• হার মানা হার - ২
    যুথিকা বড়ুয়া

    (দুই)

    [আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন হার মানা হার - ১]

    ছোটবেলা থেকেই জয়ন্তী যেমন একরোখা ধীর-স্থীর-গম্ভীর, তেমনি বিদ্রোহী গোছের মন-মানসিকতার। সব ব্যাপারে ওর আপত্তি, অভিযোগ, বিরোধিতা। সামান্য খুঁটিনাটি বিষয়েই সাংঘাতিক চটে যেতো। একদম মিলিটারীর মতো ছিলো ওর মেজাজ। নাকের সামনে দিয়ে একটা মাছি পর্যন্ত কখনো উড়ে যেতে পারতো না। বিরল সেণ্টিমেণ্টাল। অনমনীয় জেদ। বিয়ে সে কখনোই করবে না। অথচ সবসময় নিজের ইচ্ছা এবং চাওয়া হাসিল করে নেওয়াই ছিলো জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। বিশেষ করে সৃষ্টিশীলতার তাগিদে মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে, অন্যের করুণায় নির্ভরশীল হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকাকে কখনোই সমর্থন করতো না। কিন্তু অধ্যাপক পিতা-মাতার শাসন ও শিক্ষায় বেড়ে ওঠা জয়ন্তীর জীবনের উদ্দেশ্য বড়ো হওয়া, সৎ হওয়া এবং মহৎ হওয়া। চেয়েছিলো মাতা-পিতার স্নেহ-মমতার ছত্রছায়া থেকে সড়ে এসে নিজস্ব মাটিতে শক্ত পায়ে দাঁড়াতে, উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন সুপ্রতিষ্ঠায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে, স্বাবলম্বী হতে। চেয়েছিলো নিজের মান-মর্যাদা, আত্মসম্মান বজায় রেখে বন্ধনহীন, চিন্তাহীন, মুক্ত-বিহঙ্গের মতো স্বাধীনভাবে জীবনের সব জটিলতা থেকে বেরিয়ে নির্ভেজালভাবে বেঁচে থাকতে। পুরুষ শাসিত সমাজে পূর্ণ মান-মর্যাদায় সমান অধিকারের তালিকাভুক্ত হয়ে পুরুষের সাথে তালে তাল মিলিয়ে একই পদক্ষেপে এগিয়ে চলতে। জীবনে কখনো হার মানেনি জয়ন্তী, হার মানতে শেখেনি। ওর একমাত্র আকাঙ্খা মা-বাবার ইচ্ছা ও স্বপ্নকে যথাযথভাবে পূরণ করা, সার্থক করে তোলা - জীবনে সফলতা অর্জন করা।

    সেই উচ্চাকাঙ্খী স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়িত করতে দৃঢ় মনের অধিকারী জয়ন্তী উচ্চশিক্ষা গ্রহণে পদার্পণ করে দিল্লীর জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটিতে, যেখানে উজ্জ্বল গৌরবর্ণের সুঠাম সুদর্শন বুদ্ধিদ্বীপ্ত তরুণ লেকচারার শুভেন্দুকে ও প্রথম দেখেছিলো। সেখানেই লেডিস হোষ্টেলে থেকে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দিবানিশি নিমগ্ন হয়ে ডুবে থাকতো বিদ্যার অথৈ সাগরে। হাসি-মশকরা, আনন্দ-কোলাহল কোনকিছুতেই ওর উৎসাহ ছিলো না, আগ্রহ ছিলো না। একদম নিরস, বেরসিক। অথচ তখন ওর সুকোমল যৌবনের প্রথম প্রহর। যেন বাঁধ-ভাঙ্গা উত্তাল যৌবন। কি চমকপ্রদ রূপ, রং, লাবণ্য, শরীরের গড়ন। যেন সৌন্দর্য্যের প্রতীক পারিজাত। চির অম্লান, চির সজীব, শান্ত-স্নিগ্ধ-কোমনীয় নব যৌবন সম্পন্না এক উদ্বিগ্ন অনন্যা। বিধাতা যেন অকৃপণ হাতে অসামান্য নৈপুণ্যে ওকে গড়েছিলেন।

    কথায় বলে,-‘যার বিয়ে তার হুঁশ নেই, পাড়া-পড়শির ঘুম নেই!’ ভেবে-ভেবে অস্থির হয়ে উঠতো ওর সহপাঠীরা। কেউ কেউ উপহাস করে বলতো,-‘বালিকা  ব্রহ্মচারী!’ আবার কেউ কেউ ওর রূপের বর্ণনা দিয়ে মন্তব্য করতো,-‘পরিণত বয়সে জীবনকে উপভোগ করবার উপযুক্ত সময়ে তারুণ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে গৃহত্যাগী সাধু-সন্তদের মতো এতখানি আত্মসংযমী হয় কী করে! আবেগ অনুভূতিও কি নেই ওর শরীরে? জীবনের কোনো স্পৃহাই কি ওর নেই?

    কিন্তু আবেগ-অনুভূতিহীন নিরস নিরুচ্ছাস, নিষ্প্রেম জয়ন্তীর ধূসর মরুভূমির মতো হৃদয়াকাশেও যে একদিন ভালোবাসার গ্রহণ লাগবে, প্রেমের পত্তন ঘটবে, তা কে জানতো!

    সেদিন ছিল ২৫শে বৈশাখ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিবস। এ-উপলক্ষ্যে সকাল থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের আনাগোনা। ইউনিভার্সিটির অডিটোরিয়ামে পূর্ণদ্যোমে প্রস্তুতি চলছিলো - এক মনোজ্ঞ সঙ্গীতানুষ্ঠানের বিশাল আয়োজন। ছাত্র-ছাত্রীরা সকলেই ব্যস্ত। তার মাঝেই কেউ কেউ চড়ুইভাতির আনন্দে মেতে ওঠে। সুরের মূর্ছনায় রোজ-গার্ডেন গমগম করছে। রেকর্ডে বাজছে রবীন্দ্রসঙ্গীত আর লোকগীতি। সবাই আনন্দ উপভোগে মশগুল। একমাত্র জয়ন্তীই ব্যতিক্রম। একটু ভিন্ন ধরণের। সহজে ধরা দেয় না বন্ধু মহলে। এমনিতেই কথা কম বলা ওর অভ্যেস। কোয়ায়েট থাকতে ভালোবাসে। মহিলাঙ্গনের কোনো ভূমিকা পালন করা কিংবা দায়িত্ব গ্রহণ করা, অথিতিদের অভ্যর্থনা করা, তাদের সাথে অন্তরঙ্গভাবে মেলামেশা বা সৌজন্যমূলক কুশল বিনিময় - ওসব কোনোটিই ওর ধাতে নেই। এক কথায় নিজেকে সর্বত্র গুটিয়ে রাখাই ওর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।

    পাশের একটি উঁচু ঢিবির উপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে ছাত্রছাত্রীদের কাণ্ড দেখছিলো জয়ন্তী। প্রফেসর শুভেন্দু যে কখন নিঃশব্দে এসে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়েছিলেন, কেউই টের পায়নি। তিনি হঠাৎ সবাইকে কাঁপিয়ে দিয়ে বলে উঠলেনঃ ‘কি, রান্না-বান্না হলো তোমাদের? বেলা সাড়ে তিনটে বাজে, খাওয়া দাওয়া হবে কখন?’

    বলতে বলতে হঠাৎ উঁচু ঢিবির দিকে পলকমাত্র দৃষ্টিপাতে থমকে দাঁড়ান শুভেন্দু। নিজের চোখ দু’টোকে কিছুতেই যেনো বিশ্বাস হচ্ছিলো না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন জয়ন্তীর দিকে। ওর অভাবনীয় রূপ-দর্শনে পড়ে গেলেন বিস্ময়ের ঘোরে। এ কি! জয়ন্তী না! আজ হঠাৎ ওর বেশভূষার পরিবর্তন! জিন্সের প্যান্ট-শার্ট বর্জন করে পরিধানে আজ বাঙালি রমণীর চিরাচরিত ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র - তাঁতের শাড়ী! বাহ্, অপূর্ব! সোনালী চওড়া পাড়ের মেরুন রঙের শাড়ীতে ওকে যেনো অবিকল দূর্গা প্রতিমার মতো দেখাচ্ছে। যেমন দুধসাদা গায়ের রং, তেমনি হরিণাক্ষি দু’টির মায়াবী চাহনি। তন্মধ্যে পৃষ্ঠদেশ জুড়ে লম্বা রেশমী কালো কোঁকড়ানো চুল। চোখ ফেরায় সাধ্য কার! প্রত্যেককে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করছে। যেনো সাক্ষাৎ দেবী দূর্গা, দেবলোকের বাসিন্দা। ভক্তদের আরাধনায় স্বয়ং নেমে এসেছে মর্ত্যে।

    অস্ফূট একটা খুশির রেখা ফুঠে ওঠে শুভেন্দুর চোখেমুখে। প্রসন্ন হয়ে বললেন, ‘তুমি ওখানে কেন জয়ন্তী! এসো এসো, নেমে এসো! আমি তো থাকতেই পারলাম না! চমৎকার সুগন্ধ বের হচ্ছে রান্নার! স্মেল্‌স গুড্! কেমন টেনে নিয়ে এলো আমায়, দ্যাখো তো!’

    বলতে-বলতে তিনি  জয়ন্তীর দিকে এগিয়ে গেলেন। ডানহাতটা প্রসারিত করে দিয়ে বললেন,-‘দেখো সাবধান, বি কেয়ারফুল! জায়গাটা খুব পিচ্ছল, স্লীপ্ করতে পারে!’

    অপ্রস্তুত জয়ন্তী হঠাৎ পড়ে যায় বিপাকে। মনে মনে ইতস্তত বোধ করে, সংকোচ বোধ করে। কী করবে মনস্থির করতে পারে না। অগত্যা, সলজ্জে হাতটা বাড়িয়ে দিতেই বিদ্যুতের শক খাওয়ার মতো একটা ঝটকা লাগলো ওর সারা শরীরে। কেঁপে উঠলো যেনো নিজেরই হৃৎস্পন্দনে। লজ্জাবতী পাতার মতো রাঙা মুখখানা ওর চকিতে নুয়ে পড়লো। প্রফেসর শুভেন্দুর উষ্ণ স্পর্শে কী নিদারুণ কোমল একটা শিহরণ খেলে গেলো ওর দেহে আর মনে, যা ক্ষণপূর্বেও কল্পনা করতে পারেনি। কি অদ্ভুত একটা শিহরণ! রক্তের স্রোতের মতো শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে-রন্ধ্রে সঞ্চালিত হতে লাগলো, এক অভিনব ভালোলাগার তীব্র অনুভূতি। যার কোনো ব্যাখ্যা তখন ওর জানা ছিলো না। জানা ছিলো না, আচমকা বিপরীত লিঙ্গের উষ্ণ স্পর্শে মানসিক অস্থিতিশীলতায় ওর হৃদয়পটভূমিতে তুমুল ঝড় বয়ে যাবে; তোলপাড় করে দেবে, প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি করবে; ওর তনু-মন ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে উঠবে, হৃদয়কে স্পর্শ করবে; স্যারের প্রতি অজানা একটা আকর্ষণ গড়ে উঠবে; একটা অন্তর্নিহিত সম্পর্কের সম্পৃক্ততা গড়ে তোলার ইচ্ছে জেগে উঠবে - যা আগে কখনোই কল্পনা করতে পারেনি জয়ন্তী।

    মুহূর্তের জন্য বুদ্ধিভ্রষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলো জয়ন্তী। রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল ওর কণ্ঠস্বর। অপ্রত্যাশিতভাবে প্রফেসর শুভেন্দুর আগমন, তাঁর উপস্থিতি এবং অমায়িক আন্তরিকতার অভিব্যক্তিটুকু ওকে বেশ কিছুক্ষণ বুঁদ করে রেখেছিলো। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত কোনো তাৎপর্য প্রকাশ্যে ধরা না পড়লেও আচমকা আবেগের প্রবণতায় জয়ন্তী পারেনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। পারেনি, অভাবনীয়ভাবে সাময়িক সঞ্চিত কোমল আনন্দানুভূতিটুকু ধারণ করতে। অপ্রত্যাশিত মুগ্ধ আকর্ষণে তৎক্ষণাৎ দৃঢ়ভাবে শুধু অনুভব করেছিলো, স্যারের প্রতি এক অবিচ্ছেদ্য টান, এক অদৃশ্য বন্ধন। যা ক্রমশ ওর আত্মার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছিলো। ভিতরে ভিতরে ওকে দুর্বল করে দিয়েছিলো। চোখ তুলে তাকাতেই পারছিল না। শাঁড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে দ্রুত ছুটে চলে গিয়েছিলো হোস্টেলের দিকে। হোস্টেলে ঢুকে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়। শুয়ে-শুয়ে আকাশকুসুম ভাবতে-ভাবতে কখন যে সন্ধ্যে ঢলে পড়েছে, ওর খেয়ালই ছিল না। হঠাৎ বাদ্যযন্ত্রের অপূর্ব মূর্ছণা কর্ণগোচর হতেই শরীরের সমস্তু ইন্দ্রিয়গুলি ওর চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

    তৎক্ষণাৎ দ্রুত ফ্রেস হয়ে, ড্রেস-আপ সেরে গিয়ে ঢুকে পড়ে অডিটোরিয়ামে। ততোক্ষণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। একের পর এক মঞ্চস্থ হচ্ছিল নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য, কাব্য-জলসা এবং কবিতার আসর। সব মিলিয়ে অত্যন্ত চমকারভাবে সমগ্র কলা-কুশলীদের দুর্দান্ত পরিবেশনা দর্শক-শ্রোতাদের যখন চুম্বকের মতো আবিষ্ট করে রেখেছিলো, ঠিক তখনই অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটে যায় একটা অঘটন - যার জন্যে কেউই প্রস্তুত ছিলনা। হঠাৎ বিজলীবাতি নিভে গিয়ে সৃষ্টি হয় অভাবনীয় বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতি। অন্ধকারে ছেয়ে যায় চারদিক। চোখে কিছু দেখা যাচ্ছিলো না। শুরু হয় ছাত্র-ছাত্রীদের হৈ-হুল্লোড়, হুড়োহুড়ি, ছোটাছুটি।

    এমন অবস্থায় জয়ন্তী অন্ধের মতো পথ অনুসরণ করে ব্যাক্‌ডোর দিয়ে দ্রুত ছুটে বেরিয়ে আসতেই সিঁড়ির গোড়ায় প্রফেসর শুভেন্দুর সাথে লাগলো এক ধাক্কা। বেশ জোরেই লেগেছিল ধাক্কাটা। ছিটকে দু’জনে পড়ল গিয়ে তিনহাত দূরে। কিন্তু অঙ্গ-পতঙ্গের স্পর্শের অনুভূতিতে দুজনারই বোধগম্য হয়েছিল তাদের বিপরীত লিঙ্গের ব্যক্তিটিকে।

    প্রফেসর শুভেন্দু তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সরি ম্যাম, আই এ্যাম সো সরি! আর ইউ ওকে?’

    জয়ন্তী নীরব, নিরুত্তর। অপ্রত্যাশিত প্রফেসর শুভেন্দুর কন্ঠস্বরে ওর সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে। সেদিন ও প্রথম অনুভব করেলো পুরুষালি দেহের উষ্ণ স্পর্শের এক অভিনব অনুভূতি। কি নিদারুণ সেই অনুভূতি! যা ভাষায়, ব্যাখ্যা করা যায় না। সে এক নতুন অভিজ্ঞতা। সম্পূর্ণ নতুন বিস্ময়। কিন্তু ততোক্ষণে ও আর ওর মধ্যে ছিল না। মুহূর্তের জন্য হুঁশ-জ্ঞান সব হারিয়ে ফেলে প্রফেসর শুভেন্দুর সংর্স্পশের কোমল অনুভূতি ও তাঁর পুরুষালি দেহের গন্ধে এক ধরণের নেশায় ওকে পাগল করে তোলে। ইচ্ছে হচ্ছিলো স্যারের পশমাবৃত প্রশ্বস্ত বক্ষে নিজেকে সঁপে দিতে। ওঁর বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের বেষ্ঠনে পিষ্ট হয়ে যেতে। ওঁর উষ্ণ আলিঙ্গনে একেবারে লীন হয়ে যেতে। অথচ মুখে একটি শব্দও উচ্চারিত হয় না। ফোঁস-ফোঁস করে উষ্ণ নিঃশ্বাস প্রঃশ্বাসের আনা গোনার মধ্য দিয়েই বয়ে যায় কয়েকটি মুহূর্ত। হঠাৎ স্যারের বিচলিত কণ্ঠস্বরে জয়ন্তীর হুঁশ ফিরে আসে, ‘আই কাণ্ট সী এনিথিং, আর ইউ ওকে ম্যাম?’

    অভাবনীয়ভাবে আচমকা এক অভিনব অনুভূতির তীব্র জাগরণে তন্ময় হয়ে ডুবে থাকার ঘোর কাটতেই লজ্জা আর আবেগের সংমিশ্রণে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে অন্ধের মতো হাতরে-হাতরে অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে থাকে জয়ন্তী। কিন্তু প্রফেসর শুভেন্দু? ওঁর মধ্যে কি কোনো প্রতিক্রিয়াই ঘটেনি?

    অবশ্যই ঘটেছিলো। ক্ষণিকের অনাকাঙ্খিত বিভ্রান্তিতে ক্ষণপূর্বে যে কাণ্ডটি ঘটে গিয়েছিলো, মুহূর্তের জন্য নিজেকেই অপরাধী মনে হয়েছিলো। কিছু বলবার ব্যাকুলতায় উদগ্রীব হয়ে উঠলেও অজানা আকর্ষণ মনকে বারবার দুর্বল করে দিচ্ছিলো। কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ কারো নজরে ধরা না পড়লেও আচমকা যুবতী রমণীর সুকোমল অঙ্গের স্পর্শে প্রফেসর শুভেন্দুর কোমল হৃদয়কে যে ভিজিয়ে দিয়েছিলো, যার মধুর আবেশে তাঁর মধ্যেও যে এক ধরণের কোমল অনুভূতির জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল, তা কে জানতো!

    অথচ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। বিপদকালীন সময়ে থমকে যাওয়া কয়েকটি মুহূর্তে উষ্ণ নিঃশ্বাস-প্রঃশ্বাসের আনা গোনার মধ্যেই হঠাৎ ঝট্ করে বিজলীবাতি জ্বলে উঠতে দুজনেই চমকে ওঠে। পলকমাত্র দৃষ্টিপাতে প্রফেসর শুভেন্দু লক্ষ্য করলেন, স্পর্শকাতরতায় লজ্জাবতী পাতার মতো মাথাটা নুইয়ে রেখে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলো জয়ন্তী। পুলক-জাগা এক অদ্ভুত শিহরণ হৃদয়পটভূমিতে ওর তুমুল ঝড় উঠে তোলপাড় করে দিলো। মুহূর্তের জন্যে নড়ে উঠেছিলো ওর হৃদয়স্পন্দন। বার বার ক্ষণপূর্বের স্মৃতি ওকে বিচলিত করে তুলছিলো। সেদিনই যেনো প্রথম দুলে উঠেছিলো জয়ন্তীর মন-প্রাণ সারাশরীর। জাগ্রত হয়েছিল, আশ্চর্য্যময় এক অভিনব অনুভূতি। ক্রমে-ক্রমে সিক্ত হয়ে ওঠেছিলো, ধূসর মরুভূমির মতো ওর হৃদয়পটভূমি। সেদিন শরীরের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে প্রথম আবিষ্কার করে, জীবনের প্রকৃত অর্থ এবং ভালোবাসার সারমর্ম। যেনো মিরাকলের মতো জেগে ওঠেছিলো ওর বেঁচে থাকার সাধ, আবেগ-অনুভূতি আর প্রেম ও ভালোবাসা দেবার-পাবার ইচ্ছা। যা ক্ষণপূর্বেও জয়ন্তী কল্পনা করতে পারেনি। আর সেদিন থেকেই প্রফেসর শুভেন্দুকে একান্তআপন করে কাছে পাবার ইচ্ছা ওকে ক্রমশ উৎসুক্য করে তোলে।

    কিন্তু এতোকাল সূর্য কি পশ্চিমদিকে উঠছিলো? না আকাশের চন্দ্র-গ্রহ-নক্ষত্রগুলি সব মেঘে ঢাকা ছিলো? না-কি বসন্তে ফুলই ফোটেনি বাগিচায়? সারা বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের সবকিছুই তো একই রীতিতে চলছে। প্রকৃতির রূপ, বৈশিষ্ঠ কিছুই তো বদলায় নি! তবে হৃদয়-আঙ্গিনার কেনো এমন বিবর্তন জয়ন্তীর? কেনোইবা এমন অস্থিতিশীলতা? কখনো উচ্ছলতা, কখনো ঔদাসীন্য, কখনো মলিনতা, কখনো চঞ্চলতা। আগে কখনও তো এমন ঘটেনি। অথচ নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ জয়ন্তী। মা-বাবার সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে একা পড়ে থাকার বুকভাঙ্গা কষ্ট আর বেদনাগুলিকে বেমালুম ভুলে গিয়ে একান্তে নিঃভৃতে নির্জনে গভীরভাবে নিমজ্জিত হয়ে থাকে প্রফেসর শুভেন্দুকে নীরব ভালোলাগার আবেশ ও ভালোবাসার অনুভূতির অবগাহনে।

    কিন্তু কতোক্ষণ! বাইরের পৃথিবীর বুকে আঁধার নেমে এলেই ওর হৃদয় আকাশেও অন্ধকারে ছেয়ে যায়। ঘুমন্ত শহরের প্রতিটি মানুষ তখন নিদ্রাদেবীর বাহুডোরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন। হোস্টেলের কামরাগুলো ছোটো-ছোটো। একলা নিঃসঙ্গতায় ওর দম বন্ধ হয়ে আসে। হোস্টেলের রুটিনমাফিক জীবন বড়ই অসহনীয় - আজকাল ওর একঘেঁয়ে লাগে। যেদিন প্রফেসর শুভেন্দুর অমায়িক আন্তরিকতার অভিব্যক্তি এবং তাঁর কোমল সান্নিধ্য জয়ন্তীকে পাগল করে দিয়েছে, রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, সেদিন থেকে হোস্টেলের চার দেওয়ালের ভিতরে ওর মন টিকতেই চায়না। অপেক্ষা করে থাকে, কখন রাত পোহাবে, কখন স্নিগ্ধ সতেজ হয়ে ফুটে উঠবে ঊষার প্রথম তরুণ সূর্যের কোমল নির্মল আলো। কখন প্রফেসর শুভেন্দুকে দেখতে পাবে।

    (চলবে)

    ১৮ জুন ২০১৪
    যুথিকা বড়ুয়া
    কানাডার টরোণ্টো প্রবাসী লেখক ও সঙ্গীতশিল্পী


আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন