• বাবার ধূমপান ছাড়ার গল্প
    সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্

    রাত এগারোটা। মা ওয়াক ওয়াক, গগগ করতে করতে এক দৌড়ে এসে বেসিনে বমি করে দিলেন। আমরা দুই ভাই-বোন রিডিং রুমে পড়ছিলাম। দৌড়ে গেলাম। মা বকবক করে বাবাকে বকে যাচ্ছেন। অর্ধেক বকা দিতেই আবার গগগ ওয়াক করে বমি করছেন। বকাও দেয় সাথে বমিও করে। ঘটনার কিছুই বুঝতে পারছি না।

    মা বমি করতে করতে বেসিনে উপুড় হয়ে হাঁপাচ্ছেন। রাগের চোটে একটু পরপর বকা দিতে গেলেই আবার গগগ ওয়াক। মুখ থেকে লোল-বিজলা পড়ছে। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।

    ভাইয়া মার মাথাটা একটু ধরতে গেলেন। কিন্তু মা বিছার মতো লাফিয়ে উঠে একটা ঝেংরা মেরে বললেন, সর, সর আমার সামনে থেকে, সর। ধরতে হবে না। ভাইয়া ভয়ে দুই পা সরে গিয়ে বলল, আমি কী করেছি? আমার সাথে এভাবে কথা বলছ কেন? কী হয়েছে তোমার এমন করছ যে?
    মা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, তোমার বাবা  জোর করে আমার মুখের ভেতর সিগারেটের ধুমা দিছে।
    ভাইয়া বলল, সিগারেটের ধুয়া দিছে বলে এক্কেবারে এমন করতে হবে নাকি, তোমার?
    মা বললেন,  এমন করতে হবে না মানে? কি বিচ্ছরি গন্ধরে বাবা, ওয়াক থু!

    আমি তাড়াতাড়ি এক গ্লকগ্লাস পানি নিয়ে মার সামনে গিয়ে ধরলাম। মা রেগে মেগে বললেন, আমার সামনে থেকে দূর হ। আমি টুণ্ডা না। এ কথা বলে নিজেই জগ থেকে পানি ঢেলে গডগড করে খেলেন। একা একা কথা বকে চলেছেন।

    আর সম্ভব না। আমি আলাদা থাকব। যার ইমান আমল নেই, তার সাথে কীসের সংসার? একশ বার কিরা কসম কেটে সিগারেট খাওয়া ছেড়েছে আবার একশবার সিগারেট ধরেছে। বিদ্যা নিয়ে কিরা, পশ্চিম দিকে ফিরে কিরা, কানে ধরে কিরা, আমার মাথায় ধরে পর্যন্ত কিরা কসম কেটেছে। কিরা কেটে সিগারেট ছেড়ে ধরে পান। কদিন বাদে দেখি, পান সিগারেট দুটোই সমানে খায়। লোকটার মনে আল্লা-খোদার ভয় নি আছে।

    বাবা খুব রাগী মানুষ হলেও মাঝে মধ্যে খুব দুষ্টুমি করে আমাদের সাথে। আমি ভয়ে ভয়ে বাবার ঘরে চুপি দিয়ে দেখি, বাবা সমানে সিগারেট টানছে শুয়ে শুয়ে। পায়ের উপর পা দোলাচ্ছে। আর মুখে মুচকি হাসি। হাসি দেখে সাহস করে গিয়ে বললাম, কিরা কেটে কেটে সিগারেট খাও আবার মাকেও খাওয়াও, নাহ্? আবার হাসে? এখন বকা খেতে মজা লাগে তোমার, হেহ্? এ কথা বলে এক দৌড়ে চলে এলাম আমার রুমে। ভাইয়া বলে, তোর তো সাহস কম না! এখন না দুজনেই থাপ্পড় খামু। ভাইয়া ভয়ের ঠেলায় জোরে জোরে পড়তে লাগল।

    বাবা কিছুই বললেন না। মনে হলো, সব দোষ বাবার।

    মা হনহন করে এসে বললেন, অই সর। বালিশ দে, এই লোকের সাথে থাকা সম্ভব না। ওই রুমে কেউ যাবি না। রুমে বিষ। আমি অন্যরুমে থাকব। মা বালিশ নিয়ে ধপ থপ করে অন্যরুমে গিয়ে ঠাস করে শুয়ে পড়লেন। সব কিছু নীরব হয়ে গেল।

    দাদুর ডাক পড়ল।
    খোকা, আমার ঘরে আসো। (বাবার ডাকনাম খোকা)।
    বাবা সার্ট পরে মাথা আচড়ে মার সামনে গিয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়ালেন।
    দাদু বললেন, তুমি তিন দিনের মধ্যে ধূমপান ছাড়বে। এটা আমার নির্দেশ।
    বাবা কী যেন বলতে চাইলেন, দাদু বললেন, কোনো কথা শুনতে চাই না আমি। যাও।
    বাবা মুখটা ্ইঁদুরের মুখের চোখামোখা করে বেরিয়ে এসে চুপ করে শুয়ে রইলেন।

    দাদু আবার ডাকলেন, গালিব সুমাইয়া আমার কাছে আসো।
    আমরা দাদুর পাশে গিয়ে বেজার মুখে দাঁড়ালাম। দাদু বললেন, আজ সালাম দিতেও ভুলে গেছ তোমরা। এ কথা শুনে আমরা দুজনেই সাথে সাথে সালাম দিলাম। দাদু বললেন, এটা সালাম নয়। সালাম দিতে হয় মন থেকে।

    কতক্ষণ চুপ থেকে দাদু বললেন, মা-বাবার ঝগড়া দেখার ভাগ্য সব সন্তানের হয় না। তোমাদের হয়েছে। আজ কোনো পড়া হবে না। যাও, শুয়ে পড়ো।

    সকালবেলা। কোনো কারণ ছাড়াই ভাইয়া আমার সাথে রাগ দেখাচ্ছে। আমি বললাম ভাইয়া তুমি এমন করছ কেন, কী হয়েছে তোমার?
    সে বলে, একটা চুপি দিয়ে দেখে আয়, আব্বু আর আম্মু এখন কী করছে. যা।
    আমি পা টিপে গিয়ে চুপি দিলাম। দেখি, মা কফিতে টোস্ট ভিজিয়ে বাবার মুখে দিচ্ছে। আর হাসি হাসি মুখে কথা বলছে। দেখে রাগের চোটে আমি ফ্লোরে একটা উষ্ঠা মেরে চলে এলাম।

    ভাইয়া বলে, দেখছস, রাতে কেমন ঝগড়া করলো। এখন কেমন খাতির? আমাকে কেমন একটা বকা দিয়েছিল! মনে নেই? আর এখন? আয় আমরা তাঁদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেই, হে?
    আমরা গাল ফুলিয়ে বসে রইলাম।
    মা আমাদের জন্য কফি আর টোস্ট নিয়ে এসে পাশে বসলেন। ভাইয়া চেয়ার ঘুরিয়ে একদিকে আর আমিও মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে করে বসে রইলাম।
    আমাদের ভাব দেখে মা বাবার কাছে গিয়ে কি জানি ফিসফিস করে বলে আবার এলো। মা আমাদের আদর করে বললেন, শোনো তোমরা। রাগ করে তিন ঘণ্টার বেশি কথা না বললে ভীষণ পাপ হয়, নইলে আমি বুঝি এ ভদ্রলোকের সাথে কথা বলি?
    ভাইয়া খিচকি মেরে বলে, আব্বুকে বকা দিলে। আমাদেরও বকা দিলে। এভাবে ঝগড়া করে কমছেকম সাতদিন কথা বন্ধ থাকার কথা। আর তোমরা রাতে ঝগড়া করে সকালেই দেখি খাতির।
    মা আমাদের রাগ দেখে হাসতে হাসতে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেলেন।

    ভাইয়া দরজায় একটা কাগজ টানিয়ে দিল। তাতে লেখা আছে,
    ”আমাদের ঘরে ঝগড়াটে মহিলা ও ধূমপায়ী পুরুষের প্রবেশ নিষেধ”।

    মা দুধের বাটি নিয়ে দরজায় দাড়িয়ে লম্বা করে বললেন, মে আই কাম ইন স্যার?
    আমি বললাম, নো নো। গেট আউট। ভাইয়া বলে, নোটিশ দেখেন মেডাম, নোটিশ দেখেন।

    কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মা অনুমতি পেলেন না। হঠাৎ করে মা দৌড়ে এসে আমাদের ঝাপটে ধরে আদর করতে করতে বলছে, সরি, সরি, সরি মাই ডিয়ার চাইল্ড। আর এমনটি হবে না। নেও, এবার দুধ খাও।
    আমি বললাম, এখন যত আদরই করো আমরা খেতে পারবো না। রাগের চোটে গলায় কি জানি গুটি পাকিয়ে আছে। ঢোক গিলতে গেলে গলা ব্যথা করে। বুঝেছ এখন? তারপরেও মা আর বাবা আমাদের আদর করে খাইয়ে দিলেন।

    তবে ভাইয়া রেগেমেগে বললেন, আরেকদিন যদি খালি তোমাদের ঝগড়া করতে দেখি তো আমরাও ঝগড়া করবো। আমরা ঝগড়া করে বালিশ ছিঁড়ে সারা ঘরে তুলা ছড়িয়ে রাখবো। আমাদের মধ্যে কথা হবে না কমপক্ষে বাইশ দিন। তখন কিছু বলতে পারবে না, বলে দিলাম, হু।

    বাবা অফিস থেকে বাসায় দেরি করে এলেন। মা বললেন, এতো দেরি কেন আপনার? বাবা বলে নিউ মার্কেট গিয়েছিলাম।
    নিউ মার্কেটে কেনো?
    বাবা কিছু না বলে ব্রিফকেস থেকে একে একে বের করতে লাগল ইয়া বড় বড় সিগারেট। দেশ-বিদেশের যত পদের সিগারেট আছে সব কিনে এনেছেন। কোনটা মশলার তৈরি। কোনটা চিকন, কোনটা আবার ছয় ইঞ্চির মতো লম্বা, কোনটা মোটা সিগারেট। আমরা অবাক।

    বাবা বললেন, জীবনের শেষ টানা টানবো এই তিন দিন। আমাকে কিছু বলতে পারবে না তোমরা। মা তিন দিন সময় দিয়েছেন। এটা আমি ষোলোআনা কাজে লাগাবো। এমন খাওয়া খাবো, যাতে কোনদিন বলতে না হয়, আহারে, এই ব্র্যাণ্ডের সিগারেটটা তো খেলাম না!
    বাবা অনেক রাত পর্যন্ত বারান্দায় বসে এই সিগারেট টানেন।

    আজ তিনদিনের শেষ দিন। আজকেও আনলেন অনেক রকমের সিগারেট। এমনভাবে সিগারেট টানলেন যে, ঠিক রাত বারোটাও বাজল, বাবা সিগারেটে শেষ টান দিলেন।
    বাবা বললেন, তোমরা আমার পাশে এসে বসো। আজকে একটা ভাল সিদ্ধান্ত নেবো।
    আমরা হাসি হাসি ভাব নিয়ে বাবার দুপাশে গিয়ে বসলাম। মা-ও এলেন।
    বাবা খুব বিনয়ের সাথে বললেন, আজ আমি পবিত্র। তোমাদের সবার সামনে শপথ করে বলছি, আমি আর ধূমপান করবো না।

    দিলাম জোরে হাততালি।

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

অনেক দিন পর একটা ফালতু লেখা পড়লাম

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd>
  • Lines and paragraphs break automatically.

লেখা ফরম্যাট করার বিষয়ে আরো তথ্য

আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন