়িক মননে সভ্যতা’ ও ‘সমাজ পরিবর্তনে সংস্কৃতির উপর কতটা ভরসা করা যায়’। এই চারটিই যেন পুরো গ্রন্থটির ভাবনা ক্ষুদ্রাতিকারে নিয়ে এসেছে।

    লেখকের নিজস্ব স্বীকৃতিমতে প্রথম প্রকাশের অনেক ধরনের ভুলভ্রান্তি এই পরিমার্জিত সংস্করণে শুদ্ধ করা হয়েছে, তার পরেও কিছু বানান ভুল ও বাক্যবিন্যাসে অসংলগ্নতা নজরে এসেছে, কিন্তু বিষয়ের আকর্ষণে ও চমৎকারিত্বে সেসব ভুলে যাওয়া যায়। বইটির বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা যায় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি শিরোনামে ব্যবহৃত হওয়া একটি বই পাওয়া গেল যার মলাট ও ভেতর বক্তব্য সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাঠকের সুবিধার জন্য বিস্তৃত সূচি, পরিভাষা, নির্ঘণ্ট ইত্যাদি যথাযথভাবে দেওয়া হয়েছে। সে কারনে একজন পাঠক যে কোনো স্থান থেকে পড়া শুরু করতে পারেন, তবে ভূমিকা শুরুতে পড়ে নেওয়া যেতে পারে। অখণ্ড সংস্করণে কিছু পাদটীকা দেয়া যেতো, তবে সেটা গ্রন্থটিকে জবরজঙ করে ফেলার ঝুঁকিতেও ফেলতো। এটা বলা যায় বইটি পাঠ্যক্রম-প্রত্যাশী না হয়েও অত্যন্ত শিক্ষায়তনিক। একই সঙ্গে এটাও বলা যায় যে সাধারণ পাঠকের জন্য রচিত এই গ্রন্থটি সর্বস্তরে গৃহীত হতে কোন বাধা নেই, সময়ে সময়ে বেছে বেছে পড়ার জন্য, রেফারেন্স বই হিসেবে, এমনকি উপহার হিসেবেও।   

    গ্রন্থটির ছাপা সুদৃশ্য, বাঁধাই আরো উন্নত হতে পারতো, তবে বুকমার্কের ফিতাটির রঙ পর্যন্ত কাভার শিল্পের সাথে মিলিয়ে দিয়ে সে দোষ কাটিয়ে উঠেছে। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী কাভার আঁকাননি, লিখেছেন - রঙের অপরূপ বিন্যাস ও তুলির টানে বিষয়টি ধর্তব্যের মধ্যে নিয়ে এসে ফুটিয়ে তুলেছেন।                             

    জব্বার হোসেন
    jabberhossain@gmail.com

    ১/৭/১০

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন