• নাড়ীর টানে বাংলাদেশে – ২
    লিখেছেন: 
    বিশ্বজ্যোতি পুরকায়স্থ (পাপ্পু)

    সম্পাদক কালীপ্রসন্ন দাস তাঁর সুচিন্তিত সম্পাদকীয়তে লিখেছেন-“সম্পাদনা কাজে গভীর আন্তরিকতা এবং সর্বোচ্চ নিষ্ঠা থাকার পরও অজ্ঞাতসারে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি রয়ে যেতে পারে, কোন তথ্য বিভ্রান্তি ঘটতে পারে, কোন লেখকের ব্যবহৃত কোন শব্দ বা বাক্য কারো মনে আঘাত করতে পারে। এজন্য আমি সংশ্লিষ্টদের কাজে ব্যাক্তিগতভাবে সবিনয় ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে আমাদেরকে অবগত করতে বিনীত আনুরোধ করছি। এটি বড়লেখা সম্পর্কে একটি ভূমিকা গ্রন্থ। এই ভূমিকাকে সামনে রেখে ভবিষ্যতে গবেষকবৃন্দ বড়লেখার পূর্নাঙ্গ ইতিহাস রচনায় আত্মনিয়োগ করবেন—এই প্রত্যাশা রইল। এই গ্রন্থ যদি পাঠককে বড়লেখা সম্পর্কে আরো আগ্রহী করে তুলতে পারে তবেই তা সার্থক হবে।”

    সহযোগী সম্পাদক মোস্তফা সেলিম লিখেছেনঃ “বইটি সম্পাদনার কাজে কালীদা’র এলিফ্যান্ট রোড়ের বাসাটা ছিলো আমাদের কর্মস্থল। প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আমরা বসতাম আলাপ-আলোচনায়। বৌদির চা-নাস্তার কথা সকৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরন করছি। বইটির পান্ডুলিপি নিয়ে লেখকদের বাড়ি-বাড়ি যাতায়াতে সঙ্গে পেয়েছি যাদের, তাদের একজন রজত গুপ্ত-আমার রজতদা। বড়লেখা এ্যালবামের ছবির জন্যও ছুটেছে তাঁর মটর বাইক। তার জন্য রইলো আন্তরিক অভিনন্দন। সংসদ সদস্য শাহাব উদ্দিন আহমদ বইটি প্রকাশের ব্যাপারে প্রায়ই খোঁজ খবর নিয়েছেন। এ কারনে তাঁকে ধন্যবাদ। ‘বড়লেখা-অতীত ও বর্তমান’ গ্রন্থের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা প্রতীতি জন্মেছে যে বড়লেখাকে নিয়ে প্রচুর কাজের সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বড়লেখার মানুষ নিষ্ঠাবান হলে এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ অতীত-বর্তমান উঠে আসবে দৃশ্যপটে”।

    হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা, বাংলাদেশে যা দেখেছি আমাদের জন্য তা ইর্ষণীয়। শিক্ষার প্রসারের সংগে জাতিগত বিদ্বেষ অনেক কমে গিয়েছে। বাংলাদেশের ধনী গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত অনেকেই বিদেশে অর্থাৎ পাশ্চাত্যে বা মধ্যপ্রাচ্যে যান অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে। বিদেশে বিভিন্ন জাতী গোষ্ঠীর শান্তিপূর্ন সহাবস্থান বাংলাদেশের মানুষের মানসিকতাকে দারুন প্রাভাবিত করেছে এবং অনেক সহনশীল করে তুলেছে। এরকম মন্তব্য হিন্দ্-মুসলিম অনেকের মুখেই শুনেছি।

    ‘বড়লেখাঃ অতীত ও বর্তমান’ গ্রন্থে সংকলিত প্রত্যেকটি রচনাই অত্যন্ত সুচিন্তিত, সুলিখিত ও সুপরিকল্পিত। প্রমথ রঞ্জন চক্রবর্তী ‘ইতিহাসের আলোকে বড়লেখা’ প্রবন্ধ থেকে একটি সিলেটী  ছড়া এখানে তুলে ধরছি-
    “ভট্টাচার্য, পিঁয়াজ দেখি কেনে
    পাও ভয়?
    পিঁয়াজ উত্তম বস্তু আয়ুর্বেদে কয়।
    পিঁয়াজ খাইলেও তুমি যেই যেই
    ভট সেই ভট
    সেবে পাইলে পূজা করবায়
    রামকুমার বাবুর মঠ।
    সেই পয়সাদি কিনি আনবায়
    বকুলাল ঘাগট,
    ঘটা ঘট- ঘটা ঘট।”

    ডঃ রংগ লাল সেন তাঁর ‘বড়লেখা স্মৃতিকথা” প্রবন্ধে রাম কুমার বাবুর বাড়ীতে থাকার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে লিখেছেন- “জমিদার বাড়িতে আমার জন্য একটি ঘর বরাদ্দ করা হয়েছিল। ঘরটি বেশ বড়। আমার থাকা-খাওয়া ছিলো ফ্রি। ছেলে-মেয়েদের পড়াতাম। রবীন্দ্র রায় পুরকায়স এর ছোট ছেলে শ্যামকান্ত প্রায় ১০ বছর বয়সেও কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহনে অনিচ্ছুক ছিল। পড়াশুনা করতো না। আমার প্রধান দায়িত্ব ছিল তার পড়াশুনার তত্বাবধান করা। আমি তাকে আমার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিই। বড়লেখায় থাকাকালীন দেড় বছর আমি তার প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী ছিলাম। পরবর্তীতে সে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে। বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলার দক্ষিনভাগের পোষ্ট মাস্টার হিসেবে কাজ করছে। শুধু শ্যামকান্তকেই আমি পড়াইনি। মাঝে-মাঝে তার বড় ভাই রঞ্জু (রাধাকান্ত রায় পুরকায়স্থ ), বোন কমলা, রাজেন্দ্র বাবুর ছোট ছেলে ও মেয়ে ভোলা ও জয়াকে, বিশেষ করে অঙ্ক ও ইংরেজি শিখিয়েছি। ওরা তখন বড়লেখা হাইস্কুলে পড়ত। রঞ্জু ছিলো খুবই কৌতুহলী। সে বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় বিষয়ে প্রশ্ন করতো। বর্তমানে সে ঢাকায় তিতাস গ্যসের ভারপ্রাপ্ত ডি.জ়ি.এম. হিসেবে কর্মরত এবং মীরপুরে নিজের বাড়িতে সপরিবারে থাকে। রঞ্জুর লেখার হাত আছে। মাঝে মাঝে ঢাকার দৈনিকে তার নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। রঞ্জু এখন আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে।”

    রাধাকান্ত রায় অর্থাৎ আমার রঞ্জু জেঠুর লেখা “ছোটবেলার স্মৃতিতে” তাদের বাড়ীর বর্ণনা রয়েছে নিম্মরুপ-“রামকুমার পুরাকায়স্থ আমার দাদা মহাশয়। তাঁর বাড়ির বর্ণনা দেওয়া যায়। বাড়িটি প্রায় ৪ কেয়ার জায়গার উপর। গ্রামের অন্যান্য জমিদারদের বাড়ির মত নয়। ৩ টি অংশ। একটিতে রয়েছে ১ টি পুকুর,  চন্ডী মন্ডপ (দুর্গা পুজার স্থান), দ্বিতীয়টিতে কাচারিঘর, ফুল বাগান এবং পাহারাদারের ঘর। কাচারি ঘরে খাজনা আদায়, বিচার আচার, রাত্রিতে বাইরের লোকজনের থাকার ব্যাবস্থ। তৃতীয় অংশ অন্দরমহল ও শ্রীশ্রী লক্ষী নারায়ন জিউর মন্দির ইত্যাদি। অন্দর মহলের সীমা চিহ্নিতকারী দ্বিতল দালানটি আজও ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদের পদচিহ্ন হিসাবে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে। আজকাল কোন অনুষ্ঠানাদি না হওয়ার কারনে পরিতাপের দীর্ঘশ্বাসের গন্ধ সে বাড়ির বাতাসে যে নেই তা স্পষ্ট করে বলা যায় না। এ দালানের দরজা খুললে চামচিকের ডানার পতপত শব্দ ক্ষণিকের জন্য নির্জনতা ভঙ্গ করে স্বাগত জানায়।”

    রঞ্জু জেঠু আমাকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাড়ীতে গিয়েছিলেন, যে বাড়ীটি আমার দাদু জলের দামে বিক্রি করে দিয়েছিলেন, পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে। আমার দাদুর তৈরী ঘর, যে ঘরে আমার বাবার জন্ম হয়ে ছিলো আজ থেকে ছয় দশকেরও বেশী সময় আগে, হুবহু রয়েছে সুরক্ষিত। বাড়ীর বর্তমান মালিক, যার বাবা আমাদের বাড়ীটা কিনেছিলেন, আমাকে ও রঞ্জু জেঠুকে আপ্যায়ন করেছিলেন প্রথমে সরবত এবং পরে বিষ্কুট সহ চা দিয়ে। মধ্যাহ্ন ভোজনেরও অনুরোধ করলেন। কিন্তু অন্যত্র নিমন্ত্রন থাকায় সে অনুরোধ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান মালিক সফিক চৌধুরী সাহেব ’৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি একজন স্নাতক এবং বুদ্ধিজীবি। দেশ-বিদেশের অনেক খবর রাখেন, আলাপে বোঝা গেলো। তাঁর এক বোন শিক্ষিকা। গ্রামের একটি প্রাইভেট স্কুলে। ওরা রুচি সম্পন্ন ভদ্রলোক। সফিক সাহেব সমস্ত বাড়ী আমাকে ঘুরিয়ে দেখালেন। বললেন তোমার প্রপিতামহের লাগানো তমাল গাছটা অনেক দিন যত্ন করে রেখে ছিলাম। ১৫০ বছরের বৃদ্ধ গাছটা হঠাৎ পড়ে গেলে ঘরের বিরাট ক্ষতি হতে পারে যে কোন সময় এই বিবেচনায় গাছটি পরে কাটতে বাধ্য হয়ে ছিলাম।

    একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার সংগে কথা বলে যখন জানতে পারলেন আমি বীরবাবুর নাতি তখন আবেগের উচ্ছাসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছিলেন। আমার দাদুর ছোট- ভাই অর্থাৎ আমার কাকু বীরেন্দ্র পুরকায়স্থ মানে বীর বাবু আমাদের জমিদারি পরিচালনা করতেন। তাঁর নির্ভিক চিত্ত এবং প্রতিবাদী ব্যক্তিত্বের জন্য তাঁকে অনেকে ‘পাথারিয়ার হিটলার’ বলতেন।

    বাংলাদেশের একমাত্র জলপ্রপাত মাধকুন্ডে গিয়েছিলাম। বড়লেখা থেকে ১০/১২ কিলোমিটার হবে। প্রত্যেক বছর এখানে বারুনী মেলা বসে যথারীতি। বারুনী স্নান করেন ধর্মপ্রান হিন্দুরা।

    ‘মাধবকুন্ড-জীবন্ত প্রতিমা’ প্রবন্ধে দ্বিজেশ শর্মা অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে লিখেছেন- “সূর্যাস্তের আগেই মাধবকুন্ডে আঁধার নামে। জলমর্মর নৈশব্দের গভীরতা বাড়ায়। আমি বসেই থাকি। ভয়ের কিছু নেই। কাছেই খাসিয়াদের পুঞ্জি, পানের জুমখেত। তাদের বৌ, ঝি’রা ছড়া থেকে জল নিচ্ছে। আমার চিন্তা খাত বদলায়। কৈশোরের কথা মনে পড়ে। কতবার এখানে এসেছি। বারুনীস্নানে লোকের ভিড়, দিগম্বর সন্ন্যাসী দেখার কৌতূহল, ভিনগাঁয়ের লোকদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হবার চমক, পুজা-আর্চা, মায়ের আঁচল ধরে চৈত্রমেলায় ঘুরে বেড়ান, পাগল করা বাঁশির সুর, ফেরিওয়ালার কাঁধের লাঠিতে গাঁথা সোলার পাখির ওড়াউড়ি, ময়রার দোকানের প্রলুব্ধকর সওদা।

    খটখট আওয়াজে হঠ্যাৎ আমার চিন্তায় ছেদ পড়ে। পাহাড়ে অনেক উপরে কারা গাছ কাটছে। জলমর্মর চাপা পড়ে।
    (চলবে)

    কিস্তি ১ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

    শিলচর থেকে বিশ্বজ্যোতি পুরকায়স্থ (পাপ্পু)
    আপলৌড ১৬/০৬/১০

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন