• মায়া হরিণের হাড়
    আহমদ রাজু

    যা হবার তা-তো হয়েই গেছে। এখন ইচ্ছে করলেও কিছু করার নেই। এই বীভৎস সময় থেকে ফেরার কোন পথ-ই তার সামনে খোলা নেই। অবশ্য ফিরে যাবার কথা সে যে মনে মনে ভাবেনি তা নয়, ভেবেছে। কোন উত্তর পায়নি। শেষ পর্যন্ত নিজেকে হার মানিয়ে কাজে মন দিতে হয়েছে সখিনা বেকারীর মালিক করিমুদ্দির।

    করিমুদ্দির বাড়ি কুমিল্লায়। সেখানে তার স্ত্রী, এক মেয়ে আর দুই ছেলে আছে। করিমুদ্দি বাসা ভাড়া করে থাকে মৌলবীবাজারে। এখানেই তার ব্যবসা। সখিনা বেকারীর খাদ্যসামগ্রী একনামেই চলে। সমগ্র জেলায় এর নাম ডাক বেশ। যে কারণে দুই ভাইকেও এই ব্যবসার কাজে লাগিয়েছে। যতই ব্যবসার পরিধি বাড়ুক না কেন, সে প্রতিদিন চাহিদামত মাল ডেলিভারী দিতে ব্যর্থ হয়। এ ব্যাপারে তার কোন দুঃখ নেই। তার বিশ্বাস, ভোক্তার চাহিদা পূরণ না করতে পারাটাও ব্যবসার একটা পলেসি। ছোট ভাই দুটো তাকে অনেকবার বুঝিয়েছে, লোকবল বাড়িয়ে বেশি মাল তৈরী করার জন্যে। করিমুদ্দির এক কথা- যেভাবে চলছে সেভাবেই চললে ভাল থাকবো।

    সখিনা বেকারীর পেছনেই সিমুদের বাড়ি। চতুর্থ স্বামীর কাছ থেকে তালাক নিয়ে বাবার বাড়িতে এসে উঠেছে গত মাসের মাঝামাঝি। কাবিন নামার তিন লক্ষ টাকা নগদ পেয়ে ছোট ভাইয়ের এ্যাকাউন্টে জমা রেখেছে সে। যখন প্রয়োজন হবে তখন ব্যাংক থেকে তুলে কাজে লাগানো যাবে।

    বেকার বাড়িতে বসে না থেকে আবার কলেজে ভর্তি হয় সিমু। নিয়মিত বেকারীর পাশ দিয়ে কলেজে যাওয়া আসার সুবাদে প্রতিদিন কথা হয় করিমুদ্দির সাথে। যে কথার কখনও অর্থ থাকে- কখনও থাকে না।

    করিমুদ্দিকে দেখে মনে হয় না তার ঘরে স্ত্রী-সন্তান আছে। কপালে ভাঁজ পড়েনি, চুলে পাক ধরেনি কিংবা রুক্ষ্ম হয়নি। সবসময় ফিটফাট হয়ে চলে সে। সকালে বেকারীতে আসার সময় যেভাবে চুলে ভাঁজ দিয়ে আসে ঠিক সেভাবেই চলে সারাটা দিন। সাদা শার্ট আর সাদা লুঙ্গি তাকে অন্যরকম করে রাখে। এমন অবস্থায় যে কেউ তাকে দেখে মুগ্ধ হবেই। অবশ্য সেটা বয়সের হিসাব না করেই দেখতে হবে।

    শীত বসন্তের সাথে পাল্লা দিয়ে সিমুকে নিয়ে মনে আশার জাল বুনতে থাকে করিমুদ্দি। তা যদি না হবে, তবে নিয়মিত কলেজ ছুটির সময় হলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকবে কেন সে? সবচেয়ে বড় বিষয়, আজ ভোর রাতে একটা স্বপ্ন করিমুদ্দিকে কঠোর অথচ বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। সে স্বপ্ন দেখে, একা জঙ্গলের পথ দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। আশেপাশে কেউ নেই। চারিদিক ঘন অন্ধকার। হঠাৎ একটা আলো তার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে দেখে, তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা মায়া হরিণ! হরিণটি তার নীল চোখে তাকিয়ে আছে করিমুদ্দির দিকে। করিমুদ্দি কিছু না ভেবেই জাপটিয়ে ধরে হরিণটাকে। কিঞ্চিৎ সুখ অনুভব করে করিমুদ্দি। সুখের আবেশে তার চোখ বন্ধ হয়ে যায়। চোখ খুলে দেখে হরিণটি নেই। শুধু তার হাতের মুঠোর ভেতর রয়েছে হরিণটির পাঁজড়ের একটি হাড়!

    করিমুদ্দির বিশ্বাস, এ স্বপ্ন তার নতুন জীবন শুরুর ইঙ্গিত দেয়। সেদিনই সে মনে মনে সিমুকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। সিমু কলেজ থেকে ফিরে যখন বেকারীর সামনে দিয়ে বাড়ির দিকে যায়, তখন করিমুদ্দি ডাক দেয়- একটু শোন সিমু।

    হাওয়া ব্রেকের গাড়িগুলো যেভাবে ব্রেক করে ঠিক সেভাবেই দাঁড়ায় সিমু। সে রসের স্বরে বলে, বলুন কী তব হুকুম?

    করিমুদ্দি এগিয়ে যায় সিমুর দিকে। তোমার সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। অবশ্য যদি সময় হয় তোমার।

    বুকের ওপর সিল্কের ওড়না নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে সিমুর। সে ওড়নাটা ঠিক করতে করতে বলল, আপনি আমার সাথে কথা বলবেন, এটাতো আমার সৌভাগ্য। আপনার জন্যে আমি যে-কোন ভাবে, যে-কোন পরিস্থিতিতে সময় বের করতে পারি। সবচেয়ে ভাল হয়, আমাদের বাড়িতে এলে। সবাই আজ ছোট খালার বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেছে।

    করিমুদ্দি এমন একটা সময়ের অপেক্ষায় ছিল মনে মনে। তারপরও সে লাজুক ভাব প্রকাশ করে বলল, কেউ যখন বাড়িতে নেই তখন আমার সেখানে যাওয়া কি ঠিক হবে?
    - খুব হবে। আপনি নিশ্চয় আসবেন। বলুন কখন আসবেন?

    সিমু বুঝতে পারে করিমুদ্দির মনের অবস্থা। সে তাকে কী বলবে তা আঁচ করতে পারে। তবুও সে-কথা শোনার অপেক্ষায় আছে সিমু। বলল, কোন কথা শুনতে চাইনা; আপনি বিকেল ঠিক পাঁচটায় কিন্তু আমাদের ওখানে আসছেন। 'আমি অপেক্ষায় থাকবো' বলে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় সিমু।

    করিমুদ্দি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। ভোরের স্বপ্নের সাথে এখনকার কথার সম্পূর্ণ মিল লক্ষ্য করে সে। স্বপ্ন দেখেছিল ভোর পাঁচটার দিকে। আর সিমু তাকে যেতে বলেছে বিকেল পাঁচটায়।

    ছোট ভাইকে বেকারীর কাজ বুঝিয়ে দিয়ে করিমুদ্দি যখন সিমুদের বাড়িতে উপস্থিত হয়, সিমু তখন ঘরের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে সবেমাত্র। করিমুদ্দিকে দেখে সিমুর মুখে এক ঝলক হাসি খেলে যায়। বলল, বাব্বা; এই গরীবদের বাড়িতে হাতির পাড়া!

    করিমুদ্দি হেসে বলল, ভুল বললে। আসলে জেব্রার বাড়িতে হাতির পাড়া বলতে পারো।

    -আপনার সাথে কথায় পারা যাবে না। দাঁড়িয়ে থাকবেন, নাকি এই গরীবদের ঘরে যেয়ে বসবেন?

    করিমুদ্দি ইতস্তত হয়ে বলল, বাড়িতে কেউ নেই। এই অবস্থায় একজন যুবতীর ঘরে যাওয়া কী ঠিক হবে...। কথা শেষ না হতেই সিমু করিমুদ্দির হাত চেপে ধরে ঘরের দিকে টেনে নিয়ে বলল, ফাজলামো হচ্ছে তাই না? চলেন।

    সিমু করিমুদ্দিকে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়। খাটের ওপর বসতে বসতে করিমুদ্দি বলল, তুমিতো দিন দিন আরো সুন্দর হয়ে উঠছো। ব্যাপার কী?

    সিমু চোখ ঘুরিয়ে বলল, ব্যাপারতো অবশ্যই আছে।
    - কী ব্যাপার?
    - যে মন বোঝেনা, তাকে বলে কি লাভ?
    - মন বুঝিনা বলেইতো বেকারীর কাজ ফেলে সুন্দরীর টানে চলে এসেছি।
    - আপনার ঘরেতো বউ আছে-সন্তান আছে?
    - তাতে কী। তুমি চাইলে আমি তোমাকে বিয়ে করবো।
    - বউ-বাচ্চা থাকতেও আমাকে বিয়ে করবেন? তারা কিছু বলবে না?
    - কী বলবে? আমি কাউকে ধারি না ধারাইও না। আমি যা বলবো তাই হবে। তাছাড়া তারা আছে কুমিল্লায়। তুমি থাকবে এখানে। আমার ব্যবসা বাণিজ্য যেহেতু এখানে। সে কারণে তোমার কাছ থেকে অন্য কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়।
    - কেন? বিস্ময় ভরা চোখে প্রশ্ন করে সিমু।
    - কারণ ব্যবসার বিস্তার মৌলভীবাজারে। কুমিল্লায় গেলে কোনভাবেই এই ব্যবসা দাঁড় করানো সম্ভব নয়। এই কারণে তোমাকে ছেড়ে আমার কোথাও যাওয়া হবে না কোনদিন।

    সিমু মনে মনে ভাবে, করিমুদ্দি দেখতেতো খারাপ না। বয়স একটু বেশি হলে কি হবে, দেখে বোঝার উপায় নেই। স্ত্রী-সন্তান থাকলেও কোন অসুবিধা নেই। তার নিজেরওতো আগে চারটা বিয়ে হয়েছিল। সে অনেক ভেবে বলল, দেখ তুমি যা ভালো মনে করো।

    করিমুদ্দি নিজেকে সামলিয়ে রাখতে পারে না। ক্ষণে ক্ষণে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সিমুর মুখ। তাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবনায় আসে না। সময় যত পার হয় ততই সিমুর জন্যে মন উতলা হয়ে উঠে। সে জানে, সিমুকে বিয়ে করার কথা বললে কেউই রাজী হবে না। বিশেষ করে দুই ভাই আর মা’তো না-ই। বরং যাতে বিয়েটা না হয় তার জন্যে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। যে কারণে কাউকে না জানিয়ে সিমুকে কাজী অফিসে নিয়ে বিয়ে করে গভীর রাতে ঘরে এনে তোলে করিমুদ্দি।

    বাড়িটা ষোল রুমের। তার চারটি ভাড়া নিয়েছে করিমুদ্দি। বাইরে থেকে বাড়িটাকে দেখলে পছন্দ না হওয়াটা-ই স্বাভাবিক। রেল লাইনের মত বারান্দা। ঘরগুলো তার দুইপাশে। সারি সারি ঘর থাকায় মাঝখানে থাকা বারান্দায় বেশি আলো আসে না। যা আসে তার অধিকাংশ ঘরের জানালা কিংবা দরজা দিয়ে আসা আলো।

    নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে করিমুদ্দি তার নিজের রুমের তালা খুলে ভেতরে নিয়ে যায় সিমুকে। দরজা বন্ধ করতে করতে সিমুকে উদ্দেশ্য করে বলল, তোমার কিছু লাগলে বলো; মাকে ডাকি?

    করিমুদ্দির হাত টেনে ধরে সিমু। বলল, না থাক; কিছু লাগবে না। এত রাতে মাকে জাগানোর দরকার নেই।

    করিমুদ্দি বলল, বালিশতো একটা।
    - তাতে কী হয়েছে? আমি তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাবো।
    সিমুর এমন হৃদয় ছোঁয়া কথায় মনে দোলা লাগে করিমুদ্দির। সে আগামীর সুখের সাগরে ভাসতে শুরু করে। সিমুর পাশে বসে আগলে নেয় তার সিমুকে।

    বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে সকাল হতে না হতেই সিমু আর করিমুদ্দির বিয়ের খবর প্রচার হয়ে যায়। আশেপাশের উৎসুক লোকজন ছুটে আসে সত্য মিথ্যা যাচাই করার জন্যে। তারা নিজের চোখে দেখে বিভিন্ন রকম মন্তব্য করতে করতে ফিরে যায় - যার যার কাজে। এলাকাবাসীর ধারণা, রেকর্ড অনুযায়ী সিমুর এ বিয়েও বেশি দিন টিকবে না। শেষে কাবিনের টাকা নিয়ে আবার বাবার বাড়িতে ফিরে যাবে। করিমুদ্দির ব্যবসার বারোটা বাজলো! সে দুই বউ আর ব্যবসা সামলাতে যেয়ে পাগল হয়ে যাবে; ইত্যাদি ইত্যাদি।

    করিমুদ্দির ছোট দুই ভাই ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা বড় ভাইয়ের এহেন কর্মে বিস্মিত। হাজার হলেও বড় ভাই। তাকে কী বলা যায়, তাদের পক্ষে। কিছুই বুঝতে পারেনা তারা। জেনে শুনে তাদের ভাই কেন এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করলো? যে মেয়ে চার চারটা সংসার ছাড়তে পারে; সেই মেয়ের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানলো তাদের বড় ভাই! যাকে দেখে তারা শিখবে নীতি-আদর্শ। মনের ক্ষোভ মনে রেখে তারা বেকারীতে চলে যায়।

    করিমুদ্দির বৃদ্ধ মা সুখবান যখন থেকে চোখের জল ফেলছে তখনও পূবের সূর্য ওঠেনি। পাহাড়ের গা বেয়ে উপরের দিকে ওঠা বাঁশ ঝাড়ের পাখিরা সবেমাত্র জেগেছিল তখন। তার ছেলে এমন একটা ভুল করবে তা সে কোনদিন ভাবতেও পারেনি। কী ভুলইনা করেছে তার ছেলে! এমন ভুল শোধরানো কোনদিন কি তার ছেলের পক্ষে সম্ভব? নিজেকে প্রশ্ন করে কোন উত্তর খুঁজে পায়না সুখবান। সে করিমুদ্দির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে অশ্রু-সজল চোখে বলল, কী রে বাপ? এই ভুলটা তুই ক্যান করলি? একবারও তোর বউ-বাচ্চাদের কথা মনে হয়নি?

    করিমুদ্দি কোন কথা বলে না। সে নিশ্চুপ বোকার মত খাটের ওপর বসে থাকে; যেখানে সিমু বউ সেজে বসে আছে। চোখ তার নিচের দিকে।

    সুখবান শাড়ির আঁচল দিয়ে নাক ও বয়স্ক চোখের জল মুছে বলল, শোন বাপ, একটা কথা তোকে বলি। কাউকে কষ্ট দিয়ে সুখী হওয়া যায় না। ছোট ছোট বাচ্চারা তোর কাছে কী দোষ করেছিল। এটা তুই মোটেও ঠিক করিসনি বাপ।

    করিমুদ্দির বিয়ের খবরে বড় বউ সখিনা দুই-চারদিন কেঁদে কেঁদে বুক ভাসালেও এখন আর ওসব নিয়ে ভাবেনা। সে বুঝে গেছে, শুধু শুধু কেঁদে কোন লাভ নেই। সে যখন তার কথা-সন্তানদের কথা না ভেবে আর একটা বিয়ে করতে পারে; তার জন্যে আর যা-ই হোক অন্তত, কেঁদে কেঁদে বুক ভাসানোকে বোকামী মনে হয় সখিনার।

    ছেলে-মেয়েরা মাঝে মাঝে বাবার জন্যে কেঁদে ওঠে। তাদের বাবাকে দেখেনি অনেকদিন। কেউ কেউ বলে, তোদের বাবা আর কোনদিন ফিরবে না। সে তোদের ভুলে গেছে। মৌলবীবাজারে আর একটা বিয়ে করেছে, ইত্যাদি ইদ্যাদি।

    দেখতে দেখতে চার বছর পার হয়ে যায়। এই স্বল্প সময়ে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুর। পরিবর্তন হয়েছে রাষ্ট্রের-পরিবর্তন হয়েছে করিমুদ্দির সংসারের। তার সংসারে দু’জন নতুন অতিথির আগমন ঘটেছে। বড় মেয়ের বয়স তিন বছর আর ছোট মেয়ের বয়স এক বছর পূর্ণ হতে আরো এক মাস বাকী। প্রথম দিকে সংসারে প্রথাগতভাবে খুঁটিনাটি মান-অভিমান থাকলেও বেশ চলে যাচ্ছিল সিমু-করিমুদ্দির সংসার। বড় মেয়ে পৃথিবীর আলো দেখার পর থেকে শুরু হয় অশান্তির আগুন। সিমুর সাফ কথা, বড় বউ আর ওখানকার বাচ্চাদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখা যাবে না। করিমুদ্দি পারে না ছোট বউয়ের কথা রাখতে। সে সময় পেলেই ছুটে যায় বড় বউয়ের কাছে - সন্তানদের কাছে।

    সিমু যখন জানতে পারে তার স্বামী বড় বউয়ের সাথে দেখা করতে গেছে, তখন শুরু হয় ঘরের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভাংচুর। টিভি ভাঙে, ফ্রিজ ভাঙে, সোকেচ ভাঙে, ফ্লাক্স ভাঙে। কেউ ঠেকাতে গেলে তাকে সিমুর হাতে মার খেতে হয়; নয়তো গালিগালাজ। করিমুদ্দির বৃদ্ধ মা সুখবান তার বৌমাকে ঠেকাতে যেয়ে অনেকবার মার খেয়েছে। কোনদিন প্রতিবাদ করেনি। আর করবে ই-বা কি করে? বয়স তার অধিকার খর্ব করে রেখেছে। তাছাড়া বড় ছেলের কাছে কোন কথা বলে লাভ নেই। সে তার বউকে কিছুই বলবে না। ছোট ছেলে দুটোকে বলা আর না বলা সমান। তারা সিমুকে প্রচণ্ড ভয় পায়। ভয় পাবার কারণও আছে। তারাও যে ভাবীকে ঠেকাতে যেয়ে মার খায়নি তা বলা যাবে না।

    ইদানিং প্রতিবাদের নতুন নিয়ম শুরু করেছে সিমু। কিছু হলেই ঘরের দরজা বন্ধ করে জিনিসপত্র ভাঙে সে। তাতে নিজের শরীর ক্ষত বিক্ষত হলেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনা। যা চলে অনেক রাত অবধি। মেয়ে দুটো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেলেও দরজা খোলে না সিমু। পাশের ভাড়াটিয়ারা দু’একজন এগিয়ে আসলেও কোন কাজ হয় না। তারা এসে দরজা খোলার জন্যে অনেক ডাকাডাকি করলেও দরজা খোলে না। সে নিয়মতান্ত্রিকভাবে শব্দ করে কেঁদে কেঁদে জিনিসপত্র ভাঙতে থাকে আপন মনে।

    করিমুদ্দি বরাবরই রাত করে বাসায় ফেরে বেকারী থেকে। বাড়িতে বউয়ের এই লঙ্কাকাণ্ডের কথা জেনেও না জানার ভান করে দরজায় এসে ডাক দেয়, সিমু দরজা খোল।

    ঘরের ভেতর থেকে কোন উত্তর আসে না। শুধু কিছু একটা ভাঙার শব্দ বের হয়। শব্দ শুনে করিমুদ্দি আবারো বলে ওঠে, সিমু ঘুমিয়ে পড়েছো নাকি? দরজা খোল সিমু-দরজা খোল।

    করিমুদ্দির কথায় শেষ পর্যন্ত দরজা খোলে সিমু। তখন হয়তো সিমু করিমুদ্দির গায়ে হাত তোলে, নয়তো বিশ্রি ভাষায় গালিগালাজ করে ক্ষ্যান্ত হয়।

    বড় ছেলের অসুখের কথা শুনে সকালেই কুমিল্লায় রওনা হয় করিমুদ্দি। খবরটা সিমুর কানে যেতে বেশি দেরি হয়না। সে শুনেই রাগে জ্বলে ওঠে। আজ সে আসুক বাড়ি। হয় সে থাকবে নয়তো আমি থাকবো। মনে মনে ভাবে সিমু। চাপা কষ্ট আর রাগ মনের ভেতর পুষে রাখতে পারে না। সে ঘরের ভেতর যেয়ে দরজা বন্ধ করে শব্দ করে কেঁদে ওঠে। সে কান্নার ভেতরে শুরু হয় নতুন শব্দের উৎপত্তি। প্রথমে ভাঙা শুরু করে গত সপ্তাহে কেনা ফ্রিজ দিয়ে। আজ তার প্রতিজ্ঞা ঘরের সবকিছু ভেঙে তছনছ করে ছাড়বে।

    মেয়ে দুটো বাইরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিরামহীন কেঁদে চলে। ছোট মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দরজার সামনে অজ্ঞান হয়ে যায়। করিমুদ্দির বৃদ্ধ মা সুখবান দৌঁড়ে এসে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খায় আর আল্লাহকে দোষারোপ করে- এই অবুঝ বাচ্চা দুটো তোমার কাছে কী অপরাধ করেছে? কেন তাদের এত কষ্ট দিচ্ছ? তবে কী তুমিও আমার মত বুড়ো হয়ে গ্যাছো? ক্ষণিক হেসে ওঠে সে। ভালোই হলো, আমার যেমন সবকিছু দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই, তোমারও তাই। নিজের অজান্তে বৃদ্ধার কোটরের ভেতরে থাকা চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

    ছোট মেয়ের জ্ঞান ফিরলে আবারো মায়ের জন্যে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি আর নাকের পানি এক সাথে মিশে এক অন্য অবস্থার সৃষ্টি করে। বৃদ্ধ সুখবান মেয়েটাকে শান্ত করতে প্রাণপণ বৃথা চেষ্টা করে। কিছুতেই সে সফল হয় না। সে পেছনের সবকিছু ভুলে দরজায় ধাক্কা দেয়, বৌমা, ও বৌমা। দরজা খোল। বাচ্চা দুটোযে কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হয়ে গেলো! এই অবুঝ বাচ্চাদের ওপর একটু দয়া করো। বৌমা, ও বৌমা।

    সিমুর কোন দয়া হয় না। দরজা খোলে না। সে ঘরের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে শব্দ করে কেঁদে ওঠে আর সোকেচ ভাঙে-আলমারী ভাঙে।

    বৃদ্ধ সুখবান ছোট মেয়েকে ডান হাত দিয়ে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে; আর বড় মেয়েকে বাম হাত দিয়ে ধরে নিয়ে যায় পাশের ঘরের ভাড়াটিয়া আসাদের কাছে।

    ঘরের দরজায় বৃদ্ধ সুখবানকে দেখে আসাদ জিজ্ঞেস করে, চাচীমা আপনার বৌমা দরজা খোলেনি?
    - না বাপ। অনেক চেষ্টা করলাম। খুললোনা। তুমি একটু দেখবে দরজাটা খোলাতে পারো কিনা?
    - না চাচীমা; আমাকে ঐ অনুরোধটা করবেন না। আপনার বৌমাকেতো আমি চিনি। তাকে ডাকাতো দূরে থাক, তার ঘরের দরজার সামনে দিয়ে যেতেও ভয় লাগে।

    কোলের বাচ্চাটা সুখবানের ঘাড়ের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। সুখবান বাচ্চার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তোদের পৃথিবীতে আসা-ই ভুল হয়েছে।

    - খেয়েছে কিছু বাচ্চা দুটো? প্রশ্ন আসাদের।
    - সেই দুপুর থেকে কেঁদে চলেছে ওরা। বড়টাকে যা একটু খাওয়াতে পেরেছি। এইটা মায়ের দুধ ছাড়া কিছুই মুখে দেবে না। আমি যে কী করি? চোখে জল এসে যায় সুখবানের। সৃষ্টিকর্তার কাছে বলে কোন লাভ হবে না জেনে মনের কষ্ট মনে পুষে রাখে সে। আসাদকে উদ্দেশ্য করে বলল, আমার একটা কাজ করে দেবে বাপ? আমিযে এই বাচ্চাদুটোর কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।

    আসাদ তার এক বছর বয়সী ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে ছিল। ছেলের মাথার চুলের ভেতর হাত বুলাতে বুলাতে বলল, বলেন চাচী, কী বলবেন?

    সুখবান করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, তুমি যদি বাড়িওয়ালাকে একটু ডেকে আনতে, তাহলে ভাল হয়। ওনার ডাক শুনে বৌমা ঠিকই দরজা খুলবে। আমার হাজার ডাকেও সে দরজা খুলবে না।

    আসাদ খাটের কোনায় বালিশের নিচে রাখা মোবাইলটা টেনে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে দেখে রাত এগারোটা। সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বউয়ের কোলে ছেলেকে দিয়ে বলল, মার কাছে থাকো বাবা আসি আসছি। ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আসাদ।

    বাড়িওয়ালা একজন বৃদ্ধা মহিলা। সে এই বাড়িটা সম্পূর্ণ ভাড়া দিয়ে নিজে থাকে পুরোনো বাড়িতে। তার ছেলেরা সব বিদেশে থাকে। এখানে তাকে দেখাশুনা করার জন্য একজন মহিলা আর একজন পুরুষ মাসিক চুক্তিতে রাখা আছে। তারা সবসময় এই বৃদ্ধা মহিলাকে দেখাশুনা করে।

    ভাড়া বাড়ি থেকে নিজের বাড়ির দূরত্ব দুই/তিনশো গজ মাত্র। বৃদ্ধার বাড়িতে যেয়ে তাকে ডেকে নিয়ে আসতে আসাদের বেশি সময় লাগে না। বৃদ্ধা এসে দরজায় ধাক্কা দেয়। সিমু বলে ডাক দিতেই সিমু কাঁদতে কাঁদতে দরজা খোলে।

    ঘরের ভেতর একনজর চোখ দিয়েই বোঝা যায়, শক্তিশালী সাইক্লোন বয়ে গেছে এই ঘরের ভেতর দিয়ে। কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই ভাঙতে-ছিঁটোতে।

    দরজায় দাঁড়ানো বাড়িওয়ালা বৃদ্ধাকে দেখে সিমু কান্নার মাত্রা একটু বাড়িয়ে বলল, আমার আর বাঁচার সাধ নেই কাকীমা। আমি আর বাঁচতে চাইনা।

    বৃদ্ধা সিমুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, কী হয়েছে আমাকে বলতে পারতিস। এভাবে সারাদিন কেঁদে কেঁদে নিজে কষ্ট পেয়েছিস আর এই অবুঝ বাচ্চাদেরও কষ্ট দিয়েছিস। তোদের এই সমস্যার জন্যে এই নিষ্পাপ সন্তানদের কষ্ট দিচ্ছিস কেন?

    সিমু কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় করিমুদ্দি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করায় সে কথা বলা বন্ধ করে। করিমুদ্দি এগিয়ে এসে বলল, কী হয়েছে সিমু? ঘর এলোমেলো কেন?

    সিমু কোন কথা বলে না।

    করিমুদ্দি বাড়িওয়ালা বৃদ্ধাকে উদ্দেশ্য করে বলল, কাকীমা কি হয়েছে বলুনতো? আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না।

    - আমিওতো কিছুই জানিনা। শুনলাম সিমু সেই দুপুর থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে কান্নাকাটি করছে। তাইতো বাধ্য হয়ে এই মাঝ রাতে আমাকে আসতে হলো।

    করিমুদ্দি উদ্রেক উৎকণ্ঠা জড়িত কণ্ঠে বলল, কি হয়েছে সিমু, আমাকে বলো?

    - কে কী বলবে? তুই কোথায় ছিলি সারাদিন? পুরোনো বউয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলি? আমাকে কাঁদিয়ে তুই বড় বউ নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকবি আমি তা কোনদিন হতে দেবো না। উত্তেজিত হয়ে ওঠে সিমু।

    - আমিতো বাজারেই ছিলাম...। কথা শেষ না হতেই সিমু খাটের নিচে থাকা দা এনে কোপ দেয় করিমুদ্দির হাতে। দ্বিতীয়বার কোপ দিতে উদ্যত হলে পাশের ভাড়াটিয়ারা এসে তার হাত থেকে দা কেড়ে নেয়।

    দায়ের কোপে অনেকখানি কেটে যায় করিমুদ্দির হাত। সেখান দিয়ে দরদর করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মেঝেয়। আসাদ করিমুদ্দির ক্ষতস্থান টিঁপে ধরে নিয়ে যায় তার ঘরে। ঘরে থাকা স্যাভলন দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে মলম লাগিয়ে দেয়। পুরোনো শাড়ীর টুকরো দিয়ে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা হয় সেখানে।

    করিমুদ্দি একটু পরেই আসাদের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে যায়। সিমু খাটের ওপর বসেছিল। করিমুদ্দি তার পাশে যেয়ে বসে। মেয়ে দু’টো যত্রতত্র ঘুমিয়ে আছে খাটের ওপর। করিমুদ্দি একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা ভুলে সিমুকে উদ্দেশ্য করে বলল, এত মাথা খারাপ করলে চলে। আমি তোমাকে সত্যি কষ্ট দিতে চাইনা; কখনও চাইনা।

    সিমু করিমুদ্দির দিকে ঘুরে বসে। মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল, তোমার ভালবাসার ভাগ আমি কাউকে কোনদিন দিতে পারবো না; কল্পনাও করিনা।

    সকালের আলো ঘরে পৌঁছানোর আগেই দু’জনের মাঝে শুরু হয় কথা কাটাকাটি। রাতে ভালবাসার কথা-ভাললাগার কথা ভুলে যায় তারা। পূবের সূর্যটা যখন তরতর করে পশ্চিম দিকে আসছিল তখন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি স্বঃপ্রণোদিত হয়ে উপস্থিত হয় করিমুদ্দির উঠানে। অবশ্য তারা যে সেখানে শুধু নিজ উদ্যোগে এসেছে এটা ঠিক নয়। তার একটা বড় কারণ, এই একটা পরিবারের জন্যে অন্য ভাড়াটিয়ারা অশান্তিতে আছে। রাত-বিরাত ঘুমের ব্যাঘাৎ হচ্ছে। তাছাড়া কলহ-বিবাদে এলাকার পরিবেশটা যে নষ্ট হচ্ছেনা তা নয়।

    করিমুদ্দির বুঝতে বাকি থাকেনা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আসার কারণ। সে মনে মনে এমনই চেয়েছিল। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। সিমুর পাগলামি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিন করিমুদ্দি আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে চেয়েছিল। পারেনি তার আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে। সে না থাকলে ছেলে-মেয়েদের দেখবে কে? আর বড় বউ সখিনাতো কোন দোষ করেনি। সে কেন করিমুদ্দির জন্যে আজীবন কষ্ট বয়ে বেড়াবে?

    সিমুর স্পষ্ট কথা, তার নামে শহরে জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে দিতে হবে। করিমুদ্দিকে নিয়ে বিশ্বাস নেই। সে যে কোন সময় বড় বউয়ের কাছে চলে যেতে পারে।

    সালিশের ভেতর থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার নামে বাড়ি বানিয়ে দিলে তুমিযে করিমুদ্দিকে ছেড়ে চলে যাবেনা তার কী গ্যারান্টি আছে? আগেতো চার চারজনের সাথে এমন কাজ করে এসেছো?

    সিমু এমন কথা শুনে থতমত খেয়ে যায়। সে মনে বল রেখে গম্ভীর সুরে বলল, মানুষ চিরদিন এক রকম থাকে না। আমি আমার অতীতকে ভুলে গেছি। বাচ্চাদের কথা মনে করে আমি অন্য কিছু ভাবি না।

    বাজার কমিটির সভাপতি আজমল খান প্রশ্ন করে, তাই যদি হয় তবে এত দাঙ্গা হাঙ্গামা হয় কেন?
    - হাঙ্গামা হবেনাতো কি? তারে বারবার বলছি শহরে আমার নামে জায়গা কিনে বাড়ি বানিয়ে দিতে; কানেই নেয় না।

    আজমল খান বলল, সে দিচ্ছে না কারণ হয়তো টাকা পয়সার সংকট। তোমারতো টাকা আছে; সেই টাকা দিয়েতো বানাতে পারো।
    - আমি টাকা কোথায় পাবো? উল্টো প্রশ্ন করে সিমু।
    - মাস দুই আগেইতো চতুর্থ স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া তিন লক্ষ টাকা আদায় করেছো নিজের ভাইয়ের নামে মামলা করে। উত্তেজিত হয়ে ওঠে আজমল খান।

    টাকার লোভ কী না করে। কথায় আছে “টাকার লোভে কাঠের পুতুলও হা করে”। এখানে কাঠের পুতুল নয় সত্যিকারে মানুষের কথা বলা হচ্ছে। সিমুর চতুর্থ স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পর কাবিন নামার নগদ তিন লক্ষ টাকা পেয়েছিল। সিমু সেই টাকা ছোট ভাইয়ের একাউন্টে জমা রাখে।
    সম্প্রতি সেই টাকা তুলে দেবার জন্যে চাপ দিলে সিমুকে আজ কাল বলে ঘুরাতে থাকে। সিমু বাধ্য হয়ে ভাইয়ের নামে মামলা দায়ের করলে পুলিশ এসে দুই ভাইকেই ধরে নিয়ে যায়। পরেরদিন টাকা ফেরত দেবার প্রতিশ্র“তি দিলে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। ছাড়া পেয়ে সিমুর সমস্ত টাকা তারা ব্যাংক থেকে তুলে দেয়। আর সিমুকে তাদের বোন বলে পরিচয় না দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই থেকে তাদের সাথে সিমুর যোগাযোগ বন্ধ।

    শালিসে দু’একজন সিমুর বিরুদ্ধে কথা বললেও অনেকেই সংসারের কথা বিবেচনা করে করিমুদ্দিকে বলে শহরে তার নামে জমি কিনে বাড়ি তৈরী করে দেবার জন্যে।

    এমন এক তরফা বিচারকে মেনে নিতে পারেনা করিমুদ্দি। তার ধারণা সিমু এই এলাকার মেয়ে। সেজন্যে এলাকার লোকের তার প্রতি টান থাকবেই। সে হাজার অপরাধ করলেও তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে না। সেই অপরাধীর ইচ্ছাই প্রাধান্য পাবে তার এলাকার সমাজ-সংসারে।

    মনের মাঝে অনেক কথার উদয় হয় করিমুদ্দির। একবার ভেবেছিল সংসার নামক যাঁতাকলে নিষ্পেসিত হবার চেয়ে সিমুর দাবী পূরণ করাই উত্তম। আবার ভাবে, এত টাকা খরচ করে তার দাবী পূরণ করলে সে যে আবার অন্য কোথাও চলে যাবে না তা-ইবা কে বলতে পারে। পাহাড়ে হেলান দিয়ে সময়ের সোনালী সূর্যটা দাঁড়িয়ে আছে পূব আকাশে। ঘাসের ওপর থেকে শিশির বিন্দু তখনও শুকায়নি। করিমুদ্দি একা একা নিশ্চুপ ঘর থেকে বের হয়ে শুকনো পাতায় ছাওয়া পথ ধরে। যে পথে সে একদিন ছুঁয়েছিল মায়া হরিণের হাড়।

    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১২

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন