• নাড়ীর টানে বাংলাদেশে
    লিখেছেন: 
    বিশ্বজ্যোতি পুরকায়স্থ (পাপ্পু)

    [কিস্তি ১]

    বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। একান্ত নাড়ীর টানে। গিয়েছিলাম সিলেট। সেখানেই ছিল আমাদের পূর্ব-পুরুষদের বসবাস। আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট আমার আগেই করা ছিল। ভিসা পেতে অসুবিধা হয়নি। উল্লেখ্য, আমার বাবার মাতুল বংশের সবাই আজও বাংলাদেশে আছেন। মানে-সম্মানে এবং রীতিমত দাপটে। করিমগঞ্জ থেকে জকিজঞ্জ হয়ে সিলেট চলে যাই বিরতিহীন বাসে আমার বাবার মামাতো বোন পূর্ণা পিসির বাড়ীতে। ভারতীয় সময় সন্ধ্যা ছ'টায় পৌঁছাই। পূর্ণা পিসিকে আগে কখনও দেখিনি। তিনিও দেখেননি আমাকে। কিন্তু রক্তের টানে পূর্ণা পিসির আদরে আবেগে অভিভূত হলাম। সিলেট শহরে তালতলার এক ছ'তলা ফ্ল্যাটবাড়ীতে তিন তলায় ভাড়া থাকেন পূর্ণা পিসির পরিবার।

    এই সিলেট শহরের সঙ্গে আমার পূর্ব্ পুরুষদের একটা নাড়ীর টান ছিল। আমার পিতামহ বিপুল বিহারী পুরকায়স্থ এই সিলেট শহরেরই মুরারীচাঁদ কলেজ থেকে আই. এ. পাশ করেছিলেন ১৯১২ সালে। ১৯৩৫ সাল থেকে বেশ কয়েক বছর আমার দাদু সিলেটের দি.এফ.ও. অফিসে বড়বাবুও ছিলেন। তখন বাবার দুই জ্যাঠতুতো ভাই দাদুর বাসায় থেকে মুরারীচাঁদ কলেজে পড়তেন। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় সিনেমা আবিষ্কার হয়। প্রথম নির্বাক এবং পরে সবাক। প্রমথেশ বড়ুয়ার বহু প্রশংসিত 'দেবদাস' ১৯৩৫ সালে মুক্তি পায় এবং আমার দাদু ও ঠাকুমা ঐ ছবি দেখেছিলেন সিলেটের কোন এক সিনেমা হলে। গল্প শুনেছিলাম অনেক। স্বচক্ষে দেখে মুগ্ধ হলাম। মুরারীচাঁদ কলেজ দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। ১২৪ একর জমির ওপর সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে সেই ঐতিহ্যশালী মহাবিদ্যালয়। আমার পিতামহ এখানে ছাত্রাবাসে থেকে এই কলেজেই পড়তেন আজ থেকে ঠিক এক শতাব্দী আগে। আমি পুলকিত হয়েছিলাম কথাটা ভেবে। ১৯৩৫ সালে আমার দাদু যে ফরেস্ট অফিসের বড়বাবু ছিলেন, গিয়েছিলাম সেখানেও। পরিচয় দিতেই বসতে বললেন বর্তমান বড়বাবু। চা-ও খাওয়ালেন আমাদের পরিবাবের খোঁজ-খবর নিলেন। তাঁর আন্তরিকতা হৃদয়স্পর্শী। ঐ অফিসের কাছেই সুরমা নদী। তীরে দাঁড়িয়েছিলাম কিছুক্ষণ। ধীরে প্রবাহিত স্রোতস্বিনী। অনেক ঐতিহাসিক উত্থান পতনের নীরব সাক্ষী। মনে হয়েছিল আমার দাদুও বোধহয় এ নদীর পারে দাঁড়াতেন। ভাবতেন অনেক কিছু। শাহজালালের দরগায় গিয়েছি। দেখেছি অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন।

    সিলেটে তিন দিন থেকে চলে গিয়েছিলাম বড়লেখায়। আমার বাবার মাতুলালয়ও সেখানে। পূর্ণা পিসি ফোন করে বাবার মামাতুতো ভাই ভোলা জ্যাঠুকে বলে রেখেছিলেন। বড়লেখা বাজারে বাস স্ট্যান্ডে নেমেই দেখি ভোলা জ্যাঠু অপেক্ষা করছেন আমার জন্য। সেখান থেকে রিক্সায় চলে গেলাম আমার বাবার মাতুলালয়ে। দু'শ বছরের প্রাচীন দালান বাড়ী। বড়লেখা উপজেলার প্রাচীনতম অট্টালিকা। দুর্গা মন্ডপের ভগ্নদশা মর্মান্তিক। বাবার মাতামহ রামকুমার রায় পুরকায়স্থ বড় জমিদার ছিলেন। যেমন প্রতাপ ছিল তেমনি তাঁর অবদানও ছিল স্থানীয় উন্নয়নে। এ বাড়ীর দোল দুর্গোৎসব - বারো মাসে তের পার্বণ আজ শুধুই ইতিহাস। বড়লেখার পাথারিয়া ছোটলেখা হাইস্কুলের জমি দান করেছিলেন তিনি। সেই জমিতে ঘরও তৈরী করে দিয়েছিলেন। এমনকি ছাত্র-শিখকদের জন্য অতিথিশালাও করেছিলেন নিজের বাড়ীতে। বিনা খরচায় তাঁদের আহার আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছাড়াও তাদের পারিশ্রমিকও নিজেই দিতেন। অথচ অত্যন্ত প্রচার বিমুখ ছিলেন। কোথাও নিজের নাম জুড়ে দেননি। বড়লেখার মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে রাম কুমার বাবুকে স্মরণ করেন বলে শুনেছি। যে ঘরখানা ঐ হাইস্কুলে তিনি তৈরী করে দিয়েছিলেন সেটা আজও সুরক্ষিত আছে। ওটা ভেঙ্গে পুণনির্মান করা হয়নি। যেভাবে ছিল সেভাবেই সেটাকে রাখা হয়েছে - রাম বাবুর স্মৃতি রক্ষার্থে। শুধু প্রয়োজনীয় মেরামতি করা হয়েছে মাঝে-মধ্যে। রাম কুমার বাবু এক সময় আইন ব্যবসা করতেন করিমগঞ্জে। পরে জমিদারী পরিচালনা করতে বাড়ীতে চলে যান। কাঠের ব্যবসাও করেছিলেন একসময়ে। ত্রিপুরা থেকে কাঠ আনা হত। সে যুগে উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন বলে ত্রিপুরার রাজা তাঁকে খুব সমাদর করতেন। ত্রিপুরার রাজাকে একটা হাতীও উপহার দিয়েছিলেন, যে হাতীটা তাঁর খুব প্রিয় ছিল। রাম কুমার বাবুর বড় ছেলে রাজেন্দ্র বাবু শৈশবে ঐ হাতীর ওপর থেকে পড়ে গিয়েছিলেন হাতীর পায়ের ঠিক সামনে। হাতীর পদপিষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাতীটি তিন পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে একটি পা শূণ্যে তুলে রেহে বাঁচিয়েছিল মালিকের পুত্রকে। কথাটা জানতে পেরেছিলাম বাবার মামাতুতো ভাউ মঞ্জু জ্যাঠুর কাছ থেকে। মঞ্জু জ্যাঠুর বড়ভাই রাধাকান্ত রায় ঢাকায় থাকলেও মাঝে-মাঝে গ্রামের বাড়ীতে আসেন। বুদ্ধিজীবী, চিন্তাশীল সমালোচক এবং একজন লেখক।

    রঞ্জু জ্যাঠু আমার বাবার জন্য একখানা বই উপহার দিয়েছিলেন। বই খানার নাম 'বড়লেখা - অতীত ও বর্তমান'। বড়লেখার অনেক জ্ঞানীগুনী পন্ডিত ব্যাক্তিদের লেখা রয়েছে বইখানাতে। সংকলিক রচনা সমূহকে 'ইতিহাস ও ঐতিহ্য', 'স্মৃতিচারণ' এবং 'তত্থ্য সম্ভার' এই তিনটি ভাগে সজ্জিত করা হয়েছে। অবাক হয়েছিলাম একটা কথা জেনে। বড়লেখায় বদলি হয়ে এসেছিলেন একজন পুলিস আধিকারিক যিনি বড়লেখা থানার কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই বইখানা রচিত হয়েছিল। পুলিসের সাহিত্য চর্চা বা ইতিহাস চিন্তা নিতান্ত অকল্পনীয় না হলেও অত্যন্ত বিরল ব্যাপার। মনে আছে কোলকাতার একটি বাংলা চ্যানেল এ একজন পুলিস আধিকারিক তাঁর স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন। আর কখনও দেখিনি সেরকম অনুষ্ঠান।

    বড়লেখা থানার নির্বাহী কর্মকর্তা এম. এইচ. ফরহাদ খান 'বড়লেখা - অতীত ও বর্তমান' বইখানার সংকলক। তাঁর 'সংকলকের বক্তব্য' থেকে নিম্নাংশটি ঊদ্ধৃত -

    সংকলকের বক্তব্য

    চা বাগান আর পাহাড় ঘেরা ছোট্ট
    বনাঞ্চল
    মাধবকুন্ডে বইছে যেন প্রিয়ার চোখের
    জল।
    জলে ভরা হাকালুকি লক্ষ কোটি মাছ
    পাথারিয়া সেগুন বাগান, আতর সাগর গাছ।
    ফুল পাখি আর ফসলে ঘেরা হাজার
    পাতাকুঁড়ি
    খাসিয়াদের পান সুপারি, নৃত্যে
    মণিপুরী।
    এসব হবে দেখা
    এলে বড়লেখা।

    ফরহাদ খান আরো লিখেছেন, বড়লেখা থানার নির্বাহী অফিসার হিসাবে যোগাদানের পর আমি এ এলাকার মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা পেয়েছি। চা বাগান, পাহাড়, হাওড়, বিল, মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং মণিপুরী ও খাসীয়া সম্প্রদায়ের জীবন বৈচিত্র আমাকে মুগ্ধ করেছে। সত্যি কথা বলতে কি, এখানে বদলির আদেশ পেয়ে মনে মনে অখুশি হয়েছিলাম। কিন্তু যোগদানের পর এখানকার নৈসর্গিক দৃশ্য, মানুষের আন্তরিক ভালোবাসা আমাকে বেঁধে ফেলেছে। এখানে এসে এ এলাকা সম্পর্কে জানবার চেষ্টা করেছি। জেনেছি দেখে ও শুনে। বড়লেখার উপর পূর্নাঙ্গ কোন প্রকাশনা ছিল না। এ তাগিদ থেকেই 'বড়লেখা - অতীত ও বর্তমান' নামক গ্রন্থের উদ্যোগ নেই। বড়লেখার সুধীজনের কাছে লেখা আহবান করি এবং তাঁদের লেখা নিয়েই যাত্রা শুরু হয়। এতে আমার কোন কৃতিত্ব নেই, কৃতিত্ব সবটুকুই বড়লেখার সুধীজনের - লেখকবৃন্দের। এতে যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। লেখাগুলো সম্পর্কে আমার নিজের কোন মন্তব্য নেই। তবে অনেকেই ভালো লিখেছেন। লেখকবৃন্দ তাঁদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা থেকে লিখেছেন। আমি সরকারী কর্মকর্তা। কাজের ফাঁকে-ফাঁকে লেখাগুলো সংগ্রহ ও সামান্য সম্পাদনা করেছি। সামগ্রিকভাবে বড়লেখার উপর এটিই প্রথম প্রকাশনা। তাই ভুল ত্রুটি থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বইটির কোন লেখা বা অংশবিশেষ যদি কারো মনঃপুত না হয়ে থাকে বা কোন ভুল ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় তবে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করব। আমার সকল অপারগতার জন্যক্ষমা চাইছি।"

    [ চলবে ]


    আরও পড়ুন  কিস্তি ২ ও  কিস্তি ৩


    ০৩/০৫/১০
    শিলচর থেকে বিশ্বজ্যোতি পুরকায়স্থ (পাপ্পু)

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন