• নাড়ীর টানে বাংলাদেশে-৩
    লিখেছেন: 
    বিশ্বজ্যোতি পুরকায়স্থ (পাপ্পু)

    প্রতিধ্বনিত এই নিঝুম শব্দস্রোত কর্ণবিদারী হয়ে ওঠে। অসহ্য। আমি উপরের দিকে তাকাই। জমাট অন্ধকারে কিছুই দৃষ্ট হয় না। খাসিয়া পুঞ্জির আলোর ফুলকিতে পরিবেশ আরো ভৌতিক হয়ে ওঠে। প্রকৃতির উপর বলাৎকাররত কারা এই লম্পট? করাতকল, ইট ভাঁটার মালিকদের লোক? না, সরাসরি তারা কেউ নয়। এ হলো ঘনীভূত লোভের লোলজিহবা। এই জিহবা টেনে ধরার মতো সাহস আমার নেই। অসহায় আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। খটখট আওয়াজ ক্রমে কফিনে পেরেক ঠোকার শব্দের মতো ভয়হংকর হয়ে ওঠে। এ কার কফিন? সম্ভবত আমাদের স্কুলের, গোটা মানবজাতি্র।”  [বড়লেখাঃ অতীত ও বর্তমান, পৃষ্ঠা ১৫৬]

    বেশ কয়েক বছর আগে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর কন্যা ডঃ অনিতা বোস পাফ সুদূর জার্মানী থেকে সপরিবারে কোলকাতায় এসেছিলেন নেতাজীর এলগিন রোডের বাড়ীতে। শুধু তাঁর পিতার স্মৃতি বিজড়িত বাড়ীটি এবং তাঁর রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের আকর্ষণে। আমার বড়লেখায় আসাটাও যেন ঠিক সেরকমই। শুধু একটা নাড়ীর টানে। ভাবলাম যদি দেশ বিভাগ না হত, যদি ছেচল্লিশে দাঙ্গা না হত তা’হলে হয়ত আমি এই বড়লেখাতেই জন্মাতাম। এখানেই বড় হতাম, পড়াশুনা করতাম। এই অঞ্চলটিই হত, আমার শৈশবের শিশু শয্যা, যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারানসী।

    লক্ষ্য করলাম, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিন্দুরা বেশ উদাসীন। পাকিস্তানের সরকার হিন্দু বিদ্বেষকে উৎসাহ দিত, হিন্দুদের সম্পত্তি জবরদখল, হিন্দুদের ওপর অত্যচার ইত্যাদি তাদের বাধ্য করেছিল ঐদেশ ছেড়ে বিপুল সংখ্যায় ভারতে আসতে। পাকিস্তান ছিলো জিন্নাহ সাহেবের সৃষ্ট মুসলমানদের দেশ। তাই পাকিস্তান তার কায়েমী স্বার্থে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে রাখত সব সময়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর হিন্দুরা ভেবে ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে তাদের অবস্থা সুরক্ষিত হবে। কিন্তু বছর কয়েকের মাথায় ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক বঙ্গবন্ধু নিহত হলেন সপরিবারে। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার যে কোন রকম শক্ত ভিত নেই, সেটা যে খুবই নড়বড়ে সে-দেশের রাজনৈতিক উত্থান পতন তারই স্বাক্ষী। এদিকে আরেকটি কথা বাংলাদেশে অনেকে বললেন, যে কথাটা শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম - সেটা হচ্ছে দিল্লী নাকি চায়না বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ধর্র্মনিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতায় থাকুক। কারন বাংলাদেশে মৌলবাদীরা যতই সক্রিয় থাকবে ততই হিন্দু বাঙালী এবং মুসলমান বাঙালীদের মধ্যে অনৈক্য এবং বিভেদ থাকবে, যেটা ভারতের জন্য খুবই জরুরী। প্রয়াত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর গোপন অনুমোদন নিয়েই নাকি এরশাদ সাহেব বাংলাদেশে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ঘোষণা করেছিলেন এবং রোববারের পরিবর্তে শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বলে ঘোষনা করেছিলেন, যা এখনো চালু আছে। এদিকে, ভারতে অনেকে মনে করে, ভারত সরকারের অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গীর দরুনই আজ বাংলাদেশের অনেক হিন্দু ভারতে না এসে ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি দিতে চাচ্ছে। কেনোনা আর কিছু না হোক ঐসব দেশে সম্মানের সঙ্গে বাস করা যায়। শ্রমের বিনিময়ে অর্থোপার্জন হয় ভাল।

    বড়লেখা থেকে রঞ্জু জ্যাঠুর সঙ্গে চলে গিয়েছিলাম ঢাকায়। নিউ ইস্কাটনে তার ফ্ল্যাট বাড়ীতে ছিলাম এক সপ্তাহ। ঢাকাতে যে কটি দ্রষ্টব্য স্থানে আমি গিয়েছিলাম তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনার। বুড়ীগঙ্গার তীরে আহসান মঞ্জিলে মোগল শাসকরা বিশ্রাম করতেন এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতেন। লালবাগে গিয়েছিলাম। বিরাট এলাকা জুড়ে প্রাচীন দুর্গ। ঢাকার অদূরে জাতীয় স্মৃতিসৌধটি মুক্তিযোদ্ধা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত। এই স্মৃতিসৌধের সংগেই যে জুড়ে আছে সেই বিখ্যাত দেশাত্ববোধক গান- “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনল যারা আমরা তোমাদের ভুলব না।” গিয়েছিলাম ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। এটি ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় মন্দির। পূজা অর্চনায় ব্যস্ত ভক্তদের সমাগম লক্ষনীয়। রামকৃষ্ণ মিশনের দু’জন মহারাজের মাধ্যে একজন কোলকাতায় ছিলেন যখন গিয়েছিলাম সেখানে। ঢাকার শাহাবাগে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর। বিশাল ছ’তলা প্রাসাদ। সারা বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমানকে যেন ধরে রাখা হয়েছে নিপুণতার সঙ্গে। বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠির সংস্কৃতিক জীবন সেখানে প্রতিফলিত। শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য একটি স্বতন্ত্র গ্যালারী রয়েছে। লেঃ জেঃ আরোরার কাছে লেঃ জেঃ নিয়াজীর আত্ম সমর্পণের একখানা বিশাল ছবি রয়েছে এবং তারই বা দিকে রয়েছে আত্মসমপর্ণের চুক্তিপত্র।

    শেষ করার আগে বলে রাখি বাংলাদেশের রাস্তাঘাট অনেক উন্নত। আমি গ্রামে ও শহরে যত জায়গায় গিয়েছি কোথাও রাস্তায় কোন গর্ত দেখিনি। আমাদের নেত্-মন্ত্রীদের লজ্জায় মাথা নত হবে অবশ্য যদি সত্যিই তাদের লজ্জা বলে কিছু থাকে। সিলেট শহর শিলচর থেকে অনেক বড় ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সারা বাংলাদেশকে দূষণমুক্ত রাখতে রাস্তার দু’পাশে বৃক্ষরোপনসহ গ্যাস চালিত মোটর গাড়ীর প্রচলন এক উল্লেখযোগ্য প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। সাধারন মানুষের আচার-আচরন অত্যন্ত অমায়িক। ওরা বন্ধু-বৎসল ও অতিথি পরায়ন। আমাদের চেয়ে ওদের দেশাত্মবোধ অনেক বেশী। মানবসপম্পদ রপ্তানীকারী দেশ বলে বাংলাদেশীরা গর্ববোধ করেন। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও কম। সিলেট আদালতে বারোশ’ আইনজীবি রয়েছেন। সবাই কর্মব্যস্ত এবং বেশ হাসিখুশী। তাদের রোজগার বেশ ভাল বলেই মনে হল। বাসদ মানে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল টিপাই মুখে প্রস্তাবিত বাঁধ নির্মাণের বিরোধীতা করে বেশ জন-সমর্থন লাভ করেছে মনে হলো। ঢাকা এবং সিলেটে তাদের দেয়াল লিখন চোখে পড়ে। ঢাকা থেকে সিলেট হয়ে ফিরে আসি দেশে, শিলচরে। অনেক স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি নিয়ে, যা’ আমাকে সমৃদ্ধ করেছে নানাভাবে।

    আরও পড়ুন কিস্তি ১কিস্তি ২

    শিলচর থেকে বিশ্বজ্যোতি পুরকায়স্থ 
    আপলৌডঃ ২৪/০৭/১০

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন