• মৌরিনের জন্য একটু মমতা
    প্রিসিলা রাজ

     শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজে উঠতে পেরেছে মৌরিন। ও যাবে ভারতের মাদ্রাজে। মাদ্রাজের ভেলোরে সিএমসি হাসপাতালে ওর চিকিৎসা হবে। বাংলাদেশের শিশু হাসপাতালের ডাক্তাররা জানিয়েছেন তার অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হয়েছে। রক্তের ক্যান্সারের মতোই জটিল এই অসুখে অস্থিমজ্জা বদলানো ছাড়া এখনও কোনো চিকিৎসা বের হয়নি। সাধারণ হিসাবে এ চিকিৎসায় তিরিশ লাখ টাকার ওপর ব্যয় হয়। বাংলাদেশে এখনও অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসা সেভাবে শুরু হয়নি। তাই সবচেয়ে কাছে সবচেয়ে কম ব্যয়ে চিকিৎসার জন্য ওকে ভারতে নিয়েছেন ওর অভিভাবক আর শুভানুধ্যায়ীরা।

    মৌরিনের রক্তের জটিল অসুখ ধরা পড়ে সেই চার মাস বয়সে। ডাক্তাররা সেসময় জানিয়েছিলেন তার থ্যালাসেমিয়া হয়েছে। এ রোগে রোগী রক্ত বদলে এভাবেই বেঁচে থাকে, পড়াশুনা করে এবং যতদিন বেঁচে থাকে মোটামুটি একটা স্বাভাবিক জীবন যাপন করে যেতে পারে। সেই চার মাস বয়স থেকেই মৌরিনকে তিন-চার মাস অন্তর রক্ত দেওয়া শুরু হয়। এ অবস্থা চলে তার মোটামুটি পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত। তারপর থেকে প্রায় বছর চারেক সে আপাত দৃষ্টিতে সুস্থই ছিল, রক্ত বদলাতে হতো না। হঠাৎ করেই কয়েক মাস হলো সে আবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হয়েছে বলে মত দেন। 

    মৌরিনের বাবা মো. মুজিবর রহমান জনতা ব্যাংক থেকে অবসর নিয়েছেন কিছুদিন হলো। স্ত্রী, দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তাঁর মধ্যবিত্ত সংসার। মুজিবর রহমান মেয়ে জন্মের পর কষ্ট করে হলেও চিকিৎসা চালিয়ে গিয়েছেন। হাত পাততে হয়নি কারো কাছে। কিন্তু অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হয়েছে জানার পর তাঁর মাথায় বাজ পড়েছে। এত টাকা কোথায় পাবেন তিনি? টাকার পরিমাণ তিনি বা তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাধ্যের সীমার বহু, বহু দূরে। ফলে সঙ্কোচ কাটাতে হয়েছে তাঁকে, হাত পেতেছেন সমাজের কাছে। নিয়তির এই ভয়াবহ পরিহাসের মধ্যেও মৌরিনের ভাগ্যটা একটু হলেও ভাল। তার আত্মীয়দের মধ্যে কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী আছে যাঁরা প্রাণপাত করছেন তার চিকিৎসার জন্য। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে দৌড়ানো, পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে ধরে পেপার-পত্রিকায় আবেদন জানানো সবই করছেন তাঁরা। মৌরিনের জন্য একটা ওয়েবসাইটও খুলেছেন যার ঠিকানা: www.givemenewlife.org

    অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে এ পর্যন্ত মৌরিনের জন্য ১১ লাখ টাকা যোগাড় হয়েছে। তাই নিয়েই ওকে নিয়ে রওনা করেছেন মুজিবর রহমান। ডাক্তাররা বারবারই তাগাদা দিচ্ছেন কোনোভাবেই দেরি করা যাবে না, এক দিন দেরী হওয়ার অর্থ মেয়ের কাছ থেকে জীবনের বেশ খানিকটা দূরে সরে যাওয়া। মৌরিনের এক ভাই এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। এস.এস.সি পরীক্ষায় অল্পের জন্য গোল্ডেন জিপিএ না পাওয়া এই ভাইটি এবার কোমর বেঁধে পড়াশুনা করছিল সেই বাধা এবার পেরোবে বলে। আর ঠিক তখনই ছোট্ট বোনটার এই সংবাদ। তারপরও সে এইচএসসি পরীক্ষা এবার শেষ করেছে। এরই মধ্যে বিপদের ওপর বিপদ। এইচএসসি পড়ুয়া ছোট ভাইটা ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে দুই হাতই ভেঙেছে। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করার পরও তাকে বাসায় নিয়ে আসতে হয়েছে মৌরিনের চিকিৎসার অসুবিধা হচ্ছিল বলে। মেয়ের সেবা নাকি টাকা যোগাড় করা, নাকি ছেলের জন্য হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি নাকি বড় ছেলের পরীক্ষার প্রস্তুতি - কোনটা করবেন এই প্রৌঢ় স্বামী-স্ত্রী? 
    ঈশ্বরে যাদের অটুট বিশ্বাস তারা বলে এসব তাঁরই পরীক্ষা। যাদের ঈশ্বরে আস্থা নেই, তাদের কাছে প্রকৃতি বড় নির্মম, তার স্থান-কাল-পাত্র কোনো জ্ঞানই নেই। কিন্তু বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, কিংবা বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনোটাই যার নেই - তারা সকলেই অর্থাৎ এই আমরা সকলেই মানুষ। আমরা জানি, মানুষ আছে, মানুষ সত্যি। মানুষ হাত বাড়ালে প্রকৃতির অনেক নিষ্ঠুরতার রূপ বদলে যায়, সৃষ্টিকর্তার অনেক পরীক্ষা মানুষ সহজে পাশ করে যায়।

    মুজিবর রহমান মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর সিলেটে অংশ নিয়েছেন। জীবনের রণেও সহজে ভঙ্গ দেবেন না তিনি। কিন্তু সেই যুদ্ধে তিনি জয়ী হবেন কিনা তা নির্ভর করছে তাঁর সহযোদ্ধা অর্থাৎ আমরা তাঁর দিকে কতটা হাত বাড়াব তারই ওপর। তৃতীয় শ্রেণী পড়ুয়া মৌরিন গল্পের বইয়ের পোকা। ভাবি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ও কি প্রিয় কোনো গল্পের স্মৃতিতে ডুবে যায় নাকি শূন্য দৃষ্টিতে অনন্তের সঙ্কেত শোনে? ওর গোল গোল মায়াবি চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছা করে - মৌরিন, তোমার অনন্তের ডাক শোনার সময় হয়নি এখনও। শিগগিরি তুমি  নতুন কোনো বইয়ের গন্ধ আবারও প্রাণভরে নেবে। আমরা সকলে আছি তোমার সঙ্গে।

    ২৩/০৫/১০ 

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন