• কী আশায় বাঁধা এ খেলাঘর
    যুথিকা বড়ুয়া

    বিশ্বাস আর ভালোবাসা নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে পৃথিবীতে, যা বাচ্চা-বুড়ো-জোয়ান-নারী-পুরুষ প্রতিটি মানুষই একান্ত করে পেতে চায়। সেই সঙ্গে মান-মর্যাদায় পূর্ণ, অর্থ-বিত্ত-ঐশ্বর্য্য, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দময় জীবন কে না পেতে চায়! আর তার জন্য আমাদের কতো সাধনা, কতো আরাধনা, কতো বলিদান, যার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তারপরও সবার ভাগ্যে তা জোটে না। বিশেষ করে, যারা বলির পাঁঠার মতো নিজেকে বাজি রেখে দৈনন্দিন জীবনের চাওয়া-পাওয়ার সংঘর্ষে চরম ব্যর্থতায় নানা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্তে লাঞ্ছিত, প্রবঞ্চিত, প্রতারিত ও নিপীড়িত হয়ে কর্মহীন অনিশ্চিত জীবনের প্রবল যন্ত্রণায় বেমালুম বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে, তাদের ধ্যান-ধারণা, মন-মানসিকতা; কলুষিত করছে মনোবৃত্তিকে। যখন লোভ-লালসার নানান প্রলোভনের হাতছানি উপেক্ষা করতে না পেরে নিজের সততা এবং সত্যকে বিসর্জন দিয়ে মিথ্যার কাছে আত্মবিক্রয়, লোভের কাছে নতি স্বীকার এবং ভোগের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে অর্থ-ঐশ্বর্য্য, মান-মর্যাদা এবং প্রতিষ্ঠার পিছনে ক্ষুধার্ত হায়নার মতো হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে একদিন এমন এক অন্ধগলিতে গিয়ে পৌঁছায়, যেখানে শ্রদ্ধা-ভক্তি, আদর-স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা কিছু নেই। নেই জীবনের আদর্শ, মানবিক মূল্যবোধ, সততা, নৈতিকতা এবং মানবতা। চারিদিকে শুধু চোখ-ধাঁধানো রূপ, রঙ আর নেশাদ্রব্যের ভাণ্ডার। যার অন্ধমোহে মোহিত হয়ে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়ছে কতগুলি সহজ সরল নিরীহ মানুষ। ফলে আমাদের সুশীল সমাজ থেকে বিচ্যুত এবং প্রিয়জনের সংস্পর্শ থেকে বিতাড়িত হয়ে বদলে যাচ্ছে ফুলের মতো নারীর জীবন। আসলে সেটা মায়া-মরীচিকা; ক্ষণিকের মোহ। চোখের রঙ মুছে গেলেই চারিদিকে কুয়াশার মতো শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া - হাত বাড়ালে কিছুই নেই। সব শুন্য। আর এই শুন্যতার বোধটুকু যখন চৈতন্যে উদিত হয়, ভরা পেয়ালার অমৃত মধুর সুরাও তখন তিক্ত-বিষাক্ত হয়ে ওঠে; অর্থহীন মনে হয়। তখন সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে শোক-বেদনার হাহাকার ও তীব্র আর্তনাদ বাইরের পৃথিবীতে পৌঁছুবার মতো কোনো রাস্তাই আর থাকেনা।

    বছরখানেক আগে এক জলসায় গিয়েছিলাম। সেদিন ছিল, ‘ভ্যালেনটাইনস্  ডে’। ঘরোয়া পরিবেশ হলেও পার্টি হলের ঝুলন্ত সুদর্শন সোনালী ঝাড়বাতির ঝিকিমিকি আলোর কণা বেশ রোমান্টিক লাগছিলো। দেখলাম, তখনও থোকায় থোকায় লাল-নীল-হলদে রঙ-বেরঙের বেলুন আর সুবর্ণ আলোর মালায় চলছে ডেকোরেশনের পর্ব। তার ঘন্টাখানেক পরই শুরু হয় চমকপ্রদ প্রসাধনের বাহার ছড়িয়ে, আতরের গন্ধ উড়িয়ে, হাসির ফোয়ারা তুলে বাহুবেষ্টিত যুগলবন্দী কপোত-কপোতীর পালা করে আগমন - কথোপকথনের গুঞ্জরণ; হাসির কলতান। ধীরে ধীরে বেশ আনন্দোৎচ্ছল সমারোহে ছেয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয় এক মনোরম রোমাঞ্চকর পরিবেশ। উপভোগ্যই বটে! ক্ষীণ শব্দে গ্রামোফোন রেকর্ডে বাজজে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অপূর্ব মূর্ছনা। অন্যদিকে আগন্তুক অথিতিরাও উন্মুক্ত চিত্তে কুশল বিনিময়ে মশগুল। পাশেই বিরাটাকারের একটা বিস্তৃত টেবিল জুড়ে সাজানো রয়েছে রকমারি আহারের চমৎকার বন্দোবস্ত। তার সাথে হুইস্কি, বীয়ার, ব্র্যাণ্ডি এবং সফ্ট ড্রিংক্সও।

    হঠাৎ দেখি, এক উর্বশী যুবতী রমণী ধুমকেতুর মতো আর্বিভূত হয়েই তার ডাগর চোখের অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে কাকে যেনো খুঁজছ। তার চেহারা আর চটকদারী বেশভূষায় মনে হয়েছিলো যেন এক স্বপ্নপরী স্প্যানিশ কন্যা। তারপরই দেখি, চোখেমুখের বিচিত্র ইশারায় কার দিকে যেনো কী একটা সংকেত প্রেরণ করতে করতে গ্লাসে বিয়ার ঢালছে। ঢেলে গ্লাসটা হাতে নিয়ে ফিল্মী হিরোইনদের মতো প্রাণবন্ত চঞ্চলতায় রহস্যাবৃত চোখের চাউনি মেলে ইউরোপীয় ষ্টাইলে প্রসন্ন মেজাজে ছোট্ট-ছোট্ট চুমুক দিয়ে পান করতে করতে একটা সোফার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। দাঁড়াতেই দেখি ভীড়ের মধ্যে থেকে পাগড়ি পরিহিত লম্বাটে সুঠাম ও সুদর্শন চেহারার এক তরুণ যুবক হঠাৎ এসে ওর গা-ঘেষে দাঁড়ায়। সেও  উচ্ছ্বাসে একেবারে উতল। ৫৫৫ সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে পুরুষালি ভঙ্গিতে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে-ছাড়তে তার মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি মেলে আস্বাদন করতে থাকে, হৃদয়াকর্ষক সৌন্দর্যের পারিজাত ঐ উর্বশী রমণীর বাঁধ ভাঙ্গা উত্তাল যৌবনের চমকপ্রদ রঙ আর রূপ। কিন্তু কিছুক্ষণ বাদে মন্ত্রের মতো হঠাৎ চোখের পলকে ওরা কোথায় যে উধাও হয়ে গেলো, ওদের আর দর্শনই পাওয়া যায়নি সেই রাতে।

    তার মাস ছয়েক পরের ঘটনা। সেদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। চারদিক নিঝুম, নিস্তব্ধ। বৃষ্টিও পড়ছিল গুড়ি-গুড়ি। তাই দৌঁড়ে যাচ্ছিলাম বাস ধরবো বলে। ইতিপূর্বে ট্রাফিক সিগ্ল্যালের গ্রীণ লাইটটা জ্বলে উঠতেই বাসটি দ্রুত পাস করে গেল। আর তক্ষুণি মহিলা কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই আমি থমকে দাঁড়াই। -‘আও ব্যাহেন আও, ইধার আও!’

    পিছন ফিরে দেখি, একজন অচেনা অপরিচিত প্রৌঢ়া মহিলা বিমূঢ়-ম্লান মুখে বাসষ্টপেজের ছোট্ট শেল্টারে বসে আছে। ওর আশেপাশে কেউ নেই। কে এই মহিলা? খুব চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেনো দেখেছি! ভাবতে ভাবতে গুটি-গুটি পা ফেলে আমিও বাসষ্টপেজের দিকে এগিয়ে যাই। চোখে চোখ পড়তেই ঠোঁটের কোণে অস্ফূট বিষন্ন একটা হাসি ফুটিয়ে মৃদু কণ্ঠে মহিলাটি বলে ওঠে,-‘হায়, হাউ আর ইউ? পহেচানা? ম্যায় সুলোচনা! এয়াদ আছে?’

    চোখ পাকিয়ে ওর আপাদমস্তক নজর বুলাতেই আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই বিস্ময়ে, -এ কি, এ তো সেই উর্বশী রমণী। শরীরের এ কি হাল হয়েছে ওর! জরাজীর্ণের মতো নিথর, নিস্তেজ। চোখমুখও শুকিয়ে একেবারে গর্তে ঢুকে গিয়েছে। কঙ্কালের মতো লাগছে। কোনো বিকার নেই। উচ্ছাস নেই। সাজ-সজ্জার বালাই নেই। কেশ-বিন্যাশ এলোমেলো। প্রসাধনের অবস্থাও তদ্রুপ। পরনের পোশাকটি দামী হলেও মলিনতার ছাপ ছিল প্রকট।

    ইত্যবসরে সুলোচনা বলে,-‘আরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজজো কেন! আ জাও অন্দর!’
    -‘কিন্তু তুমি এখানে? তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছেনা! এ অবস্থা কেনো তোমার? আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না!’

    ইত্যমধ্যে নাকের ডগা দিয়ে তীব্রবেগে চলে গেলো আরো দু’টো বাস। অথচ বাড়ি ফেরার কোনো তাগিদই বোধ করছে না সুলোচনা। মনে হচ্ছিল, প্রবল ঝড়ের মুখে উড়ে আসা মুমূর্ষু পাখীর মতো নির্জনে চুপটি করে বসে আছে। সংসারে ওর যেনো কেউ নেই। বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া নেই। ফেরার ইচ্ছাও নেই। আর সময় মতো বাড়ি না ফিরলে ওর জন্যে যে কেউ চিন্তা করবে, সেদিকেও ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! ব্যাপারটা কী! কোনো রকম অঘটন কিছু ঘটেনি তো!

    হ্যাঁ, ঠিক তাই। অনুমান মিথ্যে নয়। ওর সম্মুখে গিয়ে দাঁড়াতেই আমায় জড়িয়ে ধরে সুলোচনা হু হু করে কেঁদে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে সাশ্রুনয়নে উন্মোচিত হতে থাকে সুলোচনার প্রতারিত জীবনের করুণ কাহিনী।

    প্রায় বছর দশেক আগে নব-পরিণীতা সুলোচনা ইমিগ্র্যাণ্ট হয়ে কানাডায় পাড়ি দিয়েছিলো প্রিয়তম স্বামী সন্দীপের হাত ধরে। সুলোচনা জাতিতে মারাঠী। কোলকাতায় একই কলেজে পড়তো দু'জনে। সেখানেই ওদের প্রথম আলাপ, পরিচয়, বন্ধুত্ব, হৃদ্যতা, ঘনিষ্ঠতা। যার অনির্বায ফলরূপে ওদের কোমল হৃদয়ে জন্ম নিয়েছিলো ভালোবাসা। যাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো সন্দীপের পরিবার। আর হবে না-ই-বা কেন! শহরের সুপ্রতিষ্ঠিত, উচ্চবিত্ত, অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত বাঙালী পরিবারের সন্তান সন্দীপ রায়চৌধুরী। বংশের প্রতীক। একমাত্র উত্তরাধিকারী। কতো স্বপ্ন ছিল ওর বাবা-মায়ের। কতো আশা ছিল। তাদের আশার সব আলো নিভিয়ে দিয়ে ইকোনমিক্সে মাষ্টার্স করে মাতা-পিতার অসম্মতিতে ও অজ্ঞাতে সুলোচনার সাথে কোর্ট ম্যারেজ সম্পন্ন করেই পাড়ি জমায় কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরে। তখন কচি বয়স সুলোচনার। আবেগে, উচ্ছাসে একেবারে উতলা। আকস্মিক নিজস্ব গণ্ডি ছেড়ে বাইরের রঙ্গীন পৃথিবীতে পর্দাপণ করে ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলো। ভেবেছিলো আকাশের চাঁদটাই বুঝি পেয়ে গিয়েছে ওর হাতে। আর নাগাল পায় কে! খুশির পাল তুলে মুক্ত-বিহঙ্গের মতো জীবন জোয়ারে ভাসতে থাকে। বিদেশী পর্যটকের মতো প্রচণ্ড বিস্ময় ও ঔৎসুক্য নিয়ে শহরের নানাবিধ মনোহরা দর্শনীয় স্থানগুলি একে একে ঘুরে দেখতে লাগলো। এমন সময় রামধনুর মতো ওর হৃদয়াকাশে আবির্ভূত হয়েছিলো চিরঞ্জিত সিং।
    ততোদিনে সন্দীপের কাঙ্খিত বাসনাগুলিও একে একে সব পূরণ হতে লাগলো। মর্যাদাসম্পন্ন উচ্চপদস্থ চাকুরী, দেশীয় ষ্টাইলে আলিশান বাড়ি, গাড়ি, বিলাসবহুল আসবাবপত্র, অর্থ-বিত্ত-ঐশ্বর্য, দামী শাড়ি-গহনা, সব পরিপূর্ণ। যখন স্বর্গসুখ ছিল সুলোচনার হাতের মুঠোয়।

    ইতিমধ্যে সুযোগ্য পুত্র সন্দীপের আশাতীত সাফল্যের সুসংবাদে মনের ক্ষোভ, মান-অভিমান, অভিযোগ, অনুযোগ সব অপসারিত করে ওর মাতা-পিতা ভিজিট করতে চলে আসেন কানাডায় - যা তারা কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

    কিন্তু বিধিই বাম! খণ্ডাবে কে! রায়চৌধুরী পরিবারে অপ্রত্যাশিত এতো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ মঞ্জুর হলো না বিধাতার কাছে। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো একদিন হঠাৎ মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় সন্দীপের অপমৃত্যুতে নিভে গেল সুলোচনার ভালোবাসার প্রদীপ। ভেঙ্গে চূড়মার হয়ে গেল ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ। অচিরেই ওর জীবনে ঘনিয়ে আসে অন্ধকার। জীবন-নদী ওকে নিয়ে চলে অনিশ্চিত মোহনার দিকে। যেখানে কূল নেই, কিনারা নেই, নেই বেঁচে থাকার কোনো উপাদান। যা স্বপ্নেও কোনদিন কল্পনা করতে পারেনি সুলোচনা, তাই ঘটে গেলো ওর জীবনে। 

    সদ্য স্বামী হারানোর শোকে কাতর মুহ্যমান সুলোচনার উপরে অমানবিকভাবে শুরু হয় শ্বশুড়-শ্বাশুড়ীর শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন, দুর্ব্যবহার আর মিথ্যে কলঙ্ক-অপবাদ লেপন। নিষ্ঠুর নির্দয়ের মতো তাঁরা প্রতিনিয়ত শুধু বলতেন, ‘ডাইনি, পোড়ামুখী, রাক্ষসী, কুলাঙ্গার! দূর হ এখান থেকে। তোর কোনো অধিকার নেই এখানে থাকবার!’
    অথচ ওঁরা একবারও ভেবে দেখলেন না যে, অকাল বৈধব্যে তারুণ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে উনত্রিশ বছরের যুবতী একা কোথায় যাবে! কোথায় থাকবে! কিভাবে জীবনযাপন করবে! দূরদেশে যার কেউ নেই, কোন্ সাহারায় সে বেঁচে থাকবে!

    আর তখনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে চিরঞ্জিত সিং। যাকে মনে-প্রাণে ভালোবেসে ও বিশ্বাস করে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলো সুলোচনা। অথচ চাতুর্য্য ও সুযোগের সুকৌশল সদ্ব্যবহার করে, মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে সুলোচনার অন্ধকার জীবনে আলোর পথ দেখাতে চিরঞ্জিতই ওকে নিয়ে এসেছিলো টরণ্টো শহরে। যদিও অন্তরাত্মা সাড়া দিচ্ছিলো না, তবে বিবেকের দংশনের বিপরীতে নিজেকে শান্তনা দিয়ে সেদিন সুলোচনা মনে-মনে ভেবেছিলো, দিনকাল বদলে গিয়েছে- বদলে গিয়েছে মানুষের রুচি, ধ্যান-ধারণা। সতীদাহ প্রথাও উচ্ছেদ করে দিয়েছেন রাজা রামমোহন রায়। তারুণ্যে বিধবার পূণর্বিবাহের রেওয়াজও বহুকাল থেকেই প্রচলিত। পাপ-পূণ্যের দোহাই দিয়ে, নিজের সাধ-আহ্লাদ, কামনা-বাসনাগুলিকে বিসর্জন দেবার চেয়ে জীবনকে নতুন রঙে নতুন ঢঙ্গে সাজিয়ে তোলাই উচিত!

    কিন্তু নারীর মন বড়ই নাদান। মতলবী পুরুষমানুষের ভণ্ডামী, সহসাই নারীর মনের আয়নায় ধরা পড়ে না। উপরন্তু, সে আবেগের বশীভূত হয়ে, দৃঢ় বিশ্বাসে ভর করে ভালো-মন্দ যাচাই না করেই অন্ধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ভালোবাসার গহীন সমুদ্রে। যার কূল নেই, কিনারা নেই, গন্তব্যর ঠিকানা নেই।

    সুলোচনা মনস্থির করে, টরেণ্টো ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া শুরু করবে। স্বাবলম্বী হবে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। শুনে খুব খুশি হয় চিরঞ্জিত। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ও যে কী মতলব আঁটছিলো, তা ঘূণাক্ষরেও টের পায়নি সুলোচনা। প্রতিদিন আর্লি মর্নিং-এ দুজনে একসাথেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতো। আবার বিকেলের দিকে একসাথেই বাড়ি ফিরতো।

    সেদিন যথারীতি সুলোচনা বাড়ি ফিরে এসে দ্যাখে,ঘরের দরজাটা আলতোভাবে খোলা। ভাবল, চিরঞ্জিত এসে পড়েছে। এখুনিই চা-নাস্তা তৈরী করতে হবে। কিন্তু কোথায় চিরঞ্জিত! ঘরের ভিতরে ঢুকে মাথায় যেন ওর বজ্রাঘাত পড়ে। এ কী! ঘর-দুয়ার এলোমেলো কেন? ঘরের জিনিসপত্র সব গেলো কোথায়? তবে কি বাইরের কেউ ঢুকে চুরি করে নিয়ে গেলো সব?

    সুলোচনা বিচলিত হয়ে পড়ে। দ্রুত এ-ঘর ও-ঘর খুঁজে দেখে, চিরঞ্জিতের পরনের জামা-কাপড়, কোট-টাই, দামী স্যুট কিছু নেই। লেদারের বড় একটা স্যুটকেস ছিল, সেটাও নেই। তার মধ্যেই সযত্নে রাখা ছিলো সুলোচনার কিছু গহনা, টাকা পয়সা, ল্যাডিং পেপার, কানাডিয়ান সিটিজেনশীপ পেপার, পাসপোর্ট সব। কখন যে চিরঞ্জিত এসে সব হাতিয়ে নিয়ে গিয়েছে, ঘূণাক্ষরেও টের পায়নি সুলোচনা। এমনকি যে বাড়িতে ওরা থাকতো, সেটাও অন্যের মালিকাধিনে চুক্তিবদ্ধ করে গচ্ছিত রেখে গিয়েছে। শুধুমাত্র পড়নের কাপড় আর হাতের বালাদু’টিই ছিল ওর একমাত্র সম্বল। একটা সূতো পর্যন্তও অবশিষ্ট ছিলো না সুলোচনার।

    কিন্তু তারপরও বিরহ-কাতর সুলোচনার নিস্পাপ মন চিরঞ্জিতের অপেক্ষায় কত পক্ষকাল পথ চেয়ে বসে ছিলো! ওর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো চিরঞ্জিত ফিরে আসবেই! কিন্তু চাকুরীর ইন্টারভিউ দেবার বাহানা করে সেই যে ঊষার প্রারম্ভে ঘন কূয়াশায় গা-ঢাকা দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো, ওর সম্মুখে আর ফিরে আসেনি চিরঞ্জিত।
    অথচ মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধান! অন্যান্য দিনের তুলনায় সেদিন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো চিরঞ্জিত। কিছুদূর গিয়ে পিছন ফিরে বেশ কিছুক্ষণ সুলোচনার মুখপানে পলকহীন নেত্রে তাকিয়েছিলো। তখন মনে হয়েছিলো, হয়তো কোনো প্রয়োজনেই বোধহয়! কিন্তু দৃষ্টিটা অন্যদিনের তুলনায় একটু ব্যতিক্রম মনে হতেই ঘর থেকে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল সুলোচনা। কিন্তু ইতিপূর্বে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চিরঞ্জিত মুখ ফিরিয়ে মায়ার মরীচিকার মতো চোখের নিমেষে মিলিয়ে গিয়েছিল ঘন কূয়াশার মাঝে। তখন কি একবারও ভাবতে পেরেছিল সুলোচনা, চিরদিনের মতো বিদায় নিয়ে চিরঞ্জিত ওর জীবন থেকে একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গেলো!

    সুলোচনা আজ পথের ভিখিরী। অনুতাপ আর অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হতে হতে জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্খা, কামনা-বাসনাগুলি জ্বলে পড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। মরে গিয়েছে ওর বেঁচে থাকার সাধ। শুধু প্রাণটা নিয়েই এতিমের মতো শহরের অখ্যাত কুখ্যাত অলিতে-গলিতে অপদস্থ, প্রবঞ্চিত, লাঞ্ছিত, নিগৃহীত ও নিপীড়িত হয়ে অস্তগামী সূর্যের মতো প্রহর গুনছে মৃত্যুর অপেক্ষায়। 

    যুথিকা বড়ুয়া: কানাডার টরন্টো প্রবাসী লেখক ও সঙ্গীত শিল্পী
    jbarua1126@gmail.com

    ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন