• পথের শেষ কোথায়-৫ তাঁর সঙ্গে আমি রাজা ইডিপাসের মিল খুঁজে পাই
    লিখেছেন: 
    মিনার মনসুর

    সাদা রং করা বিশাল দেয়ালটিতে চুল্লির কয়লা দিয়ে বড়ো বড়ো করে লিখলাম ‘ইন্দিরা গান্ধী মুর্দাবাদ’। লেখাটি অনেক দিন ছিল সেই দেয়ালে। আমার তখন এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল। প্রবীণ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক আজীজউল্যা স্যারের বিশেষ তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুলের মূল ভবন-সংলগ্ন বিজ্ঞান-ভবনে চলছিল সেই চূড়ান্ত প্রস্তুতির মহড়া। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে প্রতিদিন দেয়াল-লিখনটি দেখতাম আর ভাবতাম। ভেবে কোনো কুলকিনারা পেতাম না। সত্যি বলতে কী, কাজটি কেন করেছিলাম তা আজও আমার কাছে স্পষ্ট নয়। একেবারে ঝোঁকের বশে লেখা। শুধু এ-টুকু মনে আছে যে সেদিন আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম। হয়তো প্রচণ্ড অভিমানও ছিল বুকে।

    দেশের পরিস্থিতি ছিল থমথমে। বাতাসে কান পাতলেই শোনা যেত নানা গুঞ্জন। সেই গুঞ্জনের প্রায় সবটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। নিত্য-নতুন গুজব ছড়ানো হচ্ছিল। ভয়াবহ সব গুজব। কারণে-অকারণে টেনে আনা হচ্ছিল ভারতকে; ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। দেশের ভেতরে সংঘটিত তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা-দুর্ঘটনার জন্যও তাঁকে দায়ী করা হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশ দখল করাই ইন্দিরা গান্ধীর আসল লক্ষ্য। আর তার ‘অনুচর’ হিসেবে মুজিব অচিরেই দেশটা ভারতকে দিয়ে দেবেন। সবকিছু নাকি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। দেশে কোনো মসজিদ থাকবে না। শোনা যাবে না আজানের মধুর শব্দ। তার বদলে ভেসে আসবে শঙ্খ আর উলুধ্বনি! সবচেয়ে ভয়াবহ কথাটি হলো, এ দেশে নাকি মুক্তিযুদ্ধটুদ্ধ কিছুই হয় নি। পাকিস্তানি সৈন্য এবং তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা সামান্য আঁচড়ও কাটে নি কারো গায়ে! এখানে যা কিছু হয়েছে সবই নাকি ইন্দিরা গান্ধীর পাতানো খেলা। জোর গলায় বলা হচ্ছিল যে পাকিস্তান হলো বিশ্বের তাবৎ মুসলমানের তীর্থ-ভূমি। মুসলমানদের হীনবল করার জন্যই ইন্দিরা-মুজিব ষড়যন্ত্র করে অতি পবিত্র সেই দেশটিকে ভেঙে দুই টুকরো করেছে! এমনও বলা হচ্ছিল যে বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষ নাকি হিন্দু ছিলেন। এ-ধরনের নানা সমালোচনা ও গুজবের মুখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা হয় চুপ করে থাকতেন, নতুবা মারমুখী হয়ে উঠতেন। গুজব রটনাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয়ও গোপন ছিল না। কিন্তু সাপের মতো হিংস্র এবং শেয়ালের মতো ধূর্ত এই প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার এর চেয়ে ভালো কোনো কৌশলও সম্ভবত দলটির নেতা-কর্মীদের জানা ছিল না। ফলে গুজবের পাশাপাশি অবাধে চলতে থাকে কুৎসিত মিথ্যাচার এবং অতি দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও ধার্মিকের মুখোশ পরিহিত বহু ধড়িবাজ লোকও এ-ধরনের গুজব ও মিথ্যাচারের আগুনে ঘৃতাহুতি করে যাচ্ছিলেন বিপুল উদ্যমে।

    ঘরে-বাইরে সর্বত্র বড়োদের মুখে এ-ধরনের উদ্ভট-অযৌক্তিক কথা শুনে শুনে আমি প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। আমি কোনো দল বা রাজনীতি করতাম না। সেই বয়সও আমার হয় নি তখন। তারপরও কেন জানি ভীষণ ভয় হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটবে; তারই প্রস্তুতি চলছে ভেতরে ভেতরে। অথচ সবাই নির্লিপ্ত, নির্বিকার। কারোই যেন কিছুই করার নেই। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নির্লিপ্ততা ছিল আরও বেশি। মাত্র তিন বছর আগে এ-জাতি এতো বড়ো একটি সফল মুক্তিযুদ্ধ করেছে তা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হতো তখন। আমার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছিল ইন্দিরা গান্ধী নামের মাতৃস্বরুপা সেই নারীর উপর। একাত্তরে তিনি মায়ের মতো আগলে না রাখলে আমাদের কী দশা হতো সেটা যখন এ-দেশের শিক্ষিত মানুষগুলোও এতো তাড়াতাড়ি বেমালুম ভুলে যান তখন মনে হয় সত্যিই তো সব দোষ ইন্দিরা গান্ধীর; এ-জাতিকে বিনা শর্তে তিনি এতো বিশাল সহায়তা করতে গেলেন কেন! ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উপলব্ধি তো আর ভ্রান্ত হতে পারে না। 
    ২.
    বঙ্গবন্ধুর ‘বাকশাল’ ঘোষণা চলমান গুজবের আগুনে ঘৃতাহুতি করে। বিদ্যুৎ গতিতে রটে যায় যে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্যই এটা করা হয়েছে। এমন কথাও রটানো হয় যে বঙ্গবন্ধু অচিরেই তার কনিষ্ঠ পুত্র শেখ জামালকে সেনাবাহিনীর প্রধান পদে নিয়োগ দেবেন। এভাবে একে-একে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতাই কুক্ষিগত করা হবে। সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হবে ভিন্নমতাবলম্বীদের। কায়েম করা হবে মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্র। মূলত নগরকেন্দ্রিক এ সব প্রচারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও হতাশার সৃষ্টি করেছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসার প্রাবল্যের কারণে তীব্র অন্তর্দহনেও ভূগছিলেন অনেকে। কিন্তু প্রকৃত সত্য তুলে ধরার মতো কোনো নেতা-কর্মীই তাদের ধারে-কাছে ছিলেন না। তারা তখন ব্যস্ত ছিলেন সদ্য ঘোষিত বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ) নামক রাজনৈতিক দলটিতে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে। শত চেষ্টা সত্ত্বেও যারা কোনো পদই ম্যানেজ করতে পারেন নি তারা তখন রাগে ফুঁসছিলেন ভেতরে-ভেতরে। কিন্তু সকলের পায়ের তলার মাটিই যে দ্রুত সরে যাচ্ছিল সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার মতো ফুরসৎ ছিল না কারোই।
    মজার ব্যাপার হলো, বঙ্গবন্ধুকে ঘায়েল করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা যে-বাকশালকে তাদের মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল, সেটি ছিল পরীক্ষামূলক একটি কর্মসূচি। কিছুটা যুগান্তকারীও বলা যায়। এর গুরুত্বপূর্ণ দু’টি দিক ছিল। প্রথমত, দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ গঠন। দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচিটিই ছিল আসল। বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রথম বিপ্লবটি ছিল দেশের স্বাধীনতা অর্জন। তার নেতৃত্বেই সেটি সফল হয়েছে। বাকশাল ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, এ বিপ্লবের লক্ষ্য হলো ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’। নানা প্রসঙ্গে  নানাভাবে সে-কথা বারবার বলেছেনও তিনি। এও বলেছেন যে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ দু’টি বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন একই নিঃশ্বাসে। সেটি হলো, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। স্বাধীনতার স্বপ্ন সফল হয়েছে কিন্তু প্রকৃত ‘মুক্তি’ অর্জিত হয় নি। তিনি বলেছেন, তার দ্বিতীয় বিপ্লবের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক মুক্তি। তার ঘোষিত বাকশাল তথা দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ দেশের ভূখা-নাঙ্গা মানুষকে শোষণ-বঞ্চনা ও দারিদ্র্যের বংশানুক্রমিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা সম্ভব বলে তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাসও করতেন।

    গত শতাব্দীতে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের খুবই প্রিয় একটি শ্লোগান ছিলো ‘এ সমাজ ঘুণে ধরা/এ সমাজ ভাঙতে হবে’। দশকের পর দশক ধরে শ্লোগানটি এ-দেশের মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিতও করেছে। গতানুগতিক অর্থে বঙ্গবন্ধু বিপ্লবী ছিলেন না। সব ধরনের হঠকারিতা বা চরমপন্থা থেকে তিনি নিজেকে সযত্নে  দূরে রেখেছেন আমৃত্যু। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বঙ্গবন্ধু নিজেও সম্ভবত উপলব্ধি করেছিলেন যে দুঃখী মানুষের ভাগ্য বদলাতে হলে ঘুণে ধরা সমাজ ভাঙা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাঁর ভাষায়, ‘আমি কেন ডাক দিয়েছি? এই ঘুণে ধরা ইংরেজ আমলের, পাকিস্তানী আমলের যে শাসনব্যবস্থা তা চলতে পারে না। একে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। তা হলে দেশের মঙ্গল আসতে পারে। না হলে আসতে পারে না। আমি তিন বছর দেখেছি। দেখেশুনে আমি আমার স্থির বিশ্বাসে পৌঁছেছি।...’ (সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রদত্ত ভাষণ: ২৬ মার্চ, ১৯৭৫)।

    আমার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির মধ্যে বিদ্যমান ঘুণে ধরা সমাজ ভাঙার বলিষ্ঠ কিছু উপাদানও ছিল। তিনি তার মতো করে সমাজ-ভাঙার কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। বিশেষ করে কৃষি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড়ো ধরনের পরিবর্তনের চিন্তা ছিল বঙ্গবন্ধুর মনে। পঁচাত্তরের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জনসভায় প্রদত্ত দীর্ঘ ভাষণে সেটা তিনি বলেছেনও খোলাখুলিভাবে। তাঁর ভাষায়, ‘এই যে নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি, গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না। ভয় পাবেন না।...পাঁচ বছরের প্ল্যানে বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে এই কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে। ...কর্মক্ষম প্রতিটি মানুষকে কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলো বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে, টেস্ট রিলিফ যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কস প্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে-আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিল টাউটদেরকে বিদায় দেয়া হবে। তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এই জন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে। আমি ঘোষণা করছি যে পাঁচ বছরের প্ল্যানে প্রত্যেকটি গ্রামে পাঁচশ’ থেকে হাজার ফ্যামিলি নিয়ে কম্পালসারি কো-অপারেটিভ হবে।’

    মূলত দ্বিতীয় বিপ্লবের এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্যই তিনি গঠন করেছিলেন বাকশাল নামক নতুন রাজনৈতিক দল। এটাকে তিনি বলেছিলেন জাতীয় দল বা প্লাটফরম। দল-মত নির্বিশেষে সকলেরই যোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল এই দলে। সামরিক-বেসামরিক বহু সরকারি কর্মকর্তা সেই সুযোগ গ্রহণও করেছিলেন। গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া বাকশালে যোগ দেওয়ার জন্য হিড়িক পড়ে গিয়েছিল তখন। নানাভাবে দেন-দরবারও চলছিল। শোনা যায়, এখন যাকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বলে বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর হাস্যকর চেষ্টা করা হচ্ছে সেই সেনা কর্মকর্তাও ছিলেন এই দলে। ছিলেন আরও অনেকেই। বাকশালের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় এখনও থামে নি। বলা হয় যে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্যই বঙ্গবন্ধু একদলীয় শাসন কায়েম করেছিলেন। হত্যা করেছিলেন গণতন্ত্রকে। সে জন্যই নাকি সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল! বহু বুদ্ধিজীবী-পণ্ডিতের মুখেও আমি এমন কথা বহুবার শুনেছি। এ প্রচারণা যে সুপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। অনেকটা হরিণের পানি ঘোলা করার সেই গল্পের মতো। আমার ধারণা, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পরপরই। ঘাতকরা তাদের লক্ষ্যে এতোটাই অবিচল ছিল যে বঙ্গবন্ধু বাকশাল কর্মসূচি ঘোষণা না করলেও পরিস্থিতির কোনো হেরফের হতো বলে মনে হয় না। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ক্ষমতা আঁকড়ে থাকাই যদি বঙ্গবন্ধুর মূল উদ্দেশ্য হতো তার জন্য বাকশাল গঠনের প্রয়োজন ছিল না। স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তিনি আরও বহুদিন ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। আমার জানা মতে, বঙ্গবন্ধুর ঘোর বিরোধীরাও নির্বাচনের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার অসম্ভব স্বপ্ন কখনই দেখেন নি। সব দল মিলেও যে সেটা সম্ভব হতো না তা তারা ভালো করেই জানতেন। এমনকি চুয়াত্তর-পঁচাত্তরের সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোতেও সকল বিচারেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। জনপ্রিয়তার দিক থেকেও তার সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। সেটা তিনি নিজেও জানতেন। যেখানেই তিনি যেতেন, সেখানেই মানুষের ঢল নামতো।  আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর কষ্ট ছিল অন্য জায়গায়। তিনি নিজের সঙ্গেই এক কঠিন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। নিজেকে নিজের চারপাশের সব সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে বঙ্গবন্ধু তার নিজের দল আওয়ামী লীগের উপরও ভরসা রাখতে পারছিলেন না। তার সারা জীবনের স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। বিশেষ করে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ তাকে খুব বিচলিত করে তুলেছিল।

    নানা সূত্রে এখন জানা যাচ্ছে যে দ্রুত কিছু একটা করার জন্য ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড অস্থির হয়ে উঠেছিলেন তিনি। নানা জন নানা পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, ভেবে-চিন্তে ধীরেসুস্থে পা ফেলতে। পরিণতি সম্পর্কে সতর্কও করে দিয়েছেন তাকে। ফিদেল ক্যাস্ত্রৌর মতো নেতারাও ছিলেন পরামর্শদাতাদের দলে। কিন্তু একাত্তরের রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোর মতো এবারও বঙ্গবন্ধু স্বীয় সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলেন। কারো কথাই শোনেন নি তিনি। এমন নয় যে পরিণতির ব্যাপারে তিনি খুব উদাসীন ছিলেন। ঘাতকের বুলেট যে  যে-কোনো সময়ে তার বুক ঝাঁঝরা করে দিতে পারে তাও তার অজানা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের খুব ভক্ত ছিলেন তিনি। সত্য যে কঠিন নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনেই তা তিনি উপলব্ধি করেছেন পদে-পদে। স্বধর্মে অবিচল থাকা যে আরও কঠিন তাও তিনি জানতেন। তবু যুধিষ্ঠিরের মতো তিনিও স্বধর্ম পালনে কখনই কুণ্ঠিত হন নি। যুধিষ্ঠির চলতেন নিজের বিবেচনা ও বিশ্বাস অনুযায়ী। বিবেকের নির্দেশকে শিরোধার্য জ্ঞান করতেন। এটাই হলো স্বধর্ম। শত ঝড়-ঝঞ্ঝা সত্ত্বেও এ-পথ থেকে একচুলও বিচ্যুত হন নি যুধিষ্ঠির। এ জন্য বুদ্ধদেব বসু মহাভারতের নায়কের শিরোপাটি তুলে দিয়েছিলেন তার মাথায়। বলেছিলেন মহাবীর অর্জুন নন, যুক্তিবাদী যুধিষ্ঠিরই হলেন যথার্থ নায়ক। বঙ্গবন্ধুও তাই। বলা যায়, সম্পূর্ণ সজ্ঞানেই ঘাতকের উদ্যত সঙ্গীনকে অগ্রাহ্য করে একাত্তরের মতো আবারও বিবেকের ডাকেই সাড়া দিয়েছিলেন তিনি। এটাই তার স্বধর্ম।

    শামসুর রাহমান তার একটি অসামান্য কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রীক বীর এ্যাগামেমননের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অনবদ্য সেই শব্দচিত্র। ‘ইলেকট্রার গান’ শিরোনামের সেই কবিতাটি আমি বারবার পড়ি। তবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমি রাজা ইডিপাসেরও মিল খুঁজে পাই - কোনো কিছুই যাকে নিজ জনগণের মঙ্গল-সাধনের ব্রত থেকে নিবৃত্ত করতে পারে নি। ইডিপাসের মধ্য দিয়ে খুঁজে পাই আমাদের কালের অবিস্মরণীয় ট্রাজিডির অনন্য এক মহানায়ককে।

    মিনার মনসুরঃ কবি ও সাংবাদিক

    minarmonsur@gmail.com

    আপলৌডঃ ২৯/০৫/১০

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন